ঢাকা     সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৩ ১৪২৭ ||  ১০ সফর ১৪৪২

বন্ডের কাপড়ে রাজস্ব ফাঁকি, জালিয়াত শনাক্তে দুদক

এম এ রহমান মাসুম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১৬, ২৬ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
বন্ডের কাপড়ে রাজস্ব ফাঁকি, জালিয়াত শনাক্তে দুদক

এম এ রহমান মাসুম : বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাপড় আমদানি করলেও তা সরাসরি যাচ্ছে খোলা বাজারে। ঢাকার ইসলামপুর কিংবা চট্টগ্রামের টেরিবাজারে বিক্রি হচ্ছে শত শত কোটি টাকার কাপড়। এসব চালানের বিপরীতে সরকার হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব।

ঢাকার আশুলিয়ার লাইলাক ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার নাম ব্যবহার করে এরকম জালিয়াতি করা হয়েছে। সম্প্রতি ৫০ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা উদঘাটিত হয়। কোম্পানিটির কাগজপত্রে বলা হয়েছে, পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে জাপানে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে পেরু থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক মূল্যায়ন ও নিরীক্ষায় এমন ভয়াবহ জালিয়াতি চিহ্নিত হলেও ঘটনার খলনায়করা রয়ে গেছে পর্দার আড়ালে। 

অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস হাউসের শুল্কায়ন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমদানিকারকরা পরস্পর যোগসাজশে এমন জালিয়াতি করে। এবার সেই জালিয়াত চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলতি বছরের ৩ জুন এমন একটি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নিয়ে দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দলকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয় দুদক। অনুসন্ধান দলের অপর সদস্য হলেন উপ-সহাকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম।

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, অভিযোগ অনুসন্ধানে কাস্টমসসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে নথিপত্র তলব করা হয়েছে। নথিপত্র পাওয়ার পর দুদকের মূল অনুসন্ধান শুরু হবে। আশা করছি, আমরা জালিয়াতির পিছনের কারিগরকে শনাক্ত করতে সক্ষম হব।

অভিযোগের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত ১৩৬টি চালানের কাপড় খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়। শুল্ক মূল্যায়নের অডিট দল অনুসন্ধান করে ভয়াবহ এই জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটন করে। যেখানে শুল্ক ফাঁকি হয় ৫০ কোটি টাকারও বেশি। একটি গার্মেন্টস কারখানার বিপরীতে উদঘাটিত এই ধরনের জালিয়াতি দেশের আরো বহু গার্মেন্টসে ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর অঞ্চলের বহু গার্মেন্টস মালিকই বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাপড় আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ঢাকার ইসলামপুর এবং চট্টগ্রামের টেরিবাজারে শত শত কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে। এসব চালানের বিপরীতে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অথচ এসব কাপড় দিয়ে উৎপাদিত পোশাক বিদেশে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বহু অসাধু গার্মেন্টস মালিক পোশাক রপ্তানি না করে বন্দর থেকে চালান খালাস করে সোজা ইসলামপুরের কাপড়ের দোকানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে রিপোর্ট তৈরি করে কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সবকিছু ঠিকঠাক রাখছেন।

এ বিষয়ে শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের তৎকালীন কমিশনার ড. মইনুল খান রাইজিংবিডিকে বলেন, ঢাকার আশুলিয়ার লাইলাক ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেড নামের একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ১৩৬টি চালানের মাধ্যমে কাপড় আমদানি করে। চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে খালাসকৃত কাপড়গুলোর জন্য কোনো শুল্ক পরিশোধ করা হয়নি। এসব কাপড়ের পুরোটাই বন্ড হাউজে নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই কাপড় দিয়ে গার্মেন্টস কারখানায় পোশাক তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কাপড়গুলো খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। শুল্ক মূল্যায়ন অডিটের দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গেলে কর্তৃপক্ষ আমদানিকৃত কাপড়ের কিছুই দেখাতে পারেনি। এমনকি মাত্র এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে খালাস করা হয়েছে, এমন কাপড়েরও কোনো হদিস মেলেনি। গত এক বছরে এই কারখানা ১৩৬টি কাপড়ের চালান আমদানি করলেও রপ্তানির তথ্যে ব্যাপক গোঁজামিল ধরা পড়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের কাগজপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এসব অনিয়মের তথ্য। আমদানিকৃত কাপড় ও বিল অব এন্ট্রির মধ্যেও রয়েছে অসংখ্য গরমিল।

তিনি আরো জানান, আমরা শুধু একটি বন্ডের তথ্য উদঘাটন করেছি। এটি একটি ইন্ডিকেশন। এ ধরনের ঘটনা ব্যাপক হারে ঘটছে। বন্ড সুবিধা নিয়ে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি ঠেকানো গেলে দেশের রাজস্ব আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত।

শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার প্রাথমিক অডিট রিপোর্ট সূত্রে আরো জানা যায়, আমদানিকৃত কাপড়ের পরিমাণ ও মূল্যের মধ্যে কোনো সাদৃশ্য নেই। কোম্পানির দাখিলকৃত ২০টি পিআরসি (প্রোসিড রিয়াইলেজেশন সার্টিফিকেট) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, রপ্তানির গন্তব্যস্থল থেকে না এসে ভিন্ন দেশ থেকে এবং কম মূল্যে অর্থ এসেছে। যা পুরোপুরি অস্বাভাবিক। তৈরি পোশাক রপ্তানি দেখানো হয়েছে জাপানে, অথচ ডলার এসেছে পেরু থেকে। ডলার পেরু থেকে কেন আসলো বা ডলার প্রেরণকারীর সাথে ক্রেতার সম্পর্ক কী, তারও কোনো যৌক্তিক ব্যাখা তারা দিতে পারেননি। ২৭টি পণ্য চালান রপ্তানি দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই ২৭টি চালানের বিপরীতে একটি ডলারও আসেনি।

আরো জানা যায়, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে অডিট দল নিশ্চিত হয়, কারখানা কর্তৃপক্ষ পোশাক রপ্তানি না করেই কিছু ক্ষেত্রে নিজের উদ্যোগে ডলার প্রেরণ করে ভুয়া পিআরসি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, রপ্তানি প্রক্রিয়ায় শিপিং বিল ও অন্যান্য কাগজপত্র উপস্থাপনেও রয়েছে নানা অসঙ্গতি। ১৩৬টি চালানের মাধ্যমে ৬১ কোটি টাকার কাপড় আমদানির প্রমাণ মিলেছে। এসব চালানের বিপরীতে ৫০ কোটিরও বেশি টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। কাপড় আমদানিতে ৬৮ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে এই পুরো শুল্কই গায়েবের প্রমাণ পাওয়া গছে।

অডিট রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়, কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা ছাড়া এরূপ অবৈধ কর্মকাণ্ড দিনের পর দিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। এরপর এ বিষয় তদন্ত করতে দুদককে দায়িত্ব দেয়া হয় বলে অপর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ আগস্ট ২০১৯/এম এ রহমান/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়