RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রে কারারক্ষীদের নির্যাতনে মারা গেছে সাড়ে ৭ হাজার কয়েদি

ছাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫১, ২৩ অক্টোবর ২০২০  
যুক্তরাষ্ট্রে কারারক্ষীদের নির্যাতনে মারা গেছে সাড়ে ৭ হাজার কয়েদি

যুক্তরাষ্ট্রে গত দশ বছরে কারারক্ষীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে সাড়ে ৭ হাজার কয়েদির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ কয়েদির বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণ হয়নি। আবার যাদের ছোটখাটো অভিযোগে ধরা হয়েছিল তাদের অনেককেই আদালতে হাজিরও করা হয়নি। ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে মারা যাওয়া বন্দিদের নথিপত্র যাচাই করে মার্কিন গণমাধ্যমে এই ভয়ঙ্কর চিত্রের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে জেলের লকআপগুলোতে মৃত্যুর হার ৩৫ ভাগ বেড়েছে। ৭ হাজার ৫৭১ জন বিচারাধীন বন্দি অকালে প্রাণ হারিয়েছে। আর দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৯ শত ৯৮ জনকে যে অভিযোগে আটক করা হয়েছিল তাতে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি।

নিয়ম অনুযায়ী, গুরুতর অপরাধে সাজা পাওয়া বন্দিদের স্টেট ও ফেডারেল কারাগারে রাখা হয়। এছাড়া কারাগারগুলো লঘু সাজাপ্রাপ্ত বন্দি কিংবা বিচারের অপেক্ষায় থাকা বা কোনো সাধারণ অভিযোগে প্রাথমিকভাবে আটক ব্যক্তিদের স্থানীয়ভাবে পরিচালিত ডিটেনশন সেন্টারে আটক রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ী, কোনো মামলায় কেউ দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্দোষ। আর মামলা ছাড়া ডিটেনশন সেন্টারে কোনো বন্দির অনাকাংখিত মৃত্যু মৌলিক অধিকারেরই লঙ্ঘন।

উক্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক শাস্তির বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার নীল মেলজার বলেন, ‘অনেক লোক ডিটেনশন সেন্টারে মারা যাচ্ছে এবং তাদের কখনো শাস্তি হয়নি। এটি স্পষ্টতই একটি বড় সমস্যা। আপনাকে এসব ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া ও মানবিক আটকের শর্ত মানতে হবে এবং সবাইকে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান বন্দিদের মূল অধিকার প্রদান করেছে, কিন্তু এই বিধানগুলো কার্যকর করা বেশ কঠিন। চতুর্দশ সংশোধনীতে বিচারপূর্ব বন্দিদের সাথে ‘ফেয়ার’ সুষ্ঠু আচরণের গ্যারান্টি দেওয়া হলেও ‘ফেয়ার’ আসলে কেমন তা বিচারক এবং জুরিদের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের মে মাসের একটি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জন ফিনেগানের বাড়ির সামনের আঙিনা ছাড়বেন না হার্ভি হিল। অঝোর ধারার বৃষ্টির মধ্যেও দাঁড়িয়ে আছেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছেন, কখনো কখনো তার এই সাবেক বসের স্ত্রীকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। কোন উপায় না পেয়ে ফিনেগান ৯১১ এ ডায়াল করলেন। এরপর ঘটনাস্থলে আসা পুলিশ অফিসারকে ল্যান্ডস্কেপার জন ফিনেগান পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘তার (হিল) মানসিক চিকিৎসা দরকার।’ কিন্তু এর পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে আনা হয় অনধিকার প্রবেশের অভিযোগ। অবশেষে খারাপ আচরণের সন্দেহে তাকে জেলে নেওয়া হয়। এই ছোট অভিযোগের জন্য তার সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার জরিমানা হতে পারতো। কিন্তু তার ভাগ্যে জোটে হাতকড়া, নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা, অতঃপর নিথর হয়ে পড়ার করুণ নিয়তি।

হিলকে আটকের পরদিন তার শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। এই সময় তিনি মিসিসিপির ক্যান্টনের ম্যাডিসন কাউন্টি ডিটেনশন সেন্টারে ক্ষোভে আকস্মিক একটি চেকবোর্ড নিক্ষেপ করলেন এবং মধ্যাহ্নভোজের একটি ট্রে দিয়ে এক প্রহরীকে আঘাত করেন। ডিটেনশন সেন্টারের সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে (এর আগে অপ্রকাশিত) দেখা যায়, তিন জন রক্ষী এসে তাকে ধরে বেধড়ক মারপিট ও চোখেমুখে মরিচেরগুঁড়া মিশ্রিত পানি স্প্রে করেন এবং বারবার নাক-মুখ ও মাথায় লাথি মারেন। এরপর হাতকড়া পরিয়ে দুজন রক্ষী হিলকে কংক্রিটের দেয়ালে সজোরে ধাক্কা মারেন। স্টেটের এক তদন্তে দেখা গেছে, তারা ক্যামেরা থেকে দূরে ঝরনার দিকে তাকে নিয়ে যান এবং ওই সময়েও হাতকড়া পড়ানো অবস্থায় তাকে আবারো মারপিট করে। প্রহরীরা বলেন, হিল ছিল মারমুখী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তাকে ঠেকাতে শক্তি প্রয়োগ দরকার ছিল।

ভিডিওতে দেখা যায়, হিল ব্যথায় কোকাচ্ছিলেন। এ সময় লাইসেন্সধারী একজন নার্স তাকে দেখেছেন ঠিকই কিন্তু কোনো ওষুধ দেননি। মিসিসিপির আইন অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসক বা উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে হিলকে চিকিৎসা না দিয়ে সোজা বিচ্ছিন্ন একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। সেখানেও একজন প্রহরী তাকে মেঝেতে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেন এবং হাতকড়া খুলে তাকে মেঝেতে ফেলে রাখেন। হিল হামাগুঁড়ি দিয়ে টয়লেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে দেহ থেকে প্রাণ বের হয়ে যাওয়ায় সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হিল নিথর হয়ে পড়েন।

কক্ষে আটকে রাখার ৪৬ মিনিটের মধ্যে কেউ তাকে দেখতে যাননি। যখন রক্ষীরা তাকে দেখতে গেলেন তখন হিল নিথর। তার নাড়ি নেই। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৩৬ বছর বয়সি একটি সুস্থ, সবল তরতাজা যুবক মারা গেলেন। অথচ তার পাশে অনেক লোক ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্রতম রাজ্য মিসিসিপির সবচেয়ে দরিদ্র গ্রামীণ হোমস কাউন্টিতে হিল বড় হয়েছিলেন। তিনি রাজ্যের সমৃদ্ধশালী কাউন্টি ক্যান্টন থেকে এক ঘণ্টার পথ দক্ষিণে ল্যান্ডস্কেপিংয়ের কাজ করতেন।

১৮ বছর বয়সে হিল যৌনতা ও ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। এ মামলায় তিনি ১৪ বছর জেল খাটেন। ২০১৫ সাল মুক্তির পর তিনি ব্যবসায়ের মালিক ফিনেগানের সাথে ল্যান্ডস্কেপিংয়ের চাকরি নেন। ফিনেগানের মতে, ‘হিল একজন অবিশ্বাস্য কর্মী ছিলেন।’ ২০১৭ সালে তার মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। তার ঠিকমতো ঘুম হচ্ছিল না। এ কারণে তিনি ২০১৮ সালে তাকে কাজ থেকে বাদ দেন। এরপরে, হিল তার বাসায় আসা শুরু করেন এবং দাবি করতে থাকেন তিনি তার পুরোনো বসকে কয়েক মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছেন। জবাবে ফিনেগান বলেন, ‘হার্ভি, আমি যদি তোমার কাছ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার নিয়ে থাকতাম তাহলে আমি ল্যান্ডস্কেপিং করতাম না। আমি একটি দ্বীপে থাকতাম।’ কার কথা কে শোনে, হিল আসতেই থাকেন। ২০১৮ সালের মে মাসে ফিনেগন ম্যাডিসন অবশেষে পুলিশ বিভাগে কল করেন। পুলিশ জানায়, তিনি যদি হিলকে সেখান থেকে সরাতে চান, তাহলে তাকে অভিযোগ করতে হবে। এরপর পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী ফিনেগান তাই করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই এমন কিছু  করতে চাইনি। তবে হ্যাঁ, হার্ভির একটি মানসিক হাসপাতালে থাকা দরকার ছিল।’

থানায় ফিনেগান অফিসারকে বলেছিলেন যে তিনি চার্জগুলো নেবেন এবং হিলকে কোনো রুম পেলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। পরিবর্তে হিলকে শুক্রবার সকালে ম্যাডিসন কাউন্টির কারাগারে বুক করা হয়। ম্যাডিসন পুলিশ বিভাগ বলেছে, ‘হিলকে গ্রেপ্তার করার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য বা অসাধারণ ঘটনা ঘটেনি।’

ঢাকা/মারুফ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়