ঢাকা     শনিবার   ০১ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ১৬ ১৪২৯ ||  ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

প্রেমিকার সঙ্গে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখে শাসন, ক্ষোভে ‘হত‌্যার’ পরিকল্পনা

আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪৭, ২৮ জুন ২০২২   আপডেট: ২২:৫৪, ২৮ জুন ২০২২
প্রেমিকার সঙ্গে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখে শাসন, ক্ষোভে ‘হত‌্যার’ পরিকল্পনা

ছবি: রাইজিংবিডি

ঢাকার সাভারে এক কলেজ প্রভাষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলে অভিযোগ উঠেছে। বাইরে থেকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে ওই শিক্ষার্থী মারধর করেছেন বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। কলেজ অধ‌্যক্ষ সাইফুল হাসানও একই দাবি করেছেন। তবে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পাওয়ায় তার পরিবারের কোনও মন্তব্য মেলেনি। 

মঙ্গলবার (২৮ জুন) আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় নিহতের সহকর্মী, শিক্ষার্থী, প্রত্যক্ষদর্শী, স্কুলের স্টাফ ও স্থানীয়দের সাথে কথা হয় রাইজিংবিডি প্রতিবেদকের। এসময় পূর্বপরিকল্পিত ক্ষোভে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জিতু শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে মারধর করেছে- এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

এসব বিষয়ে হাজী ইউনুস আলী কলেজের সামনের মার্কেটের মালিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ইমান উদ্দিনের সাথে একান্তে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

ইমান উদ্দিন বলেন, ‘একজন শিক্ষককে এভাবে হত্যার বিষয়টি কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা কেউ মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু আসল ঘটনা এখনও কলেজের শিক্ষকরা বলছেন না। তারা অনেক কিছু গোপন করছেন। তবে আস্তে আস্তে সব বেরিয়ে আসবে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী জিতুর বাবা উজ্জ্বল হোসেনের ব্যবসায়িক পার্টনার মাজেদ নামে এক ব্যক্তি। তাদের মূলত হোটেল ব্যবসা আছে। সেই মাজেদের একজন শ্যালিকার ছোট বোন এই কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ে। তার সাথে অভিযুক্ত জিতুর অনেক আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক। কিছুদিন আগেও স্কুলের একটি কক্ষে জিতু ও মেয়েকে অপ্রীতিকর অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন শিক্ষক উৎপল তাদের শাসিয়ে দেন। এমনকি ওই শিক্ষক মেয়ের পরিবারের কাছে ফোন করে সব জানিয়ে সতর্ক করেও দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মেয়েটা অভিযুক্ত জিতুকে এসব বিষয় জানালে সে ক্ষুব্ধ হয়েই ওই স্যারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।’ 

পড়ুন: শিক্ষার্থীর স্ট্যাম্পের আঘাতে শিক্ষকের মৃত্যু 

তিনি আরও বলেন, ‘খেলার দিন আগে থেকেই কলেজের বাইরে স্ট্যাম্প নিয়ে ঘুরছিলেন জিতু। তার সাথে আরও তিন জন যুবক ছিল। ঘটনার পরপর তারা চার জন একসাথে হেঁটে চলে যায়।’

ইমান উদ্দিনের মতো একই কথা জানান ওই কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সাইম ইসলাম। বলেন, ‘জিতুর সাথে তাদেরই কলেজের এক মেয়েকে স্কুলকক্ষে একসাথে পাওয়ার পর স্যার মেয়ের পরিবারকে জানায়। স্যার মেয়ের বাসায় ফোন করে শক্তভাবে বিচার দিয়েছিল। যাতে মেয়েটা জিতুর সাথে না মেশে। এটার ক্ষোভ থেকেই জিতু স্যারকে খেলার দিন পিটিয়েছে।’

ওই শিক্ষকের ওপর হামলা চালানোর বিষয়ে আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন শিক্ষার্থী জিতু। তার প্রমাণ মেলে কলেজের সিসিটিভি ফুটেজ খুঁজতে গিয়ে। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানান, ওই দিনের ঘটনার আগে থেকে সিসিটিভি ফুটেজে কিছুই রেকর্ড হয়নি বিদ্যুৎ না থাকার কারণে। তবে পরিকল্পনামাফিক অভিযুক্ত শিক্ষার্থী জিতু কলেজের বিদ্যুতের মেইন সুইচ কৌশলে কোন এক সময় নামিয়ে দিয়েছিলেন। যার ফলে ওই সময় সিসিটিভি বন্ধ ছিল।

কলেজের হিসাবরক্ষক পারুল আক্তার বলেন, ‘কিছু দিন আগে স্কুলের একটি কক্ষে জিতু ও মেয়েটাকে অপ্রীতিকর অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আমরা সেভাবে বিস্তারিত জানি না। মেয়েটা আমাদের কলেজের সোমা রহমান নামে এক শিক্ষকের ছোট বোন। সে এই কলেজের প্রথম বর্ষেই পড়ালেখা করে। আর ওই টিচার অসুস্থতার জন্য প্রায় ৪-৫ মাস ধরে কলেজে আসেন না। এর বেশি আর কিছু জানি না আমি।’

হাজী ইউনুস আলী কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান বলেন, ‘নিহত শিক্ষক কলেজের শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান ছিলেন। তাই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে তিনি হয়ত শাসন করেছিলেন। তবে ঠিক কোন বিষয়টা সেটি আমার জানা নেই। আর ওই দিনের ফুটেজের বিষয়টা হলো, আমরা হঠাৎ করে দেখি কারেন্ট চলে গেছে। কিন্তু তখন আশপাশে সব জায়গায় ছিল। ঘটনার পরপর আমরা বুঝতে পারি, সে পরিকল্পিতভাবেই বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করেছে।’

এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী কলেজ পরিদর্শন করেছেন আশুলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম। 

এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারে তাদের ৪-৫টি টিম আলাদা করে কাজ করছে। খুব শিগগির তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। আর কলেজ ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ আমরা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। যদিও কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের বলেছেন, ওই দিনের ফুটেজ তাদের নেই। কারণ বিদ্যুৎ ছিল না। সেই বিষয়গুলোও আমরা তদন্ত করে দেখছি। আর খেলায় প্লাস্টিকের স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কাঠের স্ট্যাম্প বাইরে থেকে আনা হয়েছে ঘটনার আগে। সবগুলো বিষয় নিয়েই আমরা কাজ করছি। আসামি গ্রেপ্তার হলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

নিহত ৩৫ বছর বয়সী শিক্ষক উৎপল সরকার সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার এঙ্গেলদানি গ্রামের মৃত অজিত সরকারের ছেলে। তিনি প্রায় ১০ বছর আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

ঢাকা/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়