ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বিহঙ্গমানব

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৮ ১:১০:৫৪ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২৮ ১:২৩:০৬ এএম

বড় হয়ে কি হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা সবাই বলতাম, পাইলট। একটু বড় হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি, পাইলট কেন হতে চাই? আকাশের অপার রহস্য ছোঁব, তাই।

আরো বড়ো হয়ে দেখেছি শুধু পাইলট কেন, বিমানের ক্রু বা বিমানবালা হবার অদম্য আগ্রহ তরুণ– তরুণীদের মধ্যে। শুধু কি আকাশ ছোঁয়া, পা রাখা যায় অজানা ভূ-গোলে। মহাভারতের একটি চরিত্রের নাম গরুড়। পড়েছি কৈশোরে। কশ্যপের স্ত্রী বিনতা স্বামীর বরে জন্ম দেন গরুড়কে। জন্ম নিয়েই গরুড় উড়াল দেয় আকাশে। আহ আমিও যদি উড়তে পারতাম। আমার মতো যারা কম বয়সে মহাভারত পড়েছেন বা ইকারুসের গল্প পড়েছেন, তাদের কার না ডানা লাগিয়ে উড়তে ইচ্ছে হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার নাম গারুদা, গরুড় চরিত্র থেকেই নেয়া।

যতবার ধাতব গরুড়ের ডানায় ভর দিয়ে পাড়ি দেই সাগর, মহাসাগর, চেনা-অচেনা ভূ-খণ্ড, ততবারই ইচ্ছে হয় জেনে নিই বিহঙ্গমানবদের গল্প। এই যে তরুণ-তরুণী ক্রুরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে, উড়ে বেড়াচ্ছে, কতটা  সুখী ওরা? দুবাই থেকে নিউ ইয়র্ক, ১৩ ঘণ্টার এক লম্বা ভ্রমণ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিমান ইওরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাসের এ৩৮০-৮০০ এখন ৪১ হাজার ফুট ওপরে। মেঘরাজ্যেরও ঢের ওপরে। পায়ের নিচে মেঘমালা দুপুরের রোদে ঝকঝক করছে। এমিরাতসের এই বিশাল দ্বিতল বিমানটির নিচতলায় দুটি ফুড-কেবিন। 

আমি হাঁটতে হাঁটতে পেছনের কেবিনে চলে যাই। ছিপছিপে বেলজিয়ান তরুণ ডিনের সাথে আড্ডা জমিয়ে তুলি। ২৮ বছরের এই তরুণ ক্রু’র চোখে মুখে স্বপ্নের ফেনা। পাইলট ওকে হতেই হবে। এই স্বপ্নযুদ্ধে রক্তক্ষরণ কম হয়নি, হারিয়েছে প্রেমিকা বারবারাকে। ডিন অবশ্য একটুও দোষ দেয় না মেয়েটিকে। ওর সঙ্গে তো আমার দেখাই হতো না, কখনো দুমাসে একবার, আবার কখনো তিনমাসে। এভাবে কি আর সম্পর্ক টেকে? তার মানে তুমি এখন হাত পা ঝাড়া? যখন যেখানে, তখন সেখানে? আরে না না। আমার গার্লফ্রেন্ড আছে, ক্লারা,  পোলিশ। ও আমার চেয়ে দুই বছরের বড়। বেশ বোঝে আমাকে। ক্লারাও এমিরাতসেই, এয়ার ক্রু। বাহ, তাহলে তো খুবই ভালো। ধাতব পাখির দুই ডানা তোমরা দুজন, পূণাঙ্গ উড়াল, আকাশ তো তোমাদেরই। কোথায় ক্লারা? এই ফ্লাইটেই আছে তো? তুমি তো দেখছি খুবই পোয়েটিক এবং রোমান্টিকও। না, না, ও এই ফ্লাইটে নেই। আসলে কি, আমরা কখনো একসাথে বিজনেস ট্রিপ করিনি। না, কখনোই না। এমিরাতসের স্টাফদের সকলেরই বেইজস্টেশন দুবাই।

কোম্পানি সবাইকে দুবাইয়ে অ্যাপার্টমেন্ট দিয়েছে। আমরা ফ্লাই করে যেখানেই যাই না কেন, ফিরতি ফ্লাইটে আবার দুবাইয়েই ফিরে আসি। সুতরাং ওর সঙ্গে আমার সপ্তাহে অন্তত একবার দেখা হয়ই। হ্যাঁ, কখনো এমন হয় যে আমরা মাত্র দু/তিন ঘণ্টা  একসাথে কাটাতে পারি। তারপর হয় ওর, না হয় আমার ফ্লাইট থাকে। 

আর সোশ্যাল লাইফ? এই ধরো, বন্ধুদের সাথে গেট টুগেদার, হই-হুল্লোড়। বাবা, মা, ভাই-বোনের সাথে দেখা, সময় কাটানো? একদমই হয় না? হয়, যখন ছুটিতে থাকি। শোনো, ঘরমুখোদের জন্য এ পেশা নয়। যারা বোহেমিয়ান, ঘুরে বেড়াতে চায়, দেখতে চায় পৃথিবীকে, এটা তাদের জন্য। তুমি হয়ত জেনে অবাক হবে, আমাদের বেতন কিন্তু খুবই কম। মূল বেতন মাত্র এক হাজার ডলার। এর ওপর ফ্লাইং আওয়ার হিসেব করে পাই ফ্লাইট-এলাউন্স। সেটাও খুব বেশি নয়। প্রতি ঘণ্টার জন্য মাত্র ৫০ দিরহাম। পনের ডলারের মতো। মাসে কেউ ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করতে পারে না। সুতরাং গড়ে আমরা মাসে আয় করি মাত্র ২২০০ থেকে ২৩০০ ডলার। তুমিতো নিউ ইয়র্কে থাকো, গ্রোসারিতে কাজ করেও অনেকে এর চেয়ে বেশি আয় করে। আর যারা ট্যাক্সি চালায়, তারাতো এর তিনগুণ আয় করে। একটা সুবিধা আছে। আমাদের তেমন কোনো খরচ নেই। যে দেশে যাই, সেখানকার থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব কোম্পানির। লম্বা ভ্রমণের পর দুই দিন বিশ্রামের জন্য পাই। এই দুই দিনে নতুন শহরটা উল্টে-পাল্টে দেখে নিতে পারি। 

একা একটি নতুন শহরে? 

একা কেন? অন্য ক্রুরা আছে না? আমাদের মধ্যে খুব শক্ত একটি বন্ধন গড়ে ওঠে। আমরা একে অন্যের বন্ধুতো বটেই, তার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠি।

বলছিলে পাইলট হতে চাও। নির্দিষ্ট ফ্লাইং আওয়ার কমপ্লিট করে ফেলেছো? এখন কি লাইসেন্সের অপেক্ষায়?

তুমি খুবই ফাস্ট চিন্তা করে ফেলো। না, আমি এখনো শুরুই করিনি। তবে তোমাকে বলে রাখছি, কোনো একদিন এমিরাতসে ফ্লাই করতে গিয়ে শুনবে, আমি ক্যাপ্টেন ডিন, ওয়েল্কাম টু এমিরাতস। আমি হাসতে হাসতে ডিনের পিঠ চাপড়ে দিই। এই তরুণের আত্মবিশ্বাসে আমি মুগ্ধ। আমার মন বলছে একদিন ও নিশ্চয়ই পাইলট হবে। 

আমাদের সঙ্গে তখন যোগ দেয় নিকোলা। নিকোলার বাড়ি সার্বিয়ায়। ডিনের চেয়ে ও এক বছরের বড়। ওর বয়স ঊনত্রিশ। আমি বলি, এটাতো মেয়েদের নাম। এই নাম তোমাকে কে দিল? ও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, সি দিয়ে যে নিকোলা সেটা মেয়ে, আমার নাম কে দিয়ে। নিকোলার কোনো গার্ল ফ্রেন্ড নেই। ও দুহাত ফ্ল্যাপ করে বলে, আমি পাখি, পূর্ণ স্বাধীন। সব গাছই আমার বাসা। এক ফাঁকে ডিন জানতে চাইলো আমি হার্ড ড্রিংক চাই কিনা। আমার সম্মতি পেয়ে ও তিনটি গ্লাসে বরফের টুকরোর ওপর জ্যাক ডেনিয়েলের তিনটি মিনি বোতল খুলে ঢেলে দিল। তারপর ওতে কোক ঢেলে আমার ও নিকোলার হাতে তুলে দিল। আমরা টোস্ট করলাম। ওরা বলল হ্যাপী ফ্লাইট, আমি বললাম, জয় বিহঙ্গমানব।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত

 

ঢাকা/সাইফ/নাসিম 

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও