তাপস রায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। এক ‘পথের পাঁচালী’ তাকে এনে দিয়েছিল ব্যাপক পরিচিতি এবং সেই সুবাদে আজও তিনি সমান খ্যাতিমান। এই একটি মাত্র উপন্যাস তাকে বাংলা কথাসাহিত্যের স্থায়ী সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আজ বিভূতিভূষণের জন্মদিন। এমন দিনে অতীতে ফিরে তাকালে বিস্ময় জাগে এ কথা ভেবে যে, ব্যারাকপুরের বনগ্রামের দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি কিশোরের মনে কীভাবে সাহিত্যের বীজ বেড়ে উঠেছিল? এ জন্য বাবা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান সর্বাগ্রে বিবেচিত হলেও স্ত্রী কল্যাণী দেবীর (রমা বন্দ্যোপাধ্যায়) ঋণও কম নয়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ১৯৪১ সালে বিভূতিভূষণ রমাদেবীকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে তার জীবনে বিশেষ করে, তার সাহিত্যজীবনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি লেখকের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ রায় যখন ‘পথের পাঁচালী’র চলচ্চিত্রায়ণ করতে চাইলেন তখনও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই ভূমিকাটুকু না রাখলে সত্যজিৎ রায়ের একটি স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত। আমরাও বঞ্চিত হতাম এক ঐশ্বর্যমণ্ডিত ইতিহাস থেকে।
বিভূতিভূষণের পাঠক নিশ্চয়ই জানবেন, তার লেখায় কতটা প্রাণ পায় প্রকৃতি। এর অন্যতম কারণ তার জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা এবং বাবার সান্নিধ্য। বাবা মহানন্দ পৌরোহিত্য করে দিন কাটাতেন, পাশাপাশি করতেন কবিরাজি। ফলে পরিবারে ঔষধি গাছের ব্যবহার ছিল। বাবা অনেক সময় ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বিভিন্ন গাছ, পাখি, ফুল দেখাতে। ইছামতি নদীর সঙ্গে ছেলের পরিচয় তিনিই করিয়ে দিয়েছিলেন। বিভূতিভূষণ তখন পাঠশালার ছাত্র। প্রকৃতির সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে তার কল্পনার রাজ্য খুলে যায়। বনমরিচের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বাবা ছেলেকে প্রকৃতির পাঠ দেন। প্রকাণ্ড প্রবীণ এক বৃক্ষের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এই হলো সপ্তপর্ণ জুনিপার গাছ। বুঝেছিস বিভূতি, তোর দাদু ওষুধ তৈরি করতেন এর বাকল দিয়ে। আর আমি এটা ছেঁচে-বেটে দিতাম।`
সেই গাছের দিকে তাকিয়ে বালক বিভূতির আগ্রহ বেড়ে যেত। সেও ঘুরে ঘুরে বাবাকে প্রশ্ন করত লতা-পাতা দেখিয়ে। ধারণা করি ছেলের কৌতূহল মেটাতে বাবা কসুর করতেন না। বরং আগ্রহ নিয়েই বলতেন, ‘একি! তোকে না দুদিন আগেই এই লতাটিকে চিনিয়ে দিলাম! এর নাম হলো অপরাজিতা। এই তো সেদিন তোর মায়ের গলা ভেঙে গেল, এই লতাপাতা থেঁতলে রস করে তোর মাকে খাইয়ে দিতেই তো তার গলা ভাঙা সেরে গেল।’
এ সময় বিভূতিভূষণ একটি নোট খাতা তৈরি করে সেখানে নতুন চেনা গাছ, লতা, পাখির নাম পেন্সিল দিয়ে টুকে রাখতেন। কিন্তু বাবার হাত ধরে ছেলের এই প্রকৃতি পাঠ পাঠশালা পর্যন্ত সম্ভব হয়েছিল। কেননা বিভূতিভূষণ যখন সবেমাত্র হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছেন, ঠিক এ সময় মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।
বাংলার পল্লীর অপরূপ সৌন্দর্য বিভূতিভূষণকে শৈশব থেকেই মুগ্ধ করত। পরবর্তীকালে এই প্রকৃতি পাঠের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা নানাভাবে তার রচনাকে প্রভাবিত ও সমৃদ্ধ করেছে। বিভূতিভূষণের প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে। এরপর তিনি মাত্র ২১ বছরের সাহিত্যজীবনে গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য ও দিনলিপি ইত্যাদি বিবিধ শ্রেণীর রচনা মিলিয়ে অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। ‘পথের পাঁচালী’ লেখার মধ্য দিয়েই ভাগলপুরে তার লেখক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। সেটা কীভাবে হলো সংক্ষেপে বলছি।
ভাগলপুরের বাঙালিটোলায় উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এসেছিলেন আইন পেশার উদ্দেশ্যে। কিন্তু মনেপ্রাণে এই ব্যক্তি ছিলেন সাহিত্যসুহৃদ। লেখালেখিও করতেন অবসরে। আর চুটিয়ে আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন। বলাবাহুল্য আড্ডার প্রধান আলোচ্য বিষয় সাহিত্য। তার বৈঠকখানায় প্রতিদিন সাহিত্য আড্ডা হতো। সেখানে নিয়মিত যেতেন তরুণ বিভূতিভূষণ। একে অপরিচিত যুব্ক, আড্ডায় নেহায়েত তরুণ, ফলে বক্তা নয়, শ্রোতা হিসেবেই তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে সসংকোচে বসতেন। পরনে হাঁটু ছুঁইছুঁই খাটো একটি ধুতি। গায়ে নিজ হাতে কাচা ইস্ত্রিবিহীন পাঞ্জাবি। এক হাতে লণ্ঠন, অপর হাতে লাঠি নিয়ে বসে থাকা এই তরুণ সেদিন কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি। কিন্ত ঘটনা বদলে গেল একদিন।
গৌরিকুঞ্জ। এই বাড়িতেই শেষ জীবন কাটিয়েছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
সেদিন বিকেল থেকেই আকাশ অধিকার করল ঘন কালো মেঘ। বৈশাখ মাস। শুরু হলো কালবৈশাখী ঝড়। সেই ঝড় মাথায় নিয়ে সেদিনকার আড্ডায় উপস্থিত হলো না কেউ। উপেন্দ্রনাথ বৈঠকখানা থেকে নেমে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলেন কেউ আসছে কি না। বাইরে রাস্তার দিকে তাকাতেই দূরে একটি লণ্ঠনের আলো তার দৃষ্টিগোচর হলো, সঙ্গে একটা ছায়ামূর্তি। ছায়ামূর্তি নিকটে এলে চেনা গেল সেই তরুণকে। তরুণ আর কেউ নন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন আড্ডায় আর কেউ উপস্থিত না থাকায় এতোদিনে উপেন্দ্রনাথের নজর পড়ল তরুণের প্রতি। নানাবিধ গালগল্পের মধ্যে উপেন্দ্রনাথ হঠাৎ বিভূতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কবিতা, গল্প বা উপন্যাস লেখার বাতিক-টাতিক আছে কিছু?
বিভূতিভূষণ বললেন, তেমন কিছু নয়, একটা উপন্যাস লিখেছি। কিন্তু লেখাটি আদৌ মানসম্পন্ন হয়েছে কিনা বুঝতে পারছি না। উপেন্দ্রনাথ উৎসাহী হয়ে সেদিন পাণ্ডুলিপিটি পড়তে চেয়েছিলেন। তখন বিভূতিভূষণ সেই পাণ্ডুলিপি তাকে পড়তে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার শুরু হলো প্রতীক্ষার পালা। কারণ অনেক দিন কেটে গেছে উপেন্দ্রনাথ বাবু তার মন্তব্য জানাননি। দুই মাস পর বিভূতিভূষণ মনে মনে ধরেই নিলেন উপন্যাসটি সম্ভবত সাহিত্য মানসম্পন্ন হয়নি। কিন্তু এর পরেই ঘটল অন্য ঘটনা। একদিন আড্ডা শেষে সবাই চলে যাবার পর উপেন্দ্রনাথ বিভূতিভূষণকে বললেন, আপনি একটু বসুন, কথা আছে। তারপর খুব উৎসাহী হয়ে বললেন, কী এক অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন আপনি! পড়েই মনপ্রাণ দুটোই জুড়িয়ে গেছে আমার।
এই উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বিচিত্রা`তেই ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসের নাম ‘পথের পাঁচালী’। উপন্যাসটিতে পল্লীজীবন ও নিসর্গ রূপায়ণে বাংলার আবহমানকালের চালচিত্র ও মানবজীবনের অন্তর্লীন সত্তা ফুটে উঠেছে। রচনায় প্রকৃতি ও মানবজীবন একীভূত হয়ে সৃষ্টি করেছে অসাধারণ এক সাহিত্য-ব্যঞ্জনা। মানুষ যে প্রকৃতিরই সন্তান- এ সত্য প্রতিফলিত হয়েছে বিভূতিভূষণের বিভিন্ন রচনায়, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর জীবনবোধ। সম্ভবত এ বিষয়গুলো চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের মনে রেখাপাত করেছিল।সত্যজিৎ যখন সিগনেট প্রেসে ‘আম আঁটির ভেঁপু` বইটির প্রচ্ছদ তৈরি করছিলেন তখন থেকেই তার বাসনা জেগেছিলো এই উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দেবেন তিনি।
অবাক ব্যাপার হলো,বিভূতিভূষণ যখন জীবিত ছিলেন বিভিন্ন লেখালেখি বা কাজকর্মের মধ্যেও তাকে একবার একটি চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা সম্পাদনা করতে হয়েছিলো। সে সময় যে ধরনের চলচ্চিত্র তৈরি হতো, তাতে তার ধারণা জন্মেছিল, ‘পথের পাঁচালী` কখনো চলচ্চিত্র হবে না, বা হওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু তার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত করেছিলেন সত্যজিৎ। যদিও এটা বিভূতিভূষণ দেখে যেতে পারেননি। এর অনেক আগেই ১৯৫০-এর ১ নভেম্বর তিনি মারা যান।
বিভূতিভূষণের মৃত্যুর পর থেকেই স্ত্রী রমাদেবীর কাছে প্রখ্যাত অনেক পরিচালক ‘পথের পাঁচালী’র স্বত্ব কেনার জন্য ধর্না দেন। তারা এ জন্য মোটা অঙ্কের সম্মানী দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। রমাদেবী নিজের আর্থিক কষ্টের মধ্যেও কোনো প্রলোভনে রাজি হননি। তিনি শুধু একটি কথাই বলতেন, ‘পথের পাঁচালী` আমার স্বামীর কাছে ছিলো সন্তানের মতো। সেই সন্তানকে কি কেউ বিক্রি করে? সকলকে ফেরানোর পরে একজনকে কিন্তু তিনি ফেরাতে পারলেন না। সেই একজন হলেন সত্যজিৎ রায়। সিগনেট প্রেসের দিলীপ গুপ্ত একদিন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে রমাদেবীর পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছেলেমানুষ এই ছেলেটিকে দেখে রমাদেবীর স্নেহের উদ্রেক হয়েছিল। কারণ সত্যজিৎও তো বাবাহারা। ফলে সত্যজিৎ যখন ছেলের মতো মায়ের কাছে ‘পথের পাঁচালী’র স্বত্ব দাবি করে বসলেন তখন রমাদেবী আর না করতে পারেননি। আর সে কারণেই ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় নতুন এক রূপে ‘পথের পাঁচালী’ দেখতে পায় বিশ্ববাসী।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫/তাপস রায়