ঢাকা     রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৫ ১৪২৭ ||  ০১ সফর ১৪৪২

পেঁয়াজ আমদানির আড়ালে মিয়ানমারে অর্থপাচার!

এম এ রহমান মাসুম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১৫, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
পেঁয়াজ আমদানির আড়ালে মিয়ানমারে অর্থপাচার!

পেঁয়াজের বাজার যখন আকাশ ছোঁয়া। মানুষ যখন পেঁয়াজের ঝাঁজে দিশেহারো। তখন এক শ্রেণির সুযোগ সন্ধানি ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করছে। তাও আবার মিয়ানমারের মতো দেশে! যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ।

অর্থ্যাৎ বেশি দামে আমদানিকৃত পেঁয়াজের ক্রয়মূল্য কম দেখিয়ে বা আন্ডারইনভয়েসিং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা পাচার করছে আমদানিকারকরা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে এমন অভিনব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

আমদানির বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের নভেম্বরে মিয়ানমারের বাজারে পেঁয়াজের কেজি মূল্য পাওয়া যায় ১৩৪। অথচ আমদানিকৃত পেঁয়াজের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৩ টাকা। অর্থাৎ কেজি প্রতি ৯১ টাকা কম আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে। একইভাবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও ২৫ থেকে ৪০ টাকা কম মূল্য দেখানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, মিয়ানমার হতে আমদানিকৃত পেঁয়াজ প্রতি মেট্রিক টন ৫০০ মার্কিন ডলার ঘোষণায় আমদানি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে মেট্রিক টন প্রতি ১২০০ মার্কিন ডলার ক্রয় করেন আমদানিকারকরা। অর্থাৎ মেট্রিক টন প্রতি প্রায় ৭০০ ডলার আন্ডারইনভয়েসিং হয়েছে। এই আন্ডারইনভয়েসিং টাকা আমদানিকারকরা ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ মিয়ানমার হতে পেঁয়াজ আমদানির আড়ালে কয়েকশত বৈদেশিক মূদ্রা পাচার হয়েছে।

এজন্য শুল্ক গোয়েন্দারা আরো অনুসন্ধানের জন্য সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেনের অনুমতি চেয়েছে বলে ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রাইজিংবিডির কাছে স্বীকার করেছে।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন।

শুল্ক গোয়েন্দার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে বছরে ২৪ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। চলতি বছরে ২৩.৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। পেঁয়াজ একটি রসালো পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় ২৫ শতাংশ সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে থাকে। বিগত কয়েক বছরের স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণের আলোকে বলা যায় বছরের অবশিষ্ট সময়ে চাহিদা পূরণের জন্য আরো ৩.৬৪ লাখ মেট্রিকটন পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এক হিসেবে দেখা গেছে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এই তিন মাসে অন্তত ১৬৭ হাজার ৮০৬ মেট্রিকটন পেঁয়াজ এসেছে দেশের বাজারে। ৩৪০ পেঁয়াজ আমদানিকারক দুই হাজার ৪০৯টি পণ্য চালানের মাধ্যমে পেঁয়াজেরর চালান আসে। অনিয়ম বা মজুত খতিয়ে দেখতে শুল্ক গোয়েন্দা ১০০০ মেট্রিকটন আমদানি করেছে এমন ৪৩ জন আমদানিকারকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।

আমদানিকারকের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলো: মেসার্স দিপা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স আরএম এগ্রো, মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স বিএইচ ট্রেডিং অ্যান্ড কোং, জগদিশ চন্দ্র রায়, মেসার্স সাজ্জাদ এন্টারপ্রাইজ, একতা শস্যভাণ্ডার, মেসার্স ফুল মোহাম্মদ ট্রেডার্স, মেসার্স ফারাহ ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স সুমাইয়া এন্টারপ্রাইজ, হামিদ এন্টারপ্রাইজ, আলি রাইস মিল, নাচোল, খান টেডার্স, এসএম করপোরেশন, মেসার্স গোল্ডেন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স রায়হান এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সোহা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মরিয়াম এন্টারপ্রাইজ, নুর এন্টারপ্রাইজ, শামিম এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স খান ট্রেডার্স, মেসার্স এমআর ট্রেডার্স, ডিএ এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স টাটা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজ, আরডি এন্টারপ্রাইজ, জনী এন্টাপ্রাইজ, মাহি অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স মুক্তা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স রায়হান ট্রেডার্স, মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজ, রিজু-রিতু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জাবেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স আলম অ্যান্ড সন্স, নিউ বড়বাজার শপিং মল, মেসার্স রচনা ট্রেডার্স, এসএস ট্রেডিং ছোট হাজি মার্কেট, সুপ্তি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ব্রাদার্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আল মদিনা স্টোর, লামাবাজার, বি কে ট্রেডার্স, ধ্রুব ফারিয়া ট্রেডার্স, মেসার্স সালাহ ট্রেডার্স, মেসার্স ফিরোজ এন্টারপ্রাইজ, সাদ ট্রেডার্স, আলিফ এন্টারপ্রাইজ প্রমুখ। এসব আমদানিকারকরা ৯০০ মেট্রিকটন থেকে ৯ হাজার মেট্রিকটন পেঁয়াজ আমদানি করেছে গত তিন মাসে।

আমদানিকারকদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য থেকে জানা যায়, বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে দেশিয় পেঁয়াজের মজুত শেষ হয়ে আসে। একই সময়ে উল্লেখযোগ পরিমাণে কাঁচা পেয়াজ বীজ হিসেবে বপন করা হয়ে থাকে বিধায় বাজারে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ কমে মূল্য বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ ৯০ শতাংশ পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করে থাকে। এছাড়া মিয়ানমার, মিশর ও তুরস্ক হতেও আমদানি হয়ে থাকে। হঠাৎ করে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। এ সুযোগে সরবরাহ লাইনে থাকা সুবিধাভোগি অসাধু ব্যবসায়ী পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য দায়ী।

জিজ্ঞাসাবাদকালে আমদানিকারকরা অকপটে স্বীকার করেন যে, সঠিক সময়ে ভারত ভিন্ন অন্য কোনো উৎস দেশ হতে তারা যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করতে পারেননি বিধায় পেঁয়াজের বাজার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ভবিষ্যতে বিভিন্ন উৎস দেশ হতে পেঁয়াজ আমদানির এলসি ওপেন করবেন বলে আশ্বাস দেন।

তারা জানায়, ভারত হতে সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ৩৫০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। চলতি বছরের আগস্টে ভারতে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে পেঁয়াজের বাজার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে শুল্ক গোয়েন্দায় পর্যালোচনায় দেখা যায়- সম সাময়িককালে মিয়ানমার হতে পিঁয়াজ আমদানিতে আন্ডারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য এনবিআরের অনুমতি প্রদান করলে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অধিকতর অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

প্রতিবেদনে শুল্ক গোয়েন্দা বলছে, মিয়ানমার হতে পেঁয়াজ আমদানিতে আমদানিকারকরা সেপ্টেম্বর মাস হতে আন্ডারইনভয়েসিং করেছেন। কেননা মিয়ানমার হতে আমাদনিকৃত পেঁয়াজ বাজারে প্রতি কেজি ১২০ টাকা হতে ১৫০ টাকা বিক্রয় হয়েছে। আমদানিকারকরা আমদানি মূল্য কেজি প্রতি ৪৩ টাকা ঘোষণা দেয়। যা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ আমদানিকারক এক্ষেত্রে মানিলন্ডারিং করেছেন।

দেশে পেঁয়াজের প্রকৃত মজুত, প্রকৃত চাহিদা ও সম্ভব্য সরবরাহের সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির জন্য বাজারে পেঁয়াজ সরবরাহের সংকট তৈরি হয়ে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ের অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য ও পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পেঁয়াজ আমদানিকারকরা আরো উল্লেখ করে, এ বছর সমগ্র পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে আমদানি মূল্যও বৃদ্দি পেয়েছে। যা অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়া গেছে। পেঁয়াজ বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সরলীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যাতে ভোক্তা সহজে ও ন্যায্যমূল্যে পিঁয়াজ ক্রয় করতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ফারাক মাত্র দুই লাখ টনের মতো। বছরে দেশে পেঁয়াজ হয় ২৩ লাখ টনের ওপরে। আর চাহিদা রয়েছে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টনের। তারপরও শুধু নষ্ট হওয়ার কারণে বছরে আট থেকে দশ লাখ টন। কারণ দেশে উৎপাদিত ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়।


ঢাকা/এম এ রহমান/সাইফ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়