ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

মালয়েশিয়ার ডায়েরি

শিল্পী রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২২ ৭:২৪:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২৬ ৬:১৩:১২ পিএম

কুয়ালালামপুরে নামার পর থেকেই শুনছিলাম বাটু কেভের গল্প। শুনছিলাম ওখানে যেতে হলে অনেক উঁচুতে উঠতে হয়। তাও আবার সিঁড়ি ভেঙে।   বহু পাহাড়ে উঠেছি জীবনে। ব্যাংককে থাকাকালীন সময়ে সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের চূড়ায় বুদ্ধিস্ট টেম্পেলেও গিয়েছিলাম একবার। তখন অবশ্য তরুণী ছিলাম, এখন বয়স বেড়েছে অনেক। অমন করে শুনলে একটু ভাবনায় পড়তেই হয়।

যাবার দিন সকালে ঘুম উঠেই কোমরে ব্যাথা অনুভব করলাম। হঠাৎ কোমরে ব্যাথা হবার মতো কোনো কারণই হয়নি। মনে মনে ভাবলাম, ব্যাথাটা মানসিক নয়তো? সবার কথা শুনে ভয়ে ব্যথা শুরু হয়ে গেলো নাকি? আমার মেয়ে বার বার বলতে লাগলো ব্যথা হলে সিঁড়ি বেয়ে অতো ওপরে ওঠার ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। কিন্তু হার মানতে ইচ্ছে হলো না। এসব ব্যাপারে হার মানতে ইচ্ছে করে না কখনোই। নাস্তা খেয়ে প্যানাডল (প্যারাসিটামল) খেয়ে নিলাম দুটো। এরপর একটা নিরিবিলি জায়গায় বেছে নিয়ে মেয়ের সাথে যোগাসনের কিছু ব্যাকের স্ট্রেচ করে নিলাম। আমার মেয়ে আবার খুব দক্ষ এসব ব্যাপারে, ওকে যোগী বললে ভুল হবে না।

চলে গেলাম বাঁটু কেভে, যেয়ে দেখলাম সিঁড়ি উঠে গেছে পাহাড়ের চূড়ায়। পাশে বিশাল এক সোনালী মূর্তি। লর্ড মুরুগানের মূর্তি। দেখেই ভালো লেগে গেল। এই গুহার নামকরণ হয়েছে সানগাই বাঁটু (পাঁথরের নদী) নদীর নামে। এই নদীর পাশের গ্রামের নামও বাঁটু কেভ। ৪০০ মিলিয়ন বছর পুরনো।

২৭২ স্টেপস, লাগবে টেম্পেলে পৌঁছুতে। তারপর আরো ১৩৫ স্টেপস লাগবে ডার্ক কেভে যেতে। শুরু করলাম ওপরে ওঠা। চারিদিকে বাঁদরের ছুটোছুটি। এক জায়গা থেকে ঝুলে আরেক জায়গায় যাচ্ছে। মানুষের হাত থেকে খাবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কারো পানির বোতল টেনে নিয়ে অদ্ভুত পদ্ধতিতে বোতলের পেছন ফুঁটা করে পানি খেয়ে নিচ্ছে। আমি যে এতো ওপরে উঠছি তা ভাববার সময়ই পেলাম না। ওদের কাণ্ড দেখেতে দেখতেই এক সময় ২৭২ ধাপ পেরিয়ে একদম পাহাড়ের চূড়ায় চলে এলাম। এই কেভটা খোলা মেলাই বলা চলে। কেমন চিটচিটে একটা গরমে অস্বস্তি লাগছিল কিন্তু ভালো লাগছিল। একেক কোণায় মন্ত্র পাঠ শোনা যাচ্ছে। এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলাম, শাড়ি পরে, গোলাপি রঙের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে অতোগুলো সিঁড়ি ভেঙে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। একেই বলে ধার্মিকতা। ভালো লাগল দেখে। এমন আরো অনেকেই ছিলেন যারা আমার মতো টুরিস্ট নয়, উপাসনা করতেই গিয়েছেন।

ওখান থেকে বের হয়ে ডার্ক কেভে যাবার জন্যে টিকেট কিনলাম। ট্যুর শুরু হতে ৪০ মিনিট বাকি। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। সাথে কিছু হালকা খাবার ছিল আর ছিল পানি। আমি এবং আমার মেয়ে প্রথম থেকেই খুবই সতর্ক ছিলাম, আমাদের পানি বা খাবার যেন বাদুড় নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। অপেক্ষা করবার সময় ভাবলাম কিছু খেয়ে নেই কারণ ট্যুরটা ৪৫/৫৫ মিনিটের হাঁটা পথ।

খুব সাবধানতার সাথে কাগজে মোড়ানো কিছু খাবার মুখে দিয়েই লুকিয়ে ফেলছিলাম যেন ওরা দেখতে না পায়। তার কি আর উপায় আছে? সেই কোন দুর থেকে গন্ধ শুঁকে শুঁকে একদম আমাদের কাছে চলে এলো একজন অতি উৎসাহী বানর। আমরা সাথে সাথে সবকিছু ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে  ফেললাম যেন কোনো সুযোগই না পায়। বাদুড় আমার মেয়ের একদম গা ঘেঁসে এসে বসে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো খাবারটা কোথায় রাখলাম।  চোখ মুখের অভিব্যাক্তি দেখে বুঝবার উপায় নেই ও মানুষ না। এমন করে লক্ষ্য করতে লাগলো। আমার মেয়ে জোরে “হুশ” করে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে ঝট করে দাঁড়িয়ে গেলে, বানর আমার পেছনে চলে এলো। হঠাৎ আমার পিঠে চাপড়ে দেবার মতো একটা ধাক্কা খেলাম আমি,  পুরো ব্যাপারটাতেই হাসছিলাম আমরা। হাসতে হাসতেই চিৎকার দিয়ে উঠলাম বানরের চাপড় খেয়ে। এরপরের মুহূর্তেই বানর পালিয়ে গেল। আমার মেয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘তোমার খাবার নিয়ে গেছে মা’। আমি বললাম, অসম্ভব, বলেই ব্যাগের দিকে তাকিয়ে  দেখি ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা খাবারটা টান দিয়ে বের করে নিয়ে গেছে ততক্ষণে।  ঘটনাটা ঘটলো দুই সেকেন্ডের মধ্যে। এত দক্ষতায় বিস্মিত এবং মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমরা। হেসে উড়িয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।  

৪০ মিনিট পার হয়ে গেল। আমরা ঢুকে গেলাম ডার্ক কেভে। প্রথমে কিছুক্ষণ বাইরের আলো বা ওপর থেকে পাহাড়ের ছাদ চিরে ঢোকা আলোর ছিটে ফোঁটা দেখা যাচ্ছিল। বাদুড়ের কিচিরমিচির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল   বেশ। মনে হলো যেন মেলা বসেছে ওদের। এরা গুহার বাইরে যেয়ে ফল খেয়ে গুহার ভেতরেই থাকে। তাই এদের গুহার মুখেই বসবাস।

আস্তে আস্তে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢুকে গেলাম যেখানে চোখ বন্ধ আর খোলার মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝা গেল না। এখানেও বাদুড় আছে তবে  এখানকার বাদুড়গুলো অন্ধ, দেখতেও একটু ভয়ঙ্কর গোছের। এরা অন্ধ হয় কারণ ওদের আসলে দেখার উপায়ও নেই অতো অন্ধকারে। এই অন্ধ বাদুড়গুলো পোকা খায়। সেই পোকা ধরবার কৌশলও ওদের জানা আছে।

এই গুহায় সাপও আছে। হলুদ রঙের লম্বা সাপ, তবে এরা বিষাক্ত নয় মোটেও। গুহার গা বেয়ে বেয়ে অনেক ওপরে উঠে যেতে পারে বাদুড় বা অন্য পোকা মাকড় খাবার আশায়। গুহার ভেতরে আরো আছে মাকড়শা, বৃশ্চিক এবং অন্যান্য অনেক ধরনের পোকামাকড়।

সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার জায়গাটায় এখনো বিভিন্ন রকম ফরমেশন চলছে। পানি জমা হচ্ছে কোথাও কোথাও। টর্চের আলো ফেললেই লাইম স্টোনগুলো চিক চিক করে জ্বলছে। কিছুদুর হাঁটবার পর হঠাৎ ঝরঝরে বাতাস অনুভব করলাম। কোথা থেকে বাতাস এলো এমন বন্ধ গভীর গুহার ভেতরে! আরো কিছুদুর হাঁটবার পর হালকা আলোরও সন্ধান পাওয়া গেল। আরেকটু দূরে একফালি সবুজের সজীবতা। কি বিস্ময়ে ভরা প্রকৃতির এই সৃষ্টি। মুগ্ধতায় ভরে গেল মন। আরো বিস্ময় লাগল মানুষ খুঁজে খুঁজে কতকিছু বের করেছে এক সময়, এবং তখনকার সময় এই ধরনের   জায়গাগুলো মানুষের কাছে পবিত্র জায়গা মনে হতো বলেই হয়তো সেই সব জায়গায় মন্দির বানিয়ে ফেলতো। যতবেশি বিস্ময় ততবেশি বিধাতার সৃষ্টির প্রতি শদ্ধা জাগে হয়তো মনে।

শিল্পী রহমান: প্রাবন্ধিক ও লেখক, অস্ট্রেলিয়া


ঢাকা/সাইফ

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও