RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৯ ১৪২৭ ||  ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

তিস্তায় পানি কম, সেচবঞ্চিত ৪৬ হাজার হেক্টর জমি

নজরুল মৃধা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:২০, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
তিস্তায় পানি কম, সেচবঞ্চিত ৪৬ হাজার হেক্টর জমি

পর্যাপ্ত পানি নেই তিস্তা নদীতে। ফলে তিস্তা ব‌্যারাজ সেচ প্রকল্প এলাকার ৪৬ হাজার হেক্টর জমি সেচ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব জমিতে বোরো ধান চাষ করতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিতে হবে কৃষকদের। এতে তাদের বাড়তি ব‌্যয় হবে ৬৫ কোটি টাকার বেশি।

সেচ প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, গত বছর ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ‌্যমাত্রা থাকলেও পানি সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ হাজার হেক্টরে। এরপরও ৪৩ হাজার হেক্টর জমি সেচ-সুবিধার বাইরে ছিল।

২০১৪ সালে বোরো মৌসুমে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু সেচ দেয়া হয় মাত্র ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সেচ দেয়া হয় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০১৭ সালে মাত্র ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়।

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিলে কৃষকদের হেক্টর প্রতি বাড়তি খরচ হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে ৪৩ হাজার হেক্টরে কৃষকদের বাড়তি খরচ পড়বে ৬৫ কোটি টাকার বেশি।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী জানান, চলতি রবি ও খরিপ-১ মৌসুমে ২৫ জানুয়ারি থেকে সেচ দেয়া শুরু হয়। শুরুতে সেচ দেয়া হয় জলঢাকা উপজেলায়। পরবর্তীতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সেচ দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, উজানে পানিপ্রবাহ দিন দিন কমায় তিস্তা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের কমান্ড এলাকায় সম্পূরক সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এবার এসব এলাকায় কৃষকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিতে হবে।

রাফিউল বারী জানান, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সেচ প্রকল্পের জন্য ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। কিন্তু সেচের জন্য পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ কিউসেক।

গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে সেচ দেয়া হয়েছিল। এবারও লক্ষ্যমাত্রার বেশি সেচ দেয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

জানা গেছে, তিস্তা অববাহিকার ৫ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মানুষ জীবিকার জন্য এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। তাই তিস্তায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এখানকার মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। তিস্তা অববাহিকার ৮ হাজার ৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল। সমতল ভূমিতে তিস্তা অববাহিকা ৪ হাজার ১০৮ বর্গকিলোমিটার। তার প্রায় অর্ধেক অংশ পড়েছে বাংলাদেশের সীমানায়। দুই দেশই তিস্তার পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে নদীর ওপর ও আশপাশে ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ভারত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচ কার্যক্রমের জন্য তিস্তার পানি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ তিস্তার পানি ব্যবহার করছে শুধু পরিকল্পিত সেচ দেয়ার কাজে। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানি ক্রমাগত কমছে। তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি উপজেলা- নীলফামারী সদর, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর ও খানসামা তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় ছিল। কিন্তু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সবগুলো উপজেলায় সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, ভারত ৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমির সেচের চাহিদা মিটিয়ে যে পরিমাণ পানি ছাড়ে, তা দিয়ে বোরো মৌসুমে আমাদের সেচ চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হয় না। ১৯৯৭ সালে বাংলদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানিপ্রবাহ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক। তা ২০০৬ সালে নেমে আসে ১ হাজার ৩৪৮ কিউসেকে। ২০১৯ সালে পানিপ্রবাহ ছিল মাত্র ৭০০ কিউসেক।

১৯৯৩-৯৪ শস্যবছর থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি উপজেলায় ব্যাপকভাবে আউশ ও আমন উৎপাদনের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ‌্যে তিস্তার পানি দিয়ে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৬-০৭ শস্যবছর থেকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ‌্যে বোরো মৌসুমেও সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। আমন মৌসুমে মোট সেচযোগ্য ৭৯ হাজার ৩৭৯ হেক্টর এলাকার প্রায় পুরোটাই সেচের আওতায় আনা সম্ভব হলেও বোরোর ক্ষেত্রে পানির দুষ্প্রাপ্যতায় সেচ-সাফল্যের চিত্র একেবারেই হতাশাজনক।

শুকনো মৌসুমে ভারতের পানি প্রত্যাহারের পর তিস্তা নদীতে যে সামান্য পানি পাওয়া যায়, তার সবটুকুই সেচ চাহিদা মেটানোর লক্ষ‌্যে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের সেচ খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের পর থেকে ৯৭ কিলোমিটার বিস্তৃত তিস্তা নদীতে পানিও থাকছে না। এ কারণে তিস্তা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশের এই বিশাল পরিমাণ নদীগর্ভ পরিণত হচ্ছে বালুচরে। তিস্তা ব্যারাজ এলাকার পর শুকনো মৌসুমে এভাবেই নদী মরে যাচ্ছে।



রংপুর/নজরুল মৃধা/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়