RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

আমার দেখা টোকিও (পর্ব-৪)

পি.আর. প্ল্যাসিড, জাপান থেকে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:৫৫, ৭ মে ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
আমার দেখা টোকিও (পর্ব-৪)

৪. টোকিও স্কাইট্রি: বর্তমান জাপানের সবচেয়ে  উচু ভবন বা টাওয়ারের নাম হচ্ছে টোকিও স্কাইট্রি।

যা কি না পৃথিবীর সবচাইতে উচু টাওয়ার বা স্ট্রাকচার। জাপান ছোট বড় অনেকগুলো ব-দ্বীপের সমন্বয়ে গড়ে উঠা একটি দেশ।  লোক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ৬৫ লাখের ওপর যা বাংলাদেশের লোক সংখ্যার চেয়ে কম। যদিও আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় তিনগুণ বড় জাপান।

আমরা অনেক সময় বলে থাকি, জাপানের নিজস্ব কোনও টেকনোলজি নেই।  তা না থাকলেও মাথা খাটিয়ে ওরা পৃথিবীর অন্য যেকোনও দেশের টেকনোলজিকে ফলো করে তাদের চেয়েও ভালো কিছু করার ক্ষমতা রাখে এই জাতি।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এ জাতির প্রতিটি নাগরিকই যেন মনের মধ্যে একটি বিষয় লালন করে, তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। হয়তো বিষয়টি বিদেশি কেউ বুঝলেও অনেকেই আবার ওদের বাহ্যিক চেহারা ও আচরণের কারণে বুঝতে অক্ষম। ওদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করলেই ওদের ভিতরের এই রূপ সহজে বুঝা যায়।  এছাড়া সবাই ওদের সম্পর্কে এক বাক্যে ভালোই বলবে, এটাই স্বাভাবিক।

একইভাবে জাপানিদের মধ্যে মাথা উচু করে নিজেদের পরিচয় দেবার মতো মনোভাব সবসময় কাজ করে, যা এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। ওদের এমন মনোভাবের কারণেই যতটা শুনেছি টোকিও টাওয়ার থেকে আরো উচু টাওয়ার তথা পৃথিবীর সর্বোচ্চ টাওয়ার বা স্ট্রাকচার তাদের নির্মাণ করার এই চিন্তার জন্ম।  টোকিওর সুমিদা ওয়ার্ডে নির্মিত এই সর্বোচ্চ টাওয়ার ২০১০ সালে কাজ শেষ হয়।  সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০১২ সালের ২২ মে।

টোকিও স্কাইট্রির উচ্চতা ৬৩৪ মিটার বা ২০৮০ ফিট। মজার বিষয় হচ্ছে, এর উচ্চতা নির্ধারণ করা হয় এক ধরনের ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এখানে একক কোনও সিদ্ধান্ত ছিল না। যেভাবে এর উচ্চতা নির্ধারিত হয়েছে তা শুনে আমি নিজে অবাক হয়েছি।  নির্মিত এই স্কাইট্রির তিন দিকে অবস্থিত এলাকার নামের প্রথম অক্ষরের সাথে মিল রেখে উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়।  যেমন মু-ছা-সি অর্থাৎ জাপানি ভাষায় মুকো বাংলায় ছয় (৬)-এর প্রথম অক্ষর ‘মো’, ছাইতামার প্রথম অক্ষর ‘ছা’ দিয়ে যা জাপানি অংক ছান, যা বাংলায় তিন (৩) এবং সি-টাও এক এলাকার প্রথম অক্ষর যা অংকে সি বা বাংলায় চার (৪) হয়। এটুকু গল্পের ছলে এক জাপানির মুখে শোনা।

তবে বাস্তবে বলতে পারি, যেখানে এই স্কাইট্রি নির্মিত হয়েছে এই এলাকার প্রচীন নাম ছিল মুছাসি। যার নাম করণ অংক দিয়ে লিখলে এমটিই হয় (৬৩৪)। আরো সুন্দর করে যদি বলি, ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে তবু টাওয়ার স্কাইট্রি নামের প্রতিষ্ঠান জাপানিদের মনে রাখতে সহজ হবে মনে করে এর উচ্চতা নির্ধারণ করে ৬৩৪ মিটার। এক সময় জাপানের বর্তমান রাজধানী টোকিও, ছাইতামা প্রিফেকচার, কানাগাওয়া প্রিফেকচার পুরোটা মিলে নাম ছিল এই মুছাসি। যা থেকে এই স্কাইট্রির উচ্চতা নির্ধারণ করার কথা প্রথম ভাবেন এবং ঠিক করেন।

স্কাইট্রির আকৃতি ৩৫০ মিটার বা ১১৫০ ফিট ওপর থেকে দেখলে অনেকটা ট্রাইপডের মত দেখায়।  এর ডিজাইন করেছেন নিচিকেন সেক্কেই প্রতিষ্ঠানের আর্কিটেক্ট মি. সুমিকাওয়া কিইচি। 

৩৫০ মিটার উপরের ধাপ থেকে এক সাথে প্রায় ২০০০ জন পর্যটক টোকিও ম্যাগা টাওনের দৃশ্য অবলোকন করতে পারেন।  এ থেকে আরো ৪৫ মিটার বা ১৪৮০ ফিট উপরের ধাপে বা স্টেজে ওঠে সেখান থেকে প্রায় আরো ৯০০ জন পর্যটককে একসাথে চারপাশের শহর পরিদর্শন করার ব্যবস্থা বা ক্যাপাসিটি রয়েছে।

মজার বিষয় হচ্ছে, জাপানের সাধারণ জনগণের কাছে এর নাম আহ্বান করা হয়েছিল এবং তাদের দেওয়া নাম অনুসারেই এই স্কাইট্রির নাম করণ করা হয়। ২০০৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বর থেকে শুরু করে পরের বছর মার্চ মাস পর্যন্ত সময় বেধে দেওয়া হয়েছিল নাম প্রেরণের। বিভিন্ন জন তাদের পছন্দের যে নাম পাঠান তা থেকে কর্তৃপক্ষ ৬ টি নাম নির্বাচন করেন। পরে, এ থেকে ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয় টোকিও স্কাইট্রি নামটি।  এই ভোটে প্রায় ১,১০,০০০ জন ভোটার অংশ নেন অর্থাৎ মোট এক লাখ দশ হাজার ভোট গ্রহণ করা হয়।  এর মধ্যে ৩০% ভোট বা ৩৩, ০০০ ভোট আসে বর্তমান স্কাইট্রি নামের পক্ষে।

এই টোকিও স্কাইট্রি মূলত জাপানের জাতীয় টিভি চ্যানেল এনএইচকেসহ অন্যান্য আরো কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও রেডিওসহ সাতটি প্রতিষ্ঠানের এন্টিনার কাজে ব্যবহার করা হয়।  দূর থেকে এটি খুব সরু এবং ছোট দেখালেও ৩৬,৮৪,৪৩৯ বর্গমিটার জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই টোকিও স্কাইট্রি। এর নির্মাণ খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ইয়েন। যা আমাদের বাংলাদেশি টাকায় হিসেব করলে দাঁড়ায় প্রায় ৫,১০০ কোটি টাকা।

স্কাইট্রি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল প্রায় সাড়ে তিন বছর।  উদ্বোধন হবার পরপরই আমি পরিবার নিয়ে টোকিও স্কাইট্রি দেখতে গিয়েছিলাম।  লম্বা লাইন এবং লোকের ভিড় দেখে টিকিট কেটেও ধৈর্য হারা হয়ে ওপরে না ওঠে ফিরে আসি।  পরে অবশ্য কয়েকবার যাওয়া হয়েছে দেখতে।  এটি ওপেন করে দেবার পর থেকে ৫ বছর ৮ মাসের মধ্যে তিন কোটিরও বেশি পর্যটক পরিদর্শন করেন।

জাপানের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান তবু রেলের সাথে সম্মিলিতভাবে এই স্কাইট্রি নির্মাণের কারণে নিকটবর্তী স্থানে একটি স্টেশন চালু করা হয় পর্যটকদের সুবিধার্থে, যার নামকরণ করা হয়েছে এই টোকিও স্কাইট্রি স্টেশনের নামানুসারে এবং এর আশেপাশের শহরটির নামকরণ করা হয় টোকিও স্কাইট্রি টাউন।

পি.আর. প্ল্যাসিড:  জাপান প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক

পড়ুন

 

/সাইফ/

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়