ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ চৈত্র ১৪২৬, ০২ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

মার্কিনীদের অস্ত্রপ্রীতি

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৩ ২:০৩:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৩ ২:০৩:৩৫ পিএম

যাদের বয়স একুশ বছরের নিচে, তাদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন নয়জন মানুষ মারা যায়। ২০১০ সালে একুশ বছরের কম বয়সীদের দ্বারা ৩৪৫৯ জন আমেরিকান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই ঘটনাগুলির মধ্যে ৯৩৬টি ছিল আত্মহত্যা, ১৫০টি দুর্ঘটনা এবং ২৩২৯টি, অর্থাৎ সিংহভাগই ছিল নির্ভেজাল খুন।  এই পরিসংখ্যান আমাদের নিশ্চয়ই এই দিক নির্দেশনা দেয় যে, একুশ বছরের কম বয়সীদের হাতে যেন আগ্নেয়াস্ত্র না থাকে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।

এফবিআইয়ের এক রিপোর্টে জানা যায়, খুন এবং ভায়োলেন্স করার অপরাধে যারা গ্রেফতার হয় তাদের অধিকাংশেরই বয়স ১৮ থেকে ২৪ বছর। এই শ্রেণির মানুষের হাতে যদি আগ্নেয়াস্ত্র না থাকে, তাহলে আমেরিকায় খুন এবং ভায়োলেন্সের পরিমাণ ব্যাপক হারে কমে যাবে। ১৩টি অঙ্গরাজ্যের মোট বন্দুকজনিত ভায়োলেন্সসমূহ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, যদি আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বৈধ বয়স এই অঙ্গরাজ্যগুলোতে ২১ বছর করা হত, তাহলে মোট বন্দুকজনিত ভায়োলেন্সের এক চতুর্থাংশ   কমানো যেত।

সাধারণত রোগের কারণ উদ্ঘাটন করতে না পারলে, সঠিক চিকিৎসা দেয়া যায় না, অতঃপর রোগীর মৃত্যু ঘটে। কিন্তু কারণ জানি, চিকিৎসা ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে না বলে রোগী মারা যাচ্ছে, এই অবস্থা অবলোকন করতে কেমন লাগে? আমেরিকানরা জানে কি করলে খুন এবং ভায়োলেন্স কমানো যাবে কিন্তু তারা সেটা করছে না। তারা যে সেটা করছে না, তা জানা যাবে কত বছর বয়সে আগ্নেয়াস্ত্র কেনা বা নিজের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা যায় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সেই আইনটা জানলেই। আমেরিকা একটি আজব দেশ। এই দেশে ৫০টি অঙ্গরাজ্য আছে, প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যের রয়েছে নিজস্ব আইন। খুব কম ক্ষেত্রেই সমস্ত আমেরিকানদের জন্য একটি ফেডারেল আইন প্রযোজ্য।

অস্ত্র কেনা এবং নিজের দখলে রাখার ক্ষেত্রে ফেডারেল আইনটি হল, পিস্তল জাতীয় অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে বয়স হতে হবে ২১ কিন্তু শর্টগান বা রাইফেল জাতীয় অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে বয়স ১৮ হলেই চলবে। নিজের দখলে অস্ত্র রাখার ক্ষেত্রে আইনটি কিন্তু আরো শিথিল। এক্ষেত্রে পিস্তল জাতীয় অস্ত্র রাখা যাবে বয়স ১৮ হলেই, কিন্তু শর্টগান বা রাইফেল নিজের দখলে রাখার ক্ষেত্রে কোনো বয়সের বাধ্যবাধকতা নেই।

কিন্তু অনেক অঙ্গরাজ্যই, পিস্তল, যা টিনেজারদের হাতে থাকা সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ, নিজের দখলে রাখার ক্ষেত্রে ফেডারেল আইনটি মানছে না। আলাস্কা, আরিজোনা, আরকানসাস, ক্যলিফোরনিয়া, দেলাওয়ার, ফ্লোরিডা, আইদাহো, ইন্ডিয়ানা, লুইজিয়ানা, মেইন, মিশিগান, মিনেসোটা, মিসিসিপি, মিজৌরি, মন্টানা, নেভাদা, নর্থ ডাকোটা, ওহাইও, ওকলাহোমা, অরেগন, পেনসিলভানিয়া, রোড আইল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, উতাহ, ভারমন্ট, ওয়াশিংটন এবং উইস্কন্সিন অঙ্গরাজ্যে নিজের দখলে পিস্তল জাতীয় হাতবন্দুক রাখতে বয়সের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে দোকানে গিয়ে নিজের নামে কেনার ক্ষেত্রে বয়সের বাধ্যবাধকতা ক্ষেত্র বিশেষে ১৬ থেকে ২১ বছর।

এ যেন ‘আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান’ এর মতো অবস্থা। কেন আমেরিকানরা বন্দুকজনিত ভায়োলেন্স বা খুনের ঘটনা কমানোর উপায় জানা সত্ত্বেও তা করছে না? অনেকে বলেন, অস্ত্র উৎপাদন এবং বিক্রির ব্যবসা কমে যাবে বলেই ওরা অস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে বয়সের বাধ্যবাধকতা কড়াকড়িভাবে আরোপ করছে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই যুক্তিটি মানি না। আমেরিকানদের ব্যবসায়ের অভাব নেই। টাকা উপার্জনের হাজারো উপায় ওদের জানা আছে। নিজের দেশের মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেকে দিয়ে টাকা কামানোর জাতি আমেরিকা না। তাহলে আর কি কারণ হতে পারে? আমার যেটা মনে হয়, স্বাধীনতা বিষয়টাকেই ওরা বড় করে দেখছে। এক্সেস টু ফায়ারআর্মস, ফ্রি কান্ট্রি আমেরিকার স্বাধীন নাগরিকদের আরো একটি স্বাধীন অধিকার। তা ছাড়া ঐতিহ্যগতভাবেও আমেরিকানরা অস্ত্র রাখতে এবং এর ব্যবহার করতে ভালোবাসে। এখন তো নিরাপত্তার বিষয়টাও অনেকে উত্থাপন করছেন।   

২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বরে কানেক্টিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢুকে এক লোক যখন ২৬ জন নিস্পাপ শিশুকে গুলি করে হত্যা করে, তখনো নিজের কাছে অস্ত্র রাখার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সনদজনিত বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করা হবে কি-না এই প্রশ্ন উঠেছিল। আমি তখন লন্ডনে বেড়াতে গেছি। ঘরে বসে টিভিতে এই বিষয়ের ওপর একটি বিতর্ক দেখছিলাম। একজন আমেরিকান নাগরিক বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় জোর দিয়ে বলছিলেন, এই ঘটনাটি ঘটতো না যদি স্কুলটিতে বেশ কজন অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী থাকতো, কাজেই অস্ত্রধারীদের প্রতিহত করার জন্য আরো বেশি করে অস্ত্রের ব্যবহার করতে হবে। আণবিক বোমা পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে, তাই বলে কি আণবিক বোমা তৈরি বন্ধ হয়েছে, না হবে? বিজ্ঞানের কুফল কিছু থাকতেই পারে, তাই বলে আমরা বিজ্ঞানবিমুখ হতে পারি না। কি অকাট্য যুক্তি। এই লোককে কে বোঝাবে যে অস্ত্র হয়ত সমস্যার সমাধান করতে পারে কিন্তু অস্ত্র নিজেই তো একটি মহাসমস্যার নাম। ফ্রি আমেরিকান বলে কথা।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত


ঢাকা/সাইফ