RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৬ ১৪২৭ ||  ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আমার দেখা টোকিও (পর্ব-১)

পি.আর. প্ল্যাসিড, জাপান থেকে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৩৯, ১৫ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
 আমার দেখা টোকিও (পর্ব-১)

ভ্যান্ডিং মেশিন।  যাকে জাপানি ভাষায় বলা হয় জিদো হামবাই কি।  পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে সবচেয়ে ভ্যান্ডিং মেশিন আছে জাপানে।

এর কারণ হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে জাপান নিরাপদ।  এজন্যই জাপানের রাস্তাঘাট, গ্রামাঞ্চল বা শহরের সর্বত্রই ভ্যান্ডিং মেশিন চোখে পড়ে। এমনকি জনমানববিহীন এলাকাতেও রয়েছে এই ভ্যান্ডিং মেশিন।

জাপানে আমি ১৯৯১ সাল থেকে বসবাস করছি। বর্তমান জাপানের অনেক কিছুই আমার চোখের সামনে হয়েছে বললে ভুল হবে না।  এছাড়া কাজের জন্য এবং নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে নানান বিষয়ে পড়াশোনা করে এবং ইউটিউব দেখে জাপানের অতীত-বর্তমান অবস্থা জানার চেষ্টা করি। দেখার যেমন শেষ নেই, জানারও শেষ নেই।  অনেক কিছুই এই জাপানে দেখে জেনেছি এবং শিখেছি। এর মধ্যে ছোট একটি বিষয়, আমি যখন জাপান আসি তখন এত বেশি  ভ্যান্ডিং মেশিন রাস্তার ধারে কিংবা কোনো মার্কেটের সামনে বা বাসা বাড়ির সামনে দেখিনি। দেখিনি এর ভিতর রেখে বিক্রি করা এত জিনিষও।

যতই দিন যায় টোকিওর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই ভ্যান্ডিং মেশিনের পরিবর্তন আর পরিবর্ধনের লক্ষ্য করছি।  দিনদিন এর ভিতরে রাখা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি পরিবর্তন ঘটছে বিভিন্ন পানিয়ের পরিমাণের ওপর তার পাত্রের আকৃতিও। পাশাপাশি এই ভ্যান্ডিং মেশিন থেকে সহজে সামগ্রী ক্রয়ের পদ্ধতিও করা হচ্ছে সহজতর।

আমরা অনেক সময় কথার ছলে বলি, জাপানের নিজস্ব কোনো ট্যাকনোলজি নেই, নেই কোনো প্রাকৃতিক সম্পদও। কোনো কিছু না থাকার পরেও দেশকে যেভাবে জাপানিরা উন্নতির শিখরে তুলে এনেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংস প্রাপ্ত দেশকে, এর পেছনে কাজ করেছে দেশের নাগরিকদের দেশপ্রেম আর দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবার ঐকান্তিক ইচ্ছে ও প্রচেষ্টা। পাশাপাশি সরকারের ইচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনা। যে কারণে মানুষ আজ ভোগ করতে পারছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল। সাধারণ এই ভ্যান্ডিং মেশিনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কি থেকে কি হয়েছে এর প্রয়োজন ও ব্যবহার পদ্ধতি।  নিত্য দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, এমন কি মূহুর্তের যেকোনও কিছুর তৃষ্ণা মিটাতেও আজ ভূমিকা রাখছে ভ্যান্ডিং মেশিন।

জাপানে প্রথম ভ্যান্ডিং মেশিন চালু হয় ১৮৮৮ সনে সিগারেট বিক্রির মাধ্যমে। বর্তমানে জাপানে এই মেশিন রয়েছে ৫.৫২ মিলিয়ন।  এর বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৬.৯৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন। টোকিওতে কতগুলো ভ্যান্ডিং মেশিন আছে তার সঠিক কোনো সংখ্যা জানা না গেলেও একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, টোকিওর রাস্তায় ১৫ মিনিট পথ হাঁটলে ১৯টিরও বেশি ভ্যান্ডিং মেশিন চোখে পড়ে, যাতে ২৪ ধরনের আইটেম বিক্রি হয়।

লেখাটি শুরু করে নিজেই একটি পরিসংখ্যান করেছি।  টোকিও রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে ১৫ মিনিটের পথ হেঁটে যেতে ২০টি ভ্যান্ডিং মেশিন দেখেছি।  আমার বাসা থেকে রেল স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে যেতে ১২টি ভ্যান্ডিং মেশিন রয়েছে রাস্তার দুই পাশে, যা ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে ধরা যায় এমন দূরত্বের মধ্যে। আর হেঁটে যাবার সময় আরো কিছু চোখে পড়ে।  এতেই প্রমাণ হয় জাপানে এই ভ্যান্ডিং মেশিনের চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা অনেক।

কোথাও কোথাও পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিজেরাই ভ্যান্ডিং মেশিন বসিয়ে নিজস্ব প্রোডাক্ট বিক্রি করে। আবার কোথাও কোথাও এই মেশিন বিক্রি করা হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেশিন ক্রয় করে সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করেন বাড়ির বা কোম্পানির মালিকেরা। এসব মেশিনে সচরাচর এক হাজার ইয়েনের নোট ঢুকিয়ে পছন্দের সামগ্রীর ওপর লেখা মূল্যের বাটন চাপলে প্রত্যাশিত সামগ্রী মূহুর্তের মধ্যেই বেরিয়ে আসে। সাথে বাকি খুচরা ইয়েনও বেরিয়ে আসে।  সব সামগ্রীর একটি করে নমুনা দেওয়া থাকে, যার গায়ের ওপর দামও লেখা থাকে।

বর্তমান সময়ের ভ্যান্ডিং মেশিনগুলো আগের তুলনায় অনেক আধুনিক হয়েছে। মেশিনের ওপর স্ক্রিন রয়েছে। সেই স্ক্রিনে বিভিন্ন সামগ্রীর ছবির প্রদর্শিত হয়, যার ওপর দামও লেখা থাকে।  চাহিদা অনুযায়ী সামগ্রীর ওপর চাপ দিলে সেটি সামনে চলে আসে এরপর মূল্য পরিশোধ করলে বেরিয়ে আসে নির্ধারিত সামগ্রী।  এজন্য নগদ অর্থেরও প্রয়োজন হয় না।  কারো কাছে যদি নগদ অর্থ না থাকে কিংবা নগদ থকলেও ডেবিট কার্ডে রিজার্ভ রাখা ইয়েন দিয়ে কিনতে চায় তারও ব্যবস্থা রয়েছে।  অন্ধদের জন্য বিশেষ সাংকেতিক কোড বা ভয়েস দেওয়া রয়েছে, যাতে তারাও সহজে সামগ্রী পছন্দ করে দাম পরিশোধ করতে পারে।

এক সময় জাপানে যখন কাজের সন্ধানে প্রচুর বিদেশি আসতে শুরু করে তখন কিছুটা চুরির ঘটনা ঘটে। আমার নিজের চোখে দেখা, একবার কয়েক ইরানি রাস্তার পাশ থেকে এক ভ্যান্ডিং মেশিন তুলে কাধে করে নিয়ে রওনা দিয়েছে। উদ্দেশ্য ভিতরে থাকা সব অর্থ আত্মসাৎ করা।  ওরা এই মেশিন নিয়ে পালানোর আগেই দ্রুত পুলিশ এসে তাদের পাকড়াও করে।

এই ভ্যান্ডিং মেশিনের মাধ্যমে শুরুর দিকে কেবল সিগারেট আর পানীয় বিক্রি হলেও এখন নিত্য প্রয়োজনীয় বলতে যা বোঝায়।  সেক্স ডল, কনডম থেকে শুরু করে ছাতা, খাবার, মহিলাদের প্যাড এক কথায় সবই থাকে এই ভ্যানডিং  মেশিনে।

সম্প্রতি যোগ করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিমও। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, শীতের দিনে গরম কফি আর গরমের দিনে ঠান্ডা কফির ব্যবস্থা আছে। এমনকি আগে শুধু ক্যান বা বোতলে কফি পাওয়া যেতো। এখন গরম পানিতে নিজে কফি বানিয়ে পরিমাণ মতো দুধ চিনি দিয়ে কফি বানিয়ে খাবার ব্যবস্থাও করা রয়েছে এই মেশিনে।

বর্তমান জাপানে কে কতটা লক্ষ্য করছেন জানি না। বাইরে থেকে আসা বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের পর্যটকদের কাছে এটি একটি অবাক করার মতো বিষয় বলে মনে হয়।

পি.আর. প্ল্যাসিড:  জাপান প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক     

 

/সাইফ/

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়