ঢাকা, সোমবার, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

জনক || শাহনেওয়াজ চৌধুরী

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-২৯ ১২:৩৯:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

আলবার্ট গোমেজ ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসেছে ভ্রমণের উদ্দেশে। অনেক বছর ধরে আসার ইচ্ছে, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সময় করে উঠতে পারছিল না। যখন সময় করে উঠতে পেরেছে, তখন দেখা গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভালো না।

এবার ব্যাটে-বলে মিলে গেল। অর্থাৎ আলবার্টের ব্যস্ততাও ছিল না, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ ভালো। সাবেক বিরোধী দল রাজনৈতিক কর্মসূচি দেব দেব করেও সহসা দিচ্ছে না। মাস খানেক আগে আলবার্টের ভিসাও করা ছিল। তাই চলে এলো বাংলাদেশ ভ্রমণে। আসার আগে ফেসবুকে তার বাংলাদেশী বন্ধু আদনানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তার মোবাইল ফোন নম্বরও টুকে রেখেছে।

৬ আগস্ট ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমেই আদনানকে ফোন করল আলবার্ট। কিন্তু চরম হাপিত্যেশ করল আদনান। বন্ধুকে সে জানাল- বাবার সঙ্গে ঢাকার বাইরে আছে সে।

 

আসলে আলবার্টের কথা তার মনেই ছিল না। যদিও বাবার সঙ্গে ঠিকই গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে আদনান। কিন্তু আলবার্টের কথা মনে থাকলে এখন ঢাকার বাইরে যেত না সে। ক’দিন পরে গেলেও চলত। তবে বন্ধুকে সে আশ্বস্ত করল- ‘বন্ধু, চিন্তা করো না। তুমি আপাতত যা পারো ঘুরে-টুরে দেখো। আমি এসে তোমাকে নিয়ে পুরো বাংলাদেশটা ঘুরে দেখাব।’

আলবার্ট হোটেলে উঠল। কিন্তু মনটা ছটফট করতে লাগল- যার ভরসায় সে বাংলাদেশে এলো, সেই বন্ধু নেই। কবে যে বাংলাদেশের সবুজ গ্রাম দেখতে পাবে সে! সবুজের বুক চিরে বয়ে গেছে নীল জলের নদী। আহা, এই সৌন্দর্য্য কবে দেখতে পাব! -ভাবতে ভাবতে চোখ বুজে ফেলল আলবার্ট।

 

আদনানের অপেক্ষায় হোটেলে অলস সময় কাটে আলবার্টের। সকালে ঘুম থেকে জেগে নাশতা সেরে ইংরেজি পত্রিকায় চোখ বুলাতে বুলাতে এক ঘণ্টা পার। তারপর সুইমিংপুলে আধা ঘণ্টা। ফিরে এসে এক গেলাস জুস পান করে ল্যাপটপে বসে আলবার্ট। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাটে পার হয়ে যায় আরো কিছু সময়। তারপর লাঞ্চ সেরে জানালায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে ঢাকা শহরের ব্যস্ত সড়কে মানুষ আর যানবাহনের ব্যস্ততা দেখে আলবার্ট। ভালো লাগে তার। কিন্তু জানালায় দাঁড়ালেই প্রথমে ওই বিলবোর্ডটাতে চোখ পড়ে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আলবার্ট। এখানে এসে প্রথম দিন ওই বিলবোর্ডটাতে চোখ পড়তেই চমকে উঠেছিল সে। মুগ্ধও হয়েছে। কী বুদ্ধিদীপ্ত চাহনী মানুষটার! চাহনীই বলে দেয় এমন লোকই পারে একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনতে।

 

বিলবোর্ডে ঠায় চেয়ে থাকা ওই মানুষটির কথা বাবার কাছে বহুবার শুনেছে আলবার্ট। দেশের জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এই মহাপুরুষ। এ দেশের জন্মের আগে তিনি নাম রেখে ছিলেন- ‘বাংলাদেশ’। শুধু নাম রেখেই ক্ষান্ত হননি। বিশ্বের বুকে নিজ দেশের নাম ছড়িয়ে দিয়েছেন।- এসব বাবার কাছে শুনেছে আলবার্ট। বাবা তখন আমেরিকান এম্বেসিতে কাজ করতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবাকে আলবার্টের দাদি বাংলাদেশে চাকরি করতে দিতে চাননি। বাবা বার বার বুঝিয়েছেন- ‘আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না মা। ঈশ্বর চাইলে সমস্যা হবেও না। তাছাড়া এ দেশ খুব তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়ে যাবে। এ দেশে এক বীরপুরুষ আছে। শেখ মুজিবের নাম শোনোনি মা?’

‘হ্যাঁ, শুনেছি তো। তবু ভয় করছে বাবা! আমেরিকা থেকে কত দূরের দেশে আছিস। তাছাড়া ও দেশে যুদ্ধ চলছে।’

‘শুধু শুধু ভয় পেয়ো না মা। বললাম না, বীরের জাতি এ দেশ স্বাধীন করে ছাড়বে।’

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেশে ফিরে আলবার্টের বাবা বলেছিলেন- ‘তোমাদের যখন ও দেশ স্বাধীন হবার সম্ভাবনার কথা বলেছি, তখন যুদ্ধের বয়স মাত্র দুই মাস। কিন্তু বাঙালিরা শেখ মুজিবের এতটাই অন্ধ ভক্ত ছিল যে, তাঁকে পাকিস্তানে আটকে রেখেও ভুট্টো স্বাধীনতাপিপাসু বাঙালির সাহসের ভীত নড়াতে পারেনি। মুজিবের ডাকে সেই যে তারা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে, জয়ী না হয়ে ফিরবে না প্রতীজ্ঞা করেছিল। তাতেই আমার মনে হয়েছিল- বাঙালি জাতিকে দমানো যাবে না। স্বাধীনতা ওরা ছিনিয়ে আনবেই।’

 

আলবার্ট তখন কিশোর। শেখ মুজিবের একটি ছবি নিয়ে ছিলেন বাবা। ছবিটা আলবার্টের বইয়ের ভাঁজে রাখা ছিল। মাঝে মাঝে ছবিটা বের করে দেখত আলবার্ট। সেদিনের সেই কিশোর মনে বাবা যে মহানায়কের ছবি এঁকে দিয়েছেন, তা আজও অমলীন। তাই বিলবোর্ডে দেখেই বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টাকে চিনতে পেরেছে আলবার্ট। কিন্তু বাঙালি জাতির জনকের ছবির পাশে কী লেখা আছে তা তো বোঝা সম্ভব নয়।

আলবার্ট বুঝে নিল কী করতে হবে। আদনান এলে ওর কাছে জানতে পারবে- ওদের জাতির জনকের ছবির পাশে কী লেখা আছে।

 

দুই

দু’দিনেও এলো না আদনান। কিন্তু আলবার্টকে ফোন করেছে নিয়মিত।

আলবার্ট কোথাও বেরুচ্ছে না। হোটেলে অলস সময় কাটাচ্ছে জেনে আদনানের মন খারাপ হলো- আহারে, বেচারা তার ভরসায় বাংলাদেশে এসে হোটেলেবন্দি সময় পার করছে! বন্ধুকে সে বলল, ‘অন্তত আমাদের রাজধানীটা আমাকে ছাড়াই দেখে নিতে পারো তুমি। লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেই যেখানে যেতে চাও পথ বাতলে দেবে। তাছাড়া সমস্যা হলে আমাকে তো ফোন করতেই পারবে।’

‘সমস্যা নেই, তুমি এলেই দু’বন্ধু একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ব। তুমি কবে ফিরছ?’

‘দেখি কত তাড়াতাড়ি ফিরতে পারি।’

 

 

তিন

ঢাকায় পৌঁছে বাবাকে বাসায় পাঠিয়ে সরাসরি হোটেলে চলে এলো আদনান। বিদেশী বন্ধু ভ্রমণে এসে তার অপেক্ষায় হোটেলে কয়েক দিন ধরে অলস সময় কাটিয়ে দিল, অন্তত এ বিবেচনাটুকু করা উচিত।

আদনানকে দেখে যারপরনাই খুশি আলবার্ট। যাক, তাকে আর হোটেলবন্দি থাকতে হচ্ছে না। আজই দু’জন বেরিয়ে পড়বে। প্রথমে ঢাকা শহর, পরে পছন্দসই অন্য জায়গা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা আলবার্টের।

আদনানের ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে যদিও তাকে দেখেছে আলবার্ট, কিন্তু সরসরি দেখার আবেদন আলাদা। তাদের নিজেদের কথা আদান-প্রদান হলো। আবেগ বিনিময় হলো।

তারপর আলবার্ট বলল, ‘চলো, লাঞ্চ সেরে আসি।’

দু’জন লাঞ্চে গেল।

 

ফিরে এসে আদনান বলল, ‘তাহলে আর দেরি কেন? চলো, বেরিয়ে পড়ি। এমনিতেই আমার অপেক্ষায় তোমার অনেক সময় নষ্ট হয়েছে।’

আলবার্ট সিগারেট ধরিয়ে জানালায় এসে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে আঙুল তুলে জাতির জনকের ছবির পাশে কী লেখা আছে আদনানের কাছে জানতে চাইল।

আদনান বলল, ‘আর ক’দিন পরেই জাতীয় শোক দিবস। তাই জনকের ছবির পাশে তার জন্য শোক জানানো হয়েছে।’

আদনানের কথা শুনে একটুক্ষণ কী যেন ভাবল আলবার্ট!

আবার তাড়া দিল আদনান- ‘চলো, বেরুবে না?’

আলবার্ট চুপ করে রইল। আদনানের কথা যেন কানেই ঢুকছে না তার!

আদনান অবাক।

 

 

একটুক্ষণ পর আলবার্ট বলল, ‘আদনান, ভাবতে পারো যে মানুষটা তোমাদের জন্য নিজের জীবনের সুখ-শান্তি পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে তোমরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছ! নিজের জাতির প্রতি বিশ্বাসের ভীত এতই মজবুত ছিল যে, তাঁর দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে হত্যা করতে পারে- এমন গোয়েন্দা রিপোর্টকেও তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাদের অবিশ্বাস করেননি। তাঁর বিশাল বুকে যে কুলাঙ্গার বন্দুকের নল তাক করেছিল, তাকেও অবিশ্বাস করতে পারেননি!’ একটু থেমে আলবার্ট বলল, ‘ভাবতে পারো আদনান? নাকি তোমাদের জাতির জনককে নিয়ে এভাবে কখনো ভাবোনি!’

 

হঠাৎ নিজেকে শূন্য মনে হলো আদনানের। বিদেশী বন্ধু তার বিবেকের জগতে ঝড় তুলল।

একটুক্ষণ দুজনই চুপচাপ। তারপর আলবার্ট বলল, ‘আমার বাবার কাছে তোমাদের জনকের কথা শুনেছি। কিন্তু এটা যে তোমাদের শোকের মাস মনে ছিল না আমার। মনে থাকলে এমন বেদনাবিধুর সময়ে ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে আসতাম না।’

 

যে বন্ধু বিবেকের অতলে নিয়ে গেল, ভিনদেশী হলেও কেন যেন তাকে খুব আপন মনে হলো আদনানের! তাই মায়া হলো- আহা, বেচারা দূরের দেশ থেকে এসে এভাবে ফিরে যাবে! তাই বলল, ‘চলো, অন্তত ঢাকা শহরটা দেখে যাও।’

‘না বন্ধু।’

‘কেন?’

‘শোকের মাসে আনন্দ খোঁজা মানে নিজেকে গর্দভে পরিণত করা।’

‘তাই বলে...’

‘একটা কথা বলি বন্ধু। কিছু মনে করো না। যারা তাদের জনকের বিশ্বাসে আঘাত হানতে পেরেছে, আমি ভিনদেশী হয়ে তাদের কীভাবে বিশ্বাস করি!’

আলবার্টের কথা শুনে আদনান থ খেয়ে গেল। একদৃষ্টে বিদেশী বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল সে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ জুন ২০১৬/এএন/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন