ঢাকা, সোমবার, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্বপ্নভুক || প্রশান্ত মৃধা

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৭-০১ ১:০৩:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম

প্রশান্ত মৃধা

প্রতিদিনের স্বপ্নগুলো লিখে রাখতে পারলে হত। অদ্ভুত আর আশ্চর্য সব স্বপ্ন। শেষহীন ও ক্লান্তিহীন আর দীর্ঘ কখনও ক্ষীণ এইসব স্বপ্ন আমাকে নিয়তই আচ্ছন্ন করে রাখছিল। আমি সে সব অলিখিত স্বপ্নের আখ্যান লিখব এখানে।

আজ থেকে বছর সাড়ে তিনেক আগে অর্থাৎ চার বছর আগে থেকে, যখন চার বছর থেকে একদিন কম, দুইদিন কম করে ধীরে ধীরে বছর ঘুরে তিন বছরের দিকে আসছে, সে সময়ে একদিন, যে কোনো দিনই, আমি পয়লা আধো স্বপ্ন আধো জাগরণে দেখতে শুরু করেছিলাম একটি ম্যাচের কাঠি অথবা কাঠির আকারের দণ্ড! সেই দণ্ডটা লম্বায় বড়ো হয়, আবার লম্বায় যতটা বড়ো হয় সেই অনুপাতে আড়েও বাড়ে; আবার আড়ে যে অনুপাতে বড়ো হয় তার প্রস্থচ্ছেদের বর্তুলতাও ততটুকু বাড়ে।

এরপর দেখেছি ড্রাম। ড্রামটা প্রথমে তেল বা পিচভরতি ড্রামের আকৃতিতেই ছিল! এরপর ধীরে ধীরে আকৃতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। লম্বায় যেভাবে বাড়ে, আড়েও সেভাবে বাড়ে। এভাবে বাড়তে বাড়তে এগিয়ে যায়। আমি জাগরণের ভিতর দিয়ে মাথা তুলে দেখি (ঘোরের ভিতর মাথা তুলে সেদিনই তো টের পেলাম আমার ডান হাতের তর্জনী-বৃদ্ধা একত্রিত যেন সিগারেট লুকাচ্ছি!) ড্রামটা বড়ো হচ্ছে তো হচ্ছে, বড়োই হয়ে চলেছে এবং একসময় আর ড্রামটার উচ্চতা আমার দৃষ্টির নাগালের বাইরে চলে যায়! আমি তাকিয়েই থাকি।

 

এই ঘটনার সময় আমি জীবনের দিকে নতুন করে দাঁড়াতে শুরু করেছি। পুরোনো প্রেমের স্মৃতির ভিতর দিয়ে আবার প্রেমে পড়েছি! বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের সমস্ত আবেগ প্রশ্রয় দিচ্ছি। ফলে কোনো ব্যক্তিগত ঘটনায় হঠাৎই নিজস্ব আকৃতি পাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। পাশাপাশি, যেহেতু কাঠি বা ড্রামের কোনোটাই কাউকে বলতে পারছিলাম না, ফলে নিজের স্বভাবের ভিতর এক প্রকার কেন্ন হয়ে যাওয়ার ব্যাপার ঘটে, লুকিয়ে যাওয়ার চেপে যাওয়া ছিল সেখানে। এদিকে কী আর করা, সব ঘটনাই যেন নতুন প্রেমে পড়া সহপাঠিনীটিকে জানতে হবে! কিন্তু তাকেও সব না-জানাতে পারার অব্যক্ততাই রুমমেটকে জানানোর বাসনা হয়ে দাঁড়ায়।

আমি বলি, ‘জানিস আমি প্রতিদিন কী স্বপ্ন দেখি?’

রুমমেট বলে, ‘কী?’

‘ম্যাচের কাঠির মতন আকৃতি আবার ড্রামের মতনও! ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে। আমি মাথা উঁচু করে তাকাতে চাই তবু দেখতে পারি না। মাথা যতই উঁচু করি না কেন কোনোভাবেই দেখতে পারি না। কাঠিটা বা ড্রামটা ধীরে ধীরে বড়ো হয়েই যায়। এত বড়ো হয়ে যায় যে দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। আমি ব্যর্থ হই। আমার মাথার ভিতর ভোঁ ভোঁ করে। চুলের ভিতর দিয়ে ঘাম বের হয়। আমার বুক শুকিয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে।’

‘তাই নাকি!?’

‘আরে শোন? ঘটনা এখানেই শেষ না। ইদানীং এর সঙ্গে নতুন উপসর্গ জুটেছে।’

‘কী?’

আমি নতুন গল্প বলতে শুরু করি, ‘গতকাল দেখলাম, ভরদুপুর বেলা ভার্সিটির স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে একটা বাচ্চা মেয়ে আর দুটো বাচ্চা ছেলে পার হতে গিয়ে ভার্সিটির বাসের নিচে চাপা পড়ল।’

আমার বলা থামিয়ে রুমমেট জিজ্ঞেস করে, ‘তুই শিওর যে বাসের রঙ মেরুন ছিল?’

‘ছিল। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা বাচ্চারাও সবাই ইউনিফর্ম পরা ছিল।’

‘ড্রাইভার কি ঘুমাচ্ছিল?’

‘জানি না। তবে ওই দুপুরবেলা বাচ্চাগুলো ছিল ঠিক চাঁদের মতো দেখতে।’

‘দুপুর হলে কী হবে, রোদ ছিল?’

‘রোদ ছিল মানে, চারিদিক চকচকে সোনা হয়েছিল।’

‘আচ্ছা, গল্প চালা শুনি।’

আমি আবার বলতে শুরু করি, ‘এর কয়দিন আগে, এক রাত্রে এইরকম আরো দুটো স্বপ্ন দেখেছি। সে দুটো আরো বিচ্ছিরি। এত বিচ্ছিরি যে দেখা যায় না। তাও আমাকে দেখতে হল। তুই বিশ্বাস কর বন্ধু, খোদার কসম ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। এই স্বপ্ন রীতিমতো আজব! চারুকলার সামনে দিয়ে এক দারুণ রূপসী নারী রাস্তা পার হচ্ছে এ সময় মেরুন রঙের বাসটা তারে চাপা দিল। মেয়েটা শাড়ি পরা ছিল। প্রথমে সামনের চাকায়, এরপর পিছনের চাকায় পেঁচিয়ে ওই জায়গায় মুহূর্তেই শেষ। আর তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জানলাম, সে ছিল সাড়ে চার মাসের গর্ভবতী! এ-ও দেখতে হল? এরপর আমার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি আমার সারা গা ভিজে চুপচুপে। আমি যে উঠে লাইট জ্বালাব সে উপায়ও নেই। এই দৃশ্য দেখার চাইতে মরা ভালো।’

রুমমেট বিহ্বল তাকায়। এই পর্যন্ত শোনার পর সে আর বাকি স্বপ্নের আখ্যান শুনতে চায় না। আমিও বলার মতো আর কোনো শক্তি পাই না।

 

এইদিন খানিকবাদে আমার রুমমেট স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল। সে এমনভাবে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল যেন এইসব স্বপ্ন তার কাছে বলে-কয়ে আমার চোখে ধরা দিয়েছিল। সে এভাবে ঘুরিয়ে বলল, ওভাবে ঘুরিয়ে বলল, কিন্তু কোনোটাই আমার আসলে মনঃপূত হল না। আমি তার কথা শোনার আদৌ আগ্রহ বোধ করলাম না।

আমি আহতস্বরে বললাম, ‘শোন ওসব পচা প্যাঁচাল থামা, আগে বিষয়টির ক্লু খোঁজার চেষ্টা কর। দেখ কী দাঁড়ায়। আগে কাঠি-ড্রাম দেখতাম ভালো কথা, তারপর দেখলাম চারুকলার সামনে প্রেগনেন্ট মেয়ে, ওইদিনই দেখলাম এক সুন্দরী মহিলা একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে আবার মেরুন রঙের বাস তাকে চাপা দিল। গতকাল দেখলাম ফুটফুটে বাচ্চাদের বাসটা চাপা দিল। এই নিয়ে ক্লু খোঁজ, ওইসব তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-টেখ্যা বাদ দে, কাজ হবে।’

এই বলে আমি প্রায় হাঁফাতে থাকি। আর একটি বাক্যও বলার শক্তি খুঁজে পাই না। ক্রমাগত হাঁফাতেই থাকি, যেন অনাদি অনন্তকাল আমি হাঁফিয়েই কাটিয়েছি। হাঁফানোই যেন আমার স্বস্তি!

ওদিকে আমার রুমমেট স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে লাগল। সে সন্ত্রাসের কথা দিয়ে শুরু করে। যদিও এ বিষয় আমার কাছে নতুন কিছু নয় ঠিকই, কিন্তু তার বক্তব্য হঠাৎ করেই আমার কাছে বেশ নতুন ঠেকে : ‘মানুষ কখনওই তার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে নয়। সারাটা দেশ তো বটেই, এমন কি ঢাকা শহরই তো এখন রণাঙ্গন, রাষ্ট্র নিজেই তো সন্ত্রাসে নেমে পড়েছে; যে-রাষ্ট্র ব্যবস্থা যত খারাপ সেখানে ততই নিরীহরা নিরাপত্তাহীন, ধর এই দেশে এখন ধনী-গরিব থেকে এমনকি নারী-বৃদ্ধ আর শিশু প্রত্যেকেই নিরাপত্তাহীন, একজন সন্তানসম্ভবা তার সন্তানকে জন্ম দিতে ভয় পাচ্ছে, রাষ্ট্র তার জন্যে আর সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাকি রাখতে পারেনি; এই যে সেইদিন তোপখানায় এমপি গুলি খেলো, এই দিয়েই তো প্রমাণিত হয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা যাদের হাতে তাদেরও নিরাপত্তা নেই, তারপর তো সাধারণ মানুষ!’ এরপর আমাকে উদ্দেশ্য করে কথা শেষ করল, ‘কী হে তুই দেখছি ভবিষ্যদ্বক্তা হয়ে গেলি। যাক বাঁচা গেল।’

রুমমেট এই ব্যাখ্যা কোথায় পেল তা সে নিজেই জানে। আমি একদৃষ্টে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি বিমূঢ় বিস্ময়ে! কোথায় ছিল এতদিন স্বপ্নের এই ব্যাখ্যাদার!

এরপর অনেকদিন আর স্বপ্ন নিয়ে কোনো কথা হয় না কারুরই সঙ্গে। নিজের গোপন লজ্জার কথা যেমন কাউকে বলা যায় না অথবা সংকোচে বলা হয়ে ওঠে না, সেভাবেই আমার স্বপ্নের কথাগুলো আর কাউকেই বলা হয়ে ওঠে না। স্বপ্নের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাদার রুমমেটকে তো নয়, এমনকি নিজেকেও যেন না।

 

দিন যায়, যেভাবে যায়। রাত যায়, যেভাবে যায়। গ্রীষ্ম যায়, গরম যায়, বর্ষা যায়। সারাবছরই প্রায় বর্ষা থাকে তবুও বর্ষা যায়। শীত যায়। তার আগে হেমন্ত যায়। বর্ষার সঙ্গে মিশে শরৎ হয়ে হেমন্ত হয়ে শীতও যায়। রাত যেভাবে হুট করে দিন হয় (কখনও কখনও) ঘুমন্ত মানুষের হঠাৎ জাগা অবস্থা থেকে, সেভাবে বসন্তও যায়। আমার স্বপ্নেরা শুধুই চোখে আসে। চোখে বসে। চোখ থেকে উড়ে যায়। কাউকেই বলা হয়ে ওঠে না। আমি কিন্তু তবু স্বপ্ন দেখেই চলেছি!

যেমন, এর ভিতর একদিন দেখেছি, অনেক রাতে তারারা আকাশ থেকে ঝুপ করে ঝরে পড়ছে। পড়ছে তো পড়ছে, পড়ছে তো পড়ছেই। প্রত্যেকটি তারা পতনের সূত্রের দ্রুততায় নিচ থেকে নেমে আসছে আর এরপর এক সময় তা আমার বুক বরাবর নেমে আসছে। আমার বুক ঝরে পড়ছে, দ্রুত আরও দ্রুত এবং এই সময় হঠাৎ বুঝতে পারলাম এইগুলো তারা নয় গুলি। আমি গুলির শব্দ শুনলাম তারার পতনের সঙ্গে। এখন আর কোনোভাবেই তারা পতনের সে নীরব নিস্তব্ধ শব্দ নেই বরং ভয়চকিত গুলির শব্দে ভরে উঠেছে আমার পুরোটা বুক। আমি জেগে উঠি! হাঁফাই। এবং ভাবি, কী করে রুমমেটকে বলি এই স্বপ্নের কথা। কোনোভাবেই আর বলা হয়ে ওঠে না। অনেক দিনের না-বলার অনভ্যাসে।

তবে মনে মনে, মনের আনাগোনায় দিনে দিনে এই কথা বাজে : আমি স্বপ্নে তারা দেখেছি, তারারা আমার কাছে ধরাও দিয়েছে কিন্তু তা কাজে লাগেনি। তারারা আমার বুক বিদীর্ণ করে চলে গেছে। বিছানায় আমি মৃত পড়েছিলাম।

এই থেকে আমি খুব আনমনা ও বিষণ্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ভিতরে আর যেন কোনো শক্তি ছিল না। কখনও কখনও বেঁচে থাকাই অর্থহীন বলে মনে হচ্ছিল। কেননা, আমি যে প্রেমে পড়েছিলাম, যে মেয়েটির প্রতি ছিল আমার অখ- প্রেম, তার থেকেও চোখ মন দুই-ই সরে যাচ্ছিল। আমি কী ভেবে বুঝে উঠেছিলাম যে, তারারাই যখন আমার সঙ্গে এভাবে প্রতারক আচরণ করল তখন আমার আর বেঁচে থাকার দরকারই-বা কী? ফলে, হঠাৎই তারাদের প্রতারণায় আমার প্রেম নিভে গেল অথবা বলা ভালো, আমার ভিতর থেকে প্রেমের সমস্ত সুপ্তবোধই শুকিয়ে গেল। আমি হয়ে পড়লাম প্রেমহীন। কেননা, ততদিনে আমার পুরোনো প্রেমেরও কোনো স্মৃতি নেই। সেখানেও মরচে পড়ে গেছে।

এরপর রাতদিন দিনরাত শুধু তারাদের ভাবনা ভেবেই আমার দিন চলে। আমি ভাবি, তারারাই তবে আমার হন্তারক, তারাদের কারণেই আমি বিপন্ন প্রেমিক। তার চেয়েও বড়ো কথা বিপন্ন মানুষ! নিজের বেঁচে থাকাও যেন তারাদের হাতে। এসব ভাবি প্রতিদিন, সারাবেলা দিনমান। ফলে, আমি অন্যমানুষ হয়ে যাই।

একদিন রুমমেট বলে, ‘কী রে তুই আজকাল একদম চুপচাপ, কথাবার্তা নেই? স্বপ্নের কথাও বলিস না, রাতে খালি তারাদের দিকে তাকিয়ে থাকিস, ব্যাপার কী?’

আমি কোনো কথা বলি না। রুমমেট প্রায় একই কথা আবারও বলে। সে এ-ও বলে, ‘স্বপ্ন দেখার মানুষটারেও কি ভুলে গেলি?’

আমি হাসি। আজকাল সবকিছুই আমাকে বিপন্ন-বিহ্বল করে তোলে। আমি দিনে ফাঁকা কখনও মেঘপূর্ণ কখনও মেঘশূন্য, কখনও শুধুই শরৎ-শরৎ আকাশের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকি। হলের সামনের গাছদের দিকে তাকিয়ে থাকি। রাস্তায় তাকিয়ে থাকি। হলের পাশের ইস্কুলের কচিকাঁচাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার ক্লাসে যেতে ভালো লাগে না। স্যারদের মুখগুলো হন্তারক বলে মনে হয়। ম্যাডামদের মুখগুলো তারা বলে মনে হয়, এমনকি ইস্কুলের বাচ্চাদের মুখগুলো তারা বলে মনে হয়।

এভাবে দিন যায়। আমি আমার নিত্যকার বেঁচে থাকাতেই বিপন্ন। জীবনযাপনেও অস্থির। নিজেকে নিজেতে খুঁজে পাই না। খুঁজে না পাওয়ার দিনেই সিদ্ধান্ত নিই যে আমার সমস্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যাগুলো আজ থেকে লিখে রাখব। সযত্নে তুলে রাখব আমার ডায়েরিতে।

 

 অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

 

প্রথম-প্রথম শুরুর দিককার স্বপ্নগুলো যতটুকু মনে পড়ে তুলে রাখতে লাগলাম। কিন্তু সেখানেও এক প্রকার নিজস্ব বিপন্নতা ঘটতে লাগল। সব স্বপ্ন লিখে রাখলে তো চলে না, অনেক অনেক স্বপ্নের ভিতর দিয়ে খুঁজে বের করে নিতে হয় কোন স্বপ্নটা লিখে রাখব আর কোনটা না। আর বিপন্নবোধ আসে এই জন্যে, আগে যে-যে স্বপ্ন দেখেছি তার অনেকগুলোই তো মনে করতে চাইতাম না। সেগুলোই নিজেকে বারবার মনে করতে হচ্ছে। স্মৃতি হাতড়ানো কখনও কষ্টের তা এই প্রথমে আমি বুঝলাম। আর এই বুঝলাম বলেই প্রতিদিনই আমার ডায়েরির পাতা ভরে উঠল না। হঠাৎ হঠাৎ থেমে যেত, কখনও নজর সরিয়ে নিতাম ডায়েরির পৃষ্ঠা থেকে। কখনও-বা সদ্য দেখা একটি নতুন স্বপ্ন লিখতে গিয়ে নিজেই হয়ে উঠতাম নিজের স্বপ্নের ব্যাখ্যাদার। ফলে ব্যাখ্যাটুকুও রুমমেটকে বলবার মতো করে নিজেই টুকে রাখতাম।

একদিন আগে দেখা গোটা তিনেক স্বপ্ন লিখে রেখে সেগুলো সবাইকে বলার জন্যে বারবার মন চাইল। আমি রুমমেটসহ আশপাশের রুমের আমার বন্ধুদের ডাকি এসব বৃত্তান্ত বলতে। তারা শোনার উৎসাহ দেখায় ঠিকই কিন্তু বিষয়টিতে কোনোক্রমেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে না। আমি এতে কিঞ্চিৎ মনমরা হয়ে পড়ি। কেননা এক স্বপ্ন বারবার দেখা আমার কাছে নতুন হতে পারে, কিন্তু অনেকের কাছেই তা নয়। পাশের রুমের মনির এমন একজনকে জানেও যে সিরিজ স্বপ্ন দেখে! শুনে আমি সামান্য হলেও থ। বলে কী? এও কি সম্ভব? স্বপ্ন আবার সিরিজ দেখা যায় নাকি? আশ্চর্য! আমার ডায়েরি লেখা দিন দুয়েকের মতো থেমে যায়। সারাবেলা আমার মাথায় সিরিজ স্বপ্নের বিস্ময় ঝুলে থাকে। সে বিস্ময় কেটে ওঠার পরই মূলত আমি প্রতিদিনই চিন্তাশূন্য হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতাম। তবু একদিন অনেকদিন আগে দেখা সেই কাঠি আর ড্রামের স্বপ্ন দেখলাম। তবে আজ আর গভীর ঘুমের আশ্রয়ে নয়, আধো তন্দ্রা আধো জাগরণে! এরপর অনেকদিন আমি আর ডায়েরিতে স্বপ্ন লিখলাম না। এ বছর আমার ডায়েরির পাতা প্রায় সবই খালি পড়ে থাকল, এমনকি এর পরের বছরেরও প্রায় শেষ পর্যন্ত। আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি ডায়েরি খুলেছি ঠিকই কিন্তু ডায়েরিতে একটি লাইনও লিখিনি স্বপ্ন নিয়ে। আমার রুমমেট জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু আমি বলেছি লিখছি। আবার কখনও বলেছি, কই আগে লিখতাম নাকি?

রুমমেট হঠাৎই একদিন বলল, ‘কী তোর স্বপ্ন-উপন্যাসের খবর কী?’

আমি বুঝলাম কথাটা খানিকটা ঠ্যাস-মেরে বলা। বুঝেও কিন্তু কিছু করার নেই। ওর ঠ্যাস দিয়ে এমন কথা শোনায় আমি অভ্যস্ত। বললাম, ‘ও ব্যাপার বাদ।’

‘বাদ মানে? বাংলা ভাষায় এমন “ড্রিম অ্যান্ড পিস’’ লেখা হবে না তা কি হয়?’

‘তুই থাম, ছ্যাচড়ামি করিস না!’

‘কথা বললেই ছ্যাচড়ামি? যাক “ড্রিম অ্যান্ড পিস” না হয় তো “আঙ্কেলস ড্রিম”র মতো “কাজলস ড্রিমস” নামে একটা কোনাভাঙ্গা মাস্টার পিসের অভাব বাংলা ভাষায়। তোরে দিয়া সেই অভাব যদি পূরণ হইত!’

‘চাপাবাজি থামা, নিজের কাজ কর।’

আমি রাগে ও লজ্জায় রুম ছেড়ে বাইরে যাই। এরপর আরো অনেকদিন ডায়েরির পাতা খুলে স্বপ্নের কথা লিখি না। এমনকি আত্মাভিমানে ডায়েরিটাই খুলিনি।

 

আজ খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়।

এখনও আলো ফোটেনি। দক্ষিণের আকাশে কাক ডাকছে। রাতের কোনো কোনো পাখি, বিশেষত বাদুড় এখন ভোর হচ্ছে বুঝে দ্রুত গন্তব্যে যাচ্ছে। আর আমিও যেন বাদুড়, রুমের সামনে বারান্দার কাপড় শুকানোর দড়িতে নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে। আজ স্বপ্ন এ কী  দেখছি আমি?

এ কী দেখলাম? মেয়েটি সালোয়ার বুকের কাছে নিয়ে শীতে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে গুটিশুটি মেরে চলে যাচ্ছে। তার বড়ো শীত করছে যেন। আর আমি বিছানা ছেড়ে দিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে নিজের লুঙ্গিতে কী যেন খুঁজছি। সেই ক্লাস এইটে পড়া কালে যা প্রথমে দেখে, এক দুপুরে নিজের কাপড়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম! তারপর এই তন্নতন্ন খোঁজার পরে কিছুই না পেয়ে ভয় আর কাতরতায়, লজ্জা আর সংকোচে আর যেন পৌরুষহীনতায় নিজেকে লুকানোর জন্যেই দরোজা খুলে সামনের মাঠের ঘাসের ভিতর নিজের হারানো অস্তিত্ব খুঁজছি।

মেয়েটাকে আমি কত দিয়ে ঠিক করেছিলাম। মনে পড়ে না। আচ্ছা ঠিক করার সময় মেয়েটির চেহারা দেখিনি? মনে পড়ে না। অতটুকু বাচ্চা মেয়ের চেহারা দেখলে নিশ্চয়ই তাকে ওই কাজের জন্যে... না, না... আমি অন্তত, হায় হায়...। (আমি নিজের বিপন্ন অস্তিত্ব বাঁচাতে সব ধরনের অস্তিত্ব মিলিয়েই যেন এ কাজের উৎস খুঁজি, নিজেকে দয়া করি!)... এই কাজের জন্যে আমি মেয়েটাকে ডাকিনি। তবে স্বপ্নে যে দেখলাম? এবার আর যাব কোথায়? নিজের কাঠগড়ায় নিজে।

 

মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল একটি গাছের নিচে। নিচু হয়ে। কিছু-একটা খোঁজার ভঙ্গিতে। আর আমি, আমার পরনের প্যান্টের রঙ খেয়াল নেই, জামার রঙও না, তার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকখানি হেঁটে আসায় ঈষৎ ক্লান্ত হয়ে হাঁফাচ্ছিলাম। মেয়েটা মাথা কিন্তু তখনও উঁচু করেনি। সে আরও একটু নিচু হয়ে কিছু খোঁজার ভঙ্গিতে উপুড় হয়ে বসে। আমি তার পিঠের দিকে তাকিয়ে ছিলাম? মনে পড়ে না। তবে খানিক দূরে কে যেন কর্কশ গলায় বলছিল, ‘ওই তোর দুদ ওডছে?’ এরপর খিলখিল হাসি। আমার সামনের মেয়েটি এই শুনে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত রাগত ভঙ্গিতে ওই শব্দের দিকে তাকিয়ে মুখটা সামান্য উঁচু করে আমার দিকে তাকায়। আমি তাকে কী বলেছি? মনে পড়ে না। তবে মেয়েটার হালকা পলকা হাত ধরা, হাতের কাচের চুড়িগুলো নাড়িয়ে দেখা আর তার গায়ে সস্তা পাউডার লিপস্টিকের গন্ধ সবই আমি পাচ্ছিলাম। গাছের পাতার উপর দিয়ে কোনো পাখি উড়ে যাওয়ায় পাতার ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো এসে পড়েছে তার মুখে। আমি মেয়েটির কালো মুখে ছোপ ছোপ পাউডারের দাগ দেখে আঁতকে উঠি! এতটুকুন মেয়ে! মনে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে এতটুকু মেয়ে দেখেই আমি আগ্রহ পাই। আমার হাত থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে সে নিজের সালোয়ার খোলে। আমাকে যেন কিছুই না বলার সময় দিয়ে সে পায়ের তলার ঘাসে শুয়ে পড়ে। আমি কি মেয়েটার ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিলাম। মনে পড়ে না। আমি কোমর থকে প্যান্ট নামাই। সেই ঘাসে, তার গায়ের উপর শুয়ে পড়ি।... এরপর আর কিছুতেই তার ভিতরে নিজেকে ঢুকাতে পারি না। মনে পড়ে, আমি চেষ্টা করি। চেষ্টা করেই যাচ্ছি। কিন্তু ঢুকাতে পারি না।

এরপর? মনে পড়ে না। আমি বলেছি না অন্য কেউ বলল, ‘যা তুই এখনও পাকিস নাই, পাকলে আসিস...!’ আমি মেয়েটার গায়ের উপর থেকে উঠি। দাঁড়াই। মেয়েটা তার সালোয়ারটা বুকের সঙ্গে চেপে নিয়ে গুটিশুটি হেঁটে যায়। এখনকার ঈষৎ আলোছায়া থেকে আমার পিছনের নিশ্চিদ্র অন্ধকারে।

আমার স্বপ্নভঙ্গ ঘটে।

 

ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত, সূর্য ওঠার পরও আমি বাদুড় হয়ে বারান্দার তারে ঝুলে দাঁড়িয়েই থাকি।

এরপর এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। রুমে ঢুকে রুমমেটকে জাগাই।

সে ঘুম জড়ানো চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তাকে বিস্তারিত বলি। সে চোখ থেকে ঘুম তাড়িয়ে বিস্মিত হয়ে শোনে।

এক ফাঁকে আমি বলি, ‘এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিস।’ বলে, আবারও বলতে থাকি। বলা শেষ হওয়ার আগে আবার বলি, ‘এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিস। পারলে রাজনৈতিক, নয়তো সামাজিক আর নয় অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিস।’

আমি স্বপ্ন বৃত্তান্ত শেষ করি।

 

রুমমেটের চোখের বিস্ময় ঝোলা দৃষ্টি আমার সারা গায়ে খেলে যায়। সে বলে, ‘এই স্বপ্ন ভুলে যা। মনে কর দেখিসনি। আমিও কসম খাই আর স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেব না। ভুলে যা।’ বলতে বলতে রুমমেট রুমের বাইরে চলে যায়।

এই থেকে আমি স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাই। এমনকি এরপর আমি আর স্বপ্ন দেখিনি। ডায়েরিতেও আর স্বপ্ন লিখিনি।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুন ২০১৬/এএন/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন