যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বীকৃতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। গত ২২ এপ্রিল আলবেনির নিউ ইয়র্ক স্টেট ক্যাপিটালে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ১৪ এপ্রিল ‘বাংলা নববর্ষ’ হিসেবে ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য বাংলা নববর্ষ উদযাপনের রাজকীয় সমাপ্তি ঘটে।
স্থানীয় সময় সকালে অধিবেশনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সিনেটর লুইস আর. সেপুলবেদা, নাথালিয়া ফার্নান্দেজ এবং টবি অ্যান স্ট্যাভিস্কি। বক্তব্য প্রদানকালে সিনেটর টবি অ্যান স্ট্যাভিস্কি বলেন, নিউ ইয়র্কে বাঙালিরা শিক্ষা, ব্যবসা ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং এই রেজুলেশন সেই অবদানের স্বীকৃতি।
তার বক্তব্যের পর উপস্থিত সদস্যদের সমর্থনে অধিবেশন করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। রেজুলেশনের মূল প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখকে ‘বাংলা নববর্ষ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বাংলা নববর্ষকে একটি অসাম্প্রদায়িক ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার শিকড় মুঘল আমলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নিহিত। সংগীত, নৃত্য, চারুকলা এবং লোক ঐতিহ্যের মাধ্যমে এই উৎসব বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে উদযাপন করে থাকে।
রেজুলেশনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী—যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষাগোষ্ঠী—নিউ ইয়র্কে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক উপস্থিতি তৈরি করেছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত বাঙালিরা যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশেষভাবে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের তিন দশকের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বাংলা উৎসব ও বইমেলার ঐতিহ্যও এতে স্বীকৃতি পেয়েছে। একইসঙ্গে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিত সাহার ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রেজুলেশন পাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুর ১টা থেকে শুরু হয় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সঙ্গীত পরিচালক মহিতোষ তালুকদার তাপসের নেতৃত্বে রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন টবি অ্যান স্ট্যাভিস্কি। তিনি বলেন, নিউ ইয়র্কে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশে এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং মুক্তধারা ফাউন্ডেশন অনন্য ভূমিকা পালন করছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইডের সহ-সভাপতি ও উৎসবের মঞ্চ ব্যবস্থাপক ড. কল্লোল বসু, সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল লিটন এবং সঙ্গীত পরিচালক মহিতোষ তালুকদার তাপস।
সংগঠনের সভাপতি বক্তব্যে বলেন, বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে আমরা প্রবাসী বাঙালিদের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমেরিকার মূলধারার সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজন পুরো অনুষ্ঠানকে উৎসবমুখর করে তোলে। সম্মিলিত কণ্ঠে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পর্বের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে।
উল্লেখ্য, এই রেজুলেশন গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ এখন নিউ ইয়র্কে একটি আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে গেল। যা প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাঙালি কমিউনিটির জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন।