Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২২ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ১০ ১৪২৮ ||  ১০ জিলক্বদ ১৪৪২

তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খাঁ কিংবা তৈমুর লঙদের সমগোত্রীয়

মিনার মনসুর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫১, ২৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৭:০৭, ২৯ আগস্ট ২০২০
তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খাঁ কিংবা তৈমুর লঙদের সমগোত্রীয়

অন্যান্য কবি, সাহিত্যিকদের সঙ্গে রাহাত খান (বাম পাশে বসা)

রাহাত খানের সঙ্গে আমার এ নগণ্য জীবন এত বিচিত্রভাবে যুক্ত ছিল যে তা এ পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না। হয়ত বেঁচে থাকলে আমার আত্মজীবনীর অংশ হবে তা। জীবন নামক নিয়তিনিয়ন্ত্রিত এ ভ্রমণের নানা পর্যায়ে যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সুযোগ হয়েছে মেলামেশার, তাদের সবার সঙ্গে যে আমাদের নির্জলা ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। এমন অনেকে আছেন যাদের সঙ্গে কর্মসূত্রে দীর্ঘসময় কাটিয়েছি, কিন্তু কোনো সম্পর্কই তৈরি হয়নি তাদের সঙ্গে। না ভালোবাসার, না ঘৃণার। আবার এমন অনেক মানুষের সঙ্গেও আমাদের দেখা হয়ে যায় যাদের সঙ্গে ঠিক ভালোবাসা নয়, ঘৃণাও নয়- কী এক অব্যাখ্যাত অচ্ছেদ্য সম্পর্কে আমরা জড়িয়ে থাকি। সে সম্পর্ক মুছে ফেলার মতো নয়। রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটি ছিল এই শেষোক্ত পর্যায়ের।

রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৭৭ সালে। তিনি তখন `ইত্তেফাক'-এর সহকারী সম্পাদক। পদটি আপাত দৃষ্টিতে ছোট হলেও রাহাত খান তখন বিশাল এক নাম। তাঁর আদলে তৈরি হওয়া জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ মাসুদ রানার মেজর জেনারেল রাহাত খানের মতো। কিংবা তার চাইতেও খানিকটা বেশি। তাঁর চলনবলন ছিল জাঁদরেল জেনারেলের মতো। এমনকী শেষবার যখন ঢাকা ক্লাবে দেখা হলো- বয়সের ভারে ন্যুব্জ (নিঃস্বও বটে- কাম্যুর সেই বৃদ্ধ জেলের মতো), বিস্ময়করভাবে তখনো তিনি তাঁর সেই মেজাজটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমরা গিয়েছিলাম ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’-এর জন্যে লেখা চাইতে। একটি গল্প দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু গল্পটি শেষ পর্যন্ত আমাদের হাতে না এলেও তিনি কথা রেখেছিলেন। স্বাক্ষরসহ প্রতিক্রিয়া লিখে দিয়েছিলেন যা পরের বছর আমাদের সম্পাদিত ‘আবার যুদ্ধে যাবো’ নামক বুলেটিনে প্রকাশ করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার দুই বেনিফিসিয়ারি জিয়া-এরশাদ উভয়ের সঙ্গে তাঁর খাতির ছিল এবং সেকথা তিনি বলতে কখনো দ্বিধা করতেন না।

ঘটনাচক্রে রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা দেখা হয়ে যায় আমার এডাব-এর কর্মস্থলে। সেটি নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে। সেখানে তিনি প্রায় নিয়মিত আসতেন। এডাব-এর মিডিয়া উপদেষ্টা হিসেবে তিনি কাজ করেছেন বেশ কয়েক বছর। আর তাঁর সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষার গুরুদায়িত্বটি ন্যস্ত ছিল আমার ওপর। সে অভিজ্ঞতা বলার সময় এটা নয়। এ সময়েই মজ্জাগতভাবে সংঘবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও এবং জাতীয় কবিতা পরিষদের তিক্ত অভিজ্ঞতার টাটকা ক্ষত বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে বড় দুটি সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। তার একটি হলো ‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব’। রাতদিন দৌড়ঝাঁপ করে কয়েক লাখ টাকা এবং বেশকিছু চেয়ার টেবিল জোগাড় করে দেই। রাহাত খান সভাপতি ও সিকদার আমিনুল হক সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত হয় সমাজ সেবা অধিদপ্তরে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে অপরিহার্যভাবে আমার নামও ছিল। কিন্তু কদিন পর রহস্যজনক কারণে আমি ‘নেই’ হয়ে গেলাম। রাহাত ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি নীরব। সংঘবিমুখ নিখাদ ভদ্রলোক সিকদার ভাই ক্লাবের সঙ্গে সমস্ত সংযোগ ছিন্ন করে ফেললেন।

রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে তৃতীয় দফা আমার দেখা হয় ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদকীয় বিভাগে। কম্পমান বুকে ১৯৭৭ সালে যে সম্পাদকীয় দপ্তরে ঢুকে আমি রাহাত ভাইয়ের লেখাপ্রার্থী হয়েছিলাম, ঠিক ৩০ বছর পরে সেখানেই আমি প্রবেশ করি রাহাত ভাইয়ের সহকর্মী হিসেবে। হাবীবুর রহমান মিলন, আখতারুল আলম, মহাদেব সাহা, জিয়াউল হক ও আল মুজাহিদীসহ ইত্তেফাকের স্বর্ণযুগের অনেকের পদচারণায় সম্পাদকীয় বিভাগ তখনো মুখর। ছিলেন শাহীন রেজা নূর এবং মঞ্জু সরকারও। রাহাত ভাই তখন সবেমাত্র পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর ঠিক পাশের কক্ষটিই বরাদ্দ হয় আমার জন্যে। তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা এককথায় ভালো। নিজের কাজটি তিনি যত্নের সঙ্গেই করতেন। সহকর্মী হিসেবে পছন্দও করতেন আমাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মহাপরাক্রান্ত দুই মালিকের যুদ্ধ তখন চরমে। জীবনে সম্ভবত এই প্রথম চালে ভুল করে ফেলেন রাহাত ভাই। অসম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে হয় তাকে।

আমিও তখন বেশ উদ্বিগ্ন। একে তো কর্মস্থলে রক্তারক্তির দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত নই, তদুপরি মাত্র ‘সংবাদ’ ছেড়ে এসেছি। এমন দম বন্ধ করা এক দুপুরে রাহাত ভাই তাঁর কক্ষে আমাকে ডাকলেন। খুব যত্নের সঙ্গে চা খাওয়ালেন। বললেন, ‘চিন্তা করো না। তুমি তো কাজের লোক, পত্রিকা বের করতে হলে তোমাকে লাগবে। যারাই আসুক তোমার কিচ্ছু হবে না।’ সম্ভবত এবারই প্রথম আমার চোখের কোণটা ভিজে আসে। আমি অদ্ভুত এক বেদনা অনুভব করি আমার সামনে বসা দাপুটে মানুষটির জন্যে। বলি, ‘রাহাত ভাই, আপনি...?’ বললেন, ‘আমি আর আসবো না। তবে তোমার খোঁজ রাখবো।’ তিনি কথা রেখেছিলেন। নতুন একটি পত্রিকার দায়িত্ব নিয়েই ভালো বেতনে আমাকে সেখানে চাকরির অফার দিয়েছিলেন। পত্রিকাটির মালিক সম্পর্কে জানতাম বলে আমি বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।

লেখার জাদুকরী ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল তান্ত্রিকের মতো। ক্ষমতার সাধনা করতেন তিনি। আর এই ক্ষমতার যা কিছু অনুষঙ্গ- অর্থ ও নারীসহ সবকিছুর প্রতি ছিল তাঁর দুর্বার মোহ। সেখানে স্ত্রী, সন্তান, সম্পর্ক সবই ছিল গৌণ। আমি প্রায় ভাবতাম, রাহাত ভাই নিজের সৃষ্টিশীলতার প্রতি কেন এত অবিচার করছেন? সে কি কেবল টাকা আর ক্ষমতার মোহে? বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তাঁর মৃত্যুসংবাদের সঙ্গে নানা বয়সের যে-ছবিগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে সেগুলোর দিকে চোখ পড়ামাত্র আমি বহুল প্রত্যাশিত উত্তরটি পেয়ে যাই। সেটি হলো, রাহাত ভাইয়ের মধ্যে ছিল দুর্নিবার এক জীবনতৃষ্ণা- যা তিনি রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করতেন ক্ষমতার সুস্বাদু সস সহযোগে। স্বভাবের দিক থেকে তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খাঁ কিংবা তৈমুর লঙদের সমগোত্রীয়। আগেই বলেছি, একটি রাজসিক ভাব ছিল তাঁর চলনবলনে। যদি বিশ্বাস না হয়, তার চোখ দুটো আবার দেখুন।

লেখক: কবি ও পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়