RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

বেইজিংয়ের জানালা (পর্ব-৭)

মোহাম্মদ তৌহিদ, চীন থেকে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৭, ২২ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ০৯:৫৫, ২২ অক্টোবর ২০২০
বেইজিংয়ের জানালা (পর্ব-৭)

থুং রেন থাং ব্র্যান্ড, চীন

বেইজিংয়ের কালোত্তীর্ণ ব্র্যান্ড : সম্প্রতি চীন সরকার দেশি ও বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোকে ব্যবসা প্রসারের জন্য আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করেছে। নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি ও বিকাশে আরও তৎপর চীন। তবে, কিছু কিছু বিষয় ঐতিহাসিকভাবেই ব্র্যান্ডিং হয়ে গেছে। ডাম্পলিংস (পাও য্যি), রোস্ট ডাক (খাও ইয়া) এমনই কিছু খাবার। 

তবে, খাবারই সব নয়। শত শত বছর ধরে দেশ বিদেশের পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করে ‘বহাল তবিয়তে’ টিকে থাকা বেশ কিছু ব্র্যান্ড রয়েছে বেইজিংয়ে। কালোত্তীর্ণ তেমনই কয়েকটি ব্র্যান্ড এখানে তুলে ধরা হলো।

বেইজিংয়ের কালোত্তীর্ণ ব্র্যান্ড বা ‘টাইম অনারড ব্র্যান্ড’ বলতে বাণিজ্য ও হস্তশিল্পের শ্রেষ্ঠ ব্র্যান্ডগুলোকে বোঝায়। বেইজিংসহ সারা দেশে এসব ব্র্যান্ডের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। প্রতিটি ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে অজানা অনেক গল্প। ফলে, এসব ব্র্যান্ড মানুষের আস্থা অর্জন করেছে এবং চীন ও বেইজিংয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে।

থুং রেন থাং
বেইজিংয়ের ‘থুং রেন থাং’ চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ড। এটি ১৬৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭২৩ সালে এটি ‘রাজ পরিবারের ওষুধ’ হিসেবে মর্যাদা পায়। থুং রেন থাং-এর চীনা ওষুধ তখন থেকে ১৮৮ বছর ধরে রাজ পরিবারগুলোকে সেবা দিয়েছে। 

বর্তমানে থুং রেন থাং আধুনিক ওষুধ উৎপাদন শিল্প, খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র এবং চিকিৎসা সেবা- এই তিনটি ক্ষেত্রে কাজ করছে। চীনে থুং রেন থাং-এর দোকান রয়েছে ৮ শতাধিক। বিদেশের ১৫টি দেশ ও অঞ্চলে  থুং রেন থাং ২৮টি শাখা দোকানও খুলেছে। 
২০০৬ সালে ‘থুং রেন থাং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও ওষুধ সংস্কৃতিকে’ চীনের অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কয়েকশ বছর পর বর্তমান যুগে এসেও থুং রেন থাং জনগণের স্বীকৃতি ও প্রশংসা অর্জন করছে।

ছুয়ান জুই দ্য
চীনের বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ছুয়ান জুই দ্য’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। কয়েক প্রজন্ম ধরে ছুয়ান জুই দ্য সারা চীনে সুনাম কুড়িয়েছে। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে ছুয়ান জুই দ্যকে চীনের ‘বিখ্যাত ব্র্যান্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। চীনের সেবা খাতে এই ব্র্যান্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। 

চীনে একটি কথা প্রচলিত আছে- মহাপ্রাচীরে না গেলে বীর হওয়া যায় না, ছুয়ান জুই দ্য-এর রোস্ট ডাক (খাও ইয়া) না খেলে পরিতাপ শেষ হবে না। ছুয়ান জুই দ্য অতীত ইতিহাস রক্ষার পাশাপাশি অব্যাহতভাবে নতুন ধরনের খাবার উদ্ভাবন করে যাচ্ছে। ছুয়ান জুই দ্য-এর সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার হল রোস্ট ডাক। এছাড়া ছুয়ান জুই দ্য-এর আরও ৪ শতাধিক রকমের খাবার রয়েছে। এসব খাবার দেশের শীর্ষনেতা, সরকারি কর্মকর্তা, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও দেশ-বিদেশের পর্যটকের কাছে পছন্দের খাবার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ছুয়ান জু দ্য-এর রোস্ট ডাককে ‘চীনের প্রথম খাবার’ বলা হয়। এছাড়া বিদেশি শীর্ষনেতারা চীন সফর করলে ছুয়ান জুই দ্য-এর হাঁসের আইটেমটি রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা ভোজে পরিবেশন করা হয়। 

দাও সিয়াং ছুন
বেইজিং ‘দাও সিয়াং ছুন’ ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দপ্তর চীনের ছিয়ানমেনে। দাও সিয়াং ছুন হল বেইজিংয়ের পেস্ট্রি, মাংসের খাবার, জলখাবার তৈরি ও বিক্রির একটি দোকান (Brand shop)। ১৯২৬ সালে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর, ১৯৮৪ সালে তা আবারও চালু হয়। এখন বেইজিংয়ে দাও সিয়াং ছুনের ১৩০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একটি খাবার সরবরাহ কেন্দ্র, একটি ১. ৪ লাখ বর্গমিটারের কেন্দ্রীয় কারখানা এবং একটি ৪০ হাজার বর্গমিটারের কাঁচামাল তৈরির কেন্দ্র আছে। বেইজিং দাও সিয়াং ছুনের ৪ শরও বেশি পণ্য রয়েছে। প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠানের আয় ৪ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি। 

নেই লিয়ান শেং
‘নেই লিয়ান শেং’ প্রধানত একটি কাপড়ের জুতা তৈরির ব্র্যান্ড। নেই লিয়ান শেং প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৩ সালে। প্রাচীনকালে নেই লিয়ান শেং-এর কাপড়ের জুতা পরা- এক ধরনের সামাজিক মর্যাদার বিষয় ছিল। এটি চীনের কাপড়ের জুতা শিল্পের নেতৃত্বদানকারী ব্র্যান্ড। নেই লিয়ান শেং-এর কাপড়ের জুতা তৈরির পদ্ধতি চীনের অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান চীনের শীর্ষনেতারাও এই ব্র্যান্ডের জুতা পরতে পছন্দ করেন। 

উ ইয়ু থাই
‘উ ইয়ু থাই’ চা দোকানের একটি ব্র্যান্ড। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সালে। এই ব্র্যান্ডের ১৩০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস আছে। শতাধিক বছর উন্নয়নের পর এখন উ ইয়ু থাই চা গ্রুপের ২৬০টিরও বেশি চেইন স্টোর, একটি চা উৎপাদন কারখানা ও সরবরাহ কেন্দ্র, একটি চা সংস্কৃতি জাদুঘর, একটি চা শিল্প অভিনয় দল এবং তিনটি চা–খানা আছে। বছরে উ ইয়ু থাই চা গ্রুপের বিক্রির পরিমাণ ১০ কোটি ইউয়ানেরও বেশি। এটি বেইজিংয়ের বিখ্যাত পুরানো ব্র্যান্ড এবং চীনের চা শিল্পের নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান। 

তুং লাই সুন
এটি বেইজিংয়ের বিখ্যাত মুসলিম খাবার বা হালাল খাবারের ব্র্যান্ড। ‘তুং লাই সুন’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৩ সালে। ১৯৮৮ সালে তুং লাই সুন ব্র্যান্ডটিকে কেন্দ্র করে বেইজিং তুং আন খাদ্য কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। কোম্পানিটি টাইম অনারড ব্র্যান্ডের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চেইন স্টোর স্থাপন, নতুন খাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে। তুং লাই সুন রেস্তোরাঁটি বেইজিংয়ের খাবার শিল্পের পুরানো এবং বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে খুব জনপ্রিয় একটি ঐতিহাসিক দোকান। গত একশ’ বছর ধরে তুং লাই সুনের হালাল খাবার বেইজিং খাদ্য সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে পরিণত হয়েছে এবং চীনের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বলিষ্ঠ সদস্য হয়ে উঠেছে। 

রুং পাও চাই
‘রুং পাও চাই’ একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ড। এদের পণ্যকে ‘জ্ঞানীর চারটি রত্ন’ উপমা দিয়ে বর্ণনা করা হয়। এই চারটি রত্ন হলো লেখার তুলি, কালি, লেখার ফলক ও কাগজ। রুং পাও চাই এগুলো বিক্রি করে থাকে। গত তিনশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ব্যবসা চলছে। রুং পাও চাই বেইজিংয়ের হ্যপিংমেন-এর লিউলিছাং পশ্চিম রাস্তায় অবস্থিত।

বর্তমানে রুং পাও চাইয়ের ব্যবসার ক্ষেত্র আধুনিক হয়েছে। তারা হস্তলিপিশিল্প বা ক্যালিগ্রাফি ও ছবি আঁকার কাগজ, বিভিন্ন ধরনের কলম, কালিসহ হস্তলিপির কাজে ব্যবহৃত জিনিস এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের হস্তলিপি কেনা বেচা করে।

রুং পাও চাই-এর একটি বেসরকারি জাদুঘর আছে। এখানে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির হস্তশিল্পের সংগ্রহ আছে। তিন শতাধিক বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় রুং পাও চাই বেইজিং ও চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে। এই ব্র্যান্ড চীনের প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির অসাধারণ সমন্বয়। 

পাই হুয়া ব্র্যান্ড
‘পাই হুয়া’ মধু শিল্পের সঙ্গে জড়িত একটি ব্র্যান্ড। চীনের বিখ্যাত মৌমাছি লালন বিশেষজ্ঞ হুয়া জি হু ১৯১৯ সালে এই কোম্পানি গড়ে তোলেন। ২০১৯ সালে ব্র্যান্ডের একশ বছর পূর্তি হয়। বর্তমানে পাই হুয়া কোম্পানি চীনের মধু শিল্পে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় রয়েছে। পাই হুয়া ব্র্যান্ড টানা চার বছর ধরে বেইজিংয়ের বিখ্যাত ব্র্যান্ডের তালিকায় রয়েছে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই কোম্পানিকে ‘চীনের টাইম অনারড ব্র্যান্ডের’ মর্যাদা দেয়। ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে, পাই হুয়া  দেশের ‘বিখ্যাত ব্র্যান্ড’ পুরস্কারও জয় করে।

ইউয়ে শেং চাই 
‘ইউয়ে শেং চাই’ একটি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠান। এটি বহু বছর ধরে বেইজিংয়ের মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে হালাল মাংস সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে আসছে। এ ছাড়া, ইউয়ে শেং চাই বহু বছর ধরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে হালাল খাদ্য সরবরাহের কাজও করছে। ইউয়ে শেং চাই প্রধানত গরু ও খাশির মাংসের যোগান দেয়। ব্র্যান্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৭৫ সালে। দুই শতাধিক বছর ধরে ইউয়ে শেং চাই বেইজিংয়ের খাদ্য সংস্কৃতিতে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। 

ছিং ফেং পাও য্যি দোকান
মাংসের পুর দিয়ে রান্না করা ভাপাপুলির মতো পিঠা ‘পাও য্যি’। এটি চীনাদের প্রিয় একটি খাবার। ছিং ফেং ব্র্যান্ডের পাও য্যি বেইজিংয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। ৭ দশক পার করেছে এই ব্র্যান্ডটি। অতীতে এই কোম্পানির নাম ছিল ‘ওয়ান সিং জুই’। প্রধানত পাও য্যি, ভাত ও বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে থাকে। ১৯৫৬ সালে দোকানের নাম হয় ‘ছিং ফেং’। এই ব্র্যান্ডের খাবারের গুণগতমান উন্নত। তাই বেইজিংবাসী এসব খাবার খুব পছন্দ করেন। বর্তমানে ব্র্যান্ডটি বেইজিংয়ের নাগরিকদের সবচেয়ে পছন্দের একটি খাবারের ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। 

লেখক:  বিদেশি বিশেষজ্ঞ, বাংলা বিভাগ, চায়না মিডিয়া গ্রুপ, বেইজিং, চীন।

ঢাকা/সাইফ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়