শিল্প ও সাহিত্য

সাইকেল-সাইকেল

সব ভুলে আমি প্যাডেলে চাপ দিলাম। পরেই ঘটলো এক ভয়াবহ কাণ্ড! আমাতে আর এক জার্মান সুন্দরীতে মুখোমুখি সংঘর্ষ ও পতন। ভয়ে তো আমার বুকের রক্ত হিম। পড়ে থাকলাম ঝিম মেরে। চোখ বন্ধ। দেখি জার্মান সুন্দরী আমাকে টেনে তুলছেন। দাঁড়ালাম। তার প্রশ্ন— নতুন? বললাম—  হ্যাঁ।

সাইকেলে অতিবাহিত ছোটবেলার বহু স্মৃতি এখনো সর্বাঙ্গে বয়ে বেড়াচ্ছি। আমি নই আমরা অনেকেই। আমি অবশ্য ১৯৫০-এর দশকের গ্রামের কথা বলছি। চিবুক, হাঁটু, পায়ের গোড়ালি- সর্বত্রই বিরাজমান সাইকেল-স্মৃতি। ক্ষত-বিক্ষত অঙ্গ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। সেই রক্তক্ষরণ এখনো হয়, তবে তা দেহ থেকে নয়, হয় ছোটবেলার স্মৃতিকাতর হৃদয় থেকে।

দেহের সাইকেলজনিত প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন স্মৃতিমেদুর, স্মৃতিমধুর, স্মৃতিমুখর। যন্ত্রণা নেই। তখনো ছিল না। রক্ত-চিহ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরলে মা উদ্বিগ্ন হতেন। নির্বিকার কণ্ঠে বাবা বলতেন, সাইকেল চড়া শিখতে গেলে প্রথম-প্রথম এরকমই হয়।

বাড়িতে লোহার ছোট্ট হামানদিস্তা ছিল। মা ইঁদারার পাশ থেকে দুর্বাঘাস ছিঁড়ে আনতেন। সেই ঘাস হামানদিস্তায় ছেঁচে রক্ত ঝরা জায়গায় চেপে রাখলে রক্ত যেতো বন্ধ হয়ে। শীতে চলতো গাঁদা পাতার রস। অ্যান্টিবায়োটিক, ইনফেকশন ইত্যাদির নাম তখন শুনিনি। তবে সেপটিক বলে একটা কথা বেশ চালু ছিল। তখন ব্যবস্থা থাকলে ‘সিবাজল’ নামে এক ট্যাবলেটের গুঁড়ো নারকেল তেলে মিশিয়ে ক্ষতে লাগানো হতো। ধনুষ্টঙ্কার নামের এক রোগের কথা তখন শোনা যেতো। তা, ঐ শোনা পর্যন্তই।

যা হোক, ক্ষত খানিকটা শুকিয়ে এলে আবার সেই সাইকেল। একটু বড়ো হয়ে আমরা অনেকেই মেতে থাকতাম সাইকেল নিয়ে। ক্লাস এইটের নতুন বাংলা বইয়ে দেখা মিললো মজার এক সাইকেল-ছড়ার। লেখক শ্রী সুনির্ম্মল বসু। তিনি এখন বিস্মৃত এক নাম। ছড়াটার শুরু ছিল এ রকম: ‘ক্রীং ক্রীং ক্রীং সরে সরে যাও না চড়িতেছি সাইকেল দেখিতে কি পাও না?’

তখন আমাদের আয় পায় কে? মুখে ছড়া, হাতে সাইকেলের বেল বা ঘণ্টা। কী যে দিন ছিল সেসব!

আমরা তো তখন ছেলেমানুষ। সাইকেল নিয়ে আমাদের ব্যাপারটা ছিল ছেলেমানুষী। কিন্তু সাইকেল নিয়ে মোহগ্রস্ত ছিলেন বড়রাও। সাইকেল তো একালেও আছে। কিন্তু অল্প মানুষই রয়েছেন সাইকেলের সঙ্গে। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন গ্রামবাংলায় সাইকেল ছিল স্টেটাস সিম্বল। এ যুগের শহুরে মানুষ যে দৃষ্টিতে একটা ঝাঁ চকচকে মোটরগাড়ি, যেমন মার্সিডিজ বেনৎস, বি.এম.ডব্লিউ. বা আউডির দিকে তাকায় তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্ময় নিয়ে গ্রামের মানুষ নতুন সাইকেলের দিকে তাকাতো। কতো রকমের ব্র্যান্ড তখন— রয়েল, হাম্বার, বি.এস.এ., হারকিউলিস, ফিলিপস ইত্যাদি।

সাইকেলের সিট, বেল, স্ট্যান্ড, ক্যারিয়ার, চেন কভার, ডায়নামো, পাম্পার সবই তখন ছিল একান্ত দ্রষ্টব্য বিষয়। মজার ব্যাপার, সাইকেলের যে জিনিসটা কেটে প্রায়ই পাম্প বেরিয়ে যেতো সেই ছোট্ট ভালব টিউবকে গ্রামের মানুষ বলতেন—  ভলটিউব। সাইকেলেরও হেডলাইট ছিল এবং ছোট্ট ডায়নামো পেছনের টায়ারের সঙ্গে ঘষা খেয়ে ঘুরতো আর আলো জ্বলে উঠতো, সেই ব্যাপারটা তখন আমাদের কাছে বিস্ময়ের।

এখন তো ছোট-বড় সাইজের নানান কেতার সাইকেল। আমাদের শৈশবে সে সৌভাগ্য ছিল না। সকলের জন্য তখন একটাই সাইকেল। উঁচু সাইকেলে ওঠার মতো উচ্চতা আমাদের ছিল না। আমরা তখন সাইকেল চালাতাম ত্রিভূজ ফ্রেমে পা গলিয়ে। এক হাত সীটের ওপর, অন্য হাতে হ্যান্ডেলের এক দিক। সাইকেল চলতো হাফ প্যাডেলে। এ দৃশ্য নিশ্চয় অনেকের মনে আছে। সাইকেল চালানোর এই অবস্থাকে আমরা বলতাম ব্যাঙ কায়দা।

সিটে উঠে প্রথম-প্রথম সাইকেল চালানোর টলোমলো অবস্থার কথাও অনেকের মনে থাকার কথা। তখনো প্রথমে হাফ প্যাডেল, পরে ফুল প্যাডেল। সাইকেলের সিটে বসে সেই অবস্থা আমাদের কুষ্টিয়ার বাউল কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। বাউল কবি তাই নিয়ে গান বেধেঁছিলেন: ‘কেমন করে চড়বো গুরু দুই চাকার এই বাইসিকলে ইংলিশম্যান বাবু যারা চড়ে মজা মারলেন তারা  হচ্ছে না মোর হ্যান্ডেল ধরা…’

গানটি অবশ্য বড় হয়ে শুনি। গানে সাইকেল উপলক্ষ্য মাত্র। ভেতরে বাউলিয়ানা। বাউলের নাম মহীন শাহ। গানের সুরটা লাল শাহের এক বিখ্যাত গানের।

বাংলাদেশের সব এলাকার খবর আমার জানা নেই। আমি বলতে পারি শুধু আমাদের কুষ্টিয়া-যশোর এলাকার কথা। গ্রামে সাইকেল তখন সত্যিই স্টেটাস সিম্বল। সেই আমলে কনের পিতাকে যৌতুক দিতে হতো সাইকেল। পরে একে একে যুক্ত হয় ঘড়ি ও ট্র্যানজিস্টর রেডিও।

ছোটবেলায়, ১৯৫৫-১৯৫৬’র দিকে কিছুদিনের জন্য চোখে পড়তো কিছু অচেনা মানুষ, আমাদের গ্রামের বটতলায়। শুনতাম, তাঁরা, আমাদের এলাকার ভাষায় ‘ধান কাটা মুনিষ’ অর্থাৎ সংবাদপত্রের ভাষায় ধান কাটার কৃষিশ্রমিক। আসতেন রংপুর জেলার কোনো এক জায়গা থেকে।

সেই সময়ে রংপুর জেলা ও নীলফামারী নামে এক মহকুমার নাম শুনি এক বোনের কাছ থেকে। তাঁর নাম রাফিয়া। কিন্তু আমাদের সকলের মুখে নামটা উচ্চারিত হতো— রোফিয়া। এটি আমাদের এলাকার উচ্চারণদোষ। ১৯৫০-এর দিকে মাস ছয়েকের মতো সপরিবারে তারা ছিলেন নীলফামারীতে। সেখানেই সাঁওতালদের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। রফিয়া বুবুদের নামাজ পড়া দেখে এক সাঁওতাল রমণী অপূর্ব ভাষায় তার বর্ণনা দিচ্ছিল আরেকজনকে— দাঁড়াইলো, উঠিলো, বসিলো, মাথা ঠেকাইলো, এদিকে চাহিলো, ওদিকে চাহিলো, দুহাত তুলিয়া কী যেন চাহিলো, পাইলো কি না পাইলো, চাটিয়া চুটিয়া খাইলো। রফিয়া বুবু মাঝেমধ্যে অনবদ্য ভঙ্গিতে যখন বৃত্তান্তটা ব্যক্ত করতেন তখন আমরা কেন, বড়রাও হেসে গড়িয়ে পড়তেন।

আমাদের গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ে ছিল এক বিশাল বটগাছ। তারই পাশে উত্তরের রাস্তার ওপর ইদ্রিস ভাইয়ের বিখ্যাত মুদী দোকান। আর পূবের রাস্তার ওপর চায়েন মিয়াঁর চা-দোকান। আশেপাশের লোকজনকে আমাদের গ্রামে নানাকাজে আসতে হতো। প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, পোস্ট অফিস, তহসিল অফিস— সবই আমাদের গ্রামে। গ্রামে তাই আশেপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের মানুষদের আনাগোনা কম ছিল না।

চা বিক্রেতা চায়েন-এর নাম আসলেই ছিল চায়েন। গাইতে গাইতে যেমন গায়েন, তেমনি চা বেচতে গিয়ে গ্রামের চায়েন মিয়াঁ কিন্তু চায়েন হননি। তো, তাঁর চায়ের দোকানে চা ছাড়াও পাওয়া যেতো লাঠি বিস্কুট, এস বিস্কুট, আর চাঁদ বিস্কুট। বিস্কুটের নাম ছিল সেগুলোর আকার অনুযায়ী। এসব বিস্কুট এখন আর দেখা যায় না। সবই কিন্তু খাওয়া হতো চায়ে ডুবিয়ে।

চা তখন দেওয়া হতো কাচের মিনি গ্লাসে। চায়ের মিয়াঁর চা-চামচ ছিল চায়ের আড্ডা জমিয়ে তোলার প্রাথমিক আলোচ্য বিষয়। চা ঘুঁটতে ঘুঁটতে চামচের মাথা অর্ধেকে দাঁড়িয়েছিল। আগত আড্ডাবাজরা কথা তুলতেন ঐ অদ্ভুত চামচ নিয়ে। চায়েন মিয়াঁ তাতে বেচায়েন হতেন না। এক চা-চামচ পরিমাণ চিনি চায়েন মিয়াঁ তুলতেন দু’ থেকে তিন বারে। তাও তিনি চামচ ছাড়তেন না।

গ্রামে লিকার চায়ের চল ছিল না। দুধ-চিনির চায়ে অভ্যস্ত ছিল সবাই। চায়ের সঙ্গে আরেকটি পানীয়ও চলতো। গ্রামের মানুষের মুখে তার নাম ছিল ‘মিকচার’। চায়ের মিনি গ্লাসের অর্ধেকটা দুধ, কমপক্ষে দুই চামচ চিনি আর বাকিটা গরম পানি মিশিয়ে তৈরি হতো মিকচার। চায়ের চেয়ে দাম ছিল বেশি। তাই অর্ডার আসতো বেশ আওয়াজ করে।

আমাদের আশেপাশের এলাকা মানে এলাকার পাঁচ-ছটা গ্রাম। সে সব গ্রামের মাঝবয়সী সৌখিন, আড্ডাবাজ ও চা-বিলাসীরা বিকেলে ভিড় করতেন চায়েনের দোকানে। বসার জায়গা সকলের হতো না। তা নিয়ে ক্ষোভ ছিল না কারো। সবাই মজে যেতেন কথাবার্তায়। জমে উঠতো আড্ডা। দু’তিন মাইল পথ তখনকার মানুষদের কাছে কিছুই ছিল না। বৃষ্টিবাদলার দিন ছাড়া বেশিরভাগ মানুষ হেঁটে আসতেন। আবার হেঁটেই বাড়ি ফিরতেন।

চায়েনের আরেক দিক হলো, সে ছিল একাই একশ। অর্থাৎ তার দোকানে কাজ করার মতো আর কেউ ছিল না। চায়ের অর্ডারদাতারা নিজেই এগিয়ে গিয়ে চায়েনের হাত থেকে কাপটা নিতেন। এতেও কারো বিরক্তি ছিল না।

হাতে গোনা কয়েকজনের তখন ছিল সাইকেল। তাও আবার পুরোনো। সাইকেল থেকে নেমেই তাঁরা দোকানের বেড়ার গায়ে সাইকেল রেখে দিতেন। কোনটা কীভাবে থাকলো তা নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা ছিল না। লোকজনের নজরও সে সব সাইকেলের দিকে পড়তো না। হ্যাঁ, নজর পড়তো বটে উঠতি যুবকদের নতুন কেনা সাইকেলের দিকে। কারো ধান বেচা টাকা কিংবা নতুন গুড় বিক্রির টাকায় কেনা কিংবা যৌতুক হিসেবে পাওয়া সাইকেলে তাদের আগমন এবং সাইকেল থেকে অবতরণ পর্যন্ত তাদের গম্ভীর আচরণ ছিল দর্শনীয় কাণ্ডকারখানা।

যথোচিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে সাইকেল থেকে তারা অদ্ভুত কায়দায় মাটিতে পদার্পণ করতো। ভাবখানা এই যে, তাদের চেয়ে বেশি দামি তাদের সাইকেল। তারপর নিজেই নিজের সাইকেলের দিকে তাকিয়ে দেখতো এবং সেই সঙ্গে এটা-ওটা নেড়েচেড়ে দেখার সঙ্গে তাকিয়ে থাকতো সাইকেল দেখতে লোক জড়ো হয়েছে কি-না। নতুন সাইকেল বলে কথা! মানুষজন ভিড় করতো। শুরু হতো সাইকেল বন্দনা।

ধান কাটার মরশুমে রংপুর অঞ্চল থেকে আগত যে শ্রমিকদের কথা বলছিলাম তারা প্রায়ই শেষ বিকেলে এসে বসতো বটগাছের তলায়। সংখ্যায় তারা বড় জোর আট-নয়জন হবে। চায়ের দোকানে চা পানের বিলাসিতা তাদের ছিল না। তারা আসতো নতুন জায়গায় নতুন সব লোকজন দেখতে। একদিন ফুটবল খেলা শেষে যখন বাড়ির পথ ধরেছি, হঠাৎ দেখি বটতলায় বহু লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। গান কানে এলো। খোলা গলার গান। সেই সঙ্গে গানের ধূয়া। একজন গাইছে— 'দ্যাখ ভাই কলিকালে সাইকেলের কী সুম্মান', বাকি সবাই ধূয়া ধরেছে। সাইকেল নিয়ে নানা মজার কথা ছিল সে গানে। ঐ এক লাইন ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ে না। তবে মনে পড়ে গানের ব্যঙ্গরসের কথা। তাতে অনেক কথা ছিলো ব্যঙ্গাত্মক।

উপকারী বাহন হিসেবে সাইকেলের জনপ্রিয়তা এখনো কমেনি, তবে তার মর্যাদা কমেছে। সাইকেলসংশ্লিষ্ট অনেক জিনিসই এখন দেখা যায় না। যেমন, সাইকেলের ত্রিভূজ ফ্রেমে আটকানো মোটা খাকি কাপড়ের তিন কোণা ব্যাগ, অথবা গোড়ালির পায়জামা আটকানোর জন্য স্টিলের গোল ব্যান্ড কিংবা ক্লিপ— কিছুই আর নেই। সব কিছু ছিল সাইকেলের সোনালি দিনগুলিতে। গ্রামের ডাক্তার সাইকেলের রডে তার চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে দিব্যি রোগী দেখে বেড়াচ্ছেন— এরকম দৃশ্য অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে।

কে যেন বলেছিলেন, সাইকেল হলো মানুষের প্রিয়তম সখা ও সাথী। বেশি খাটালে গাঁইগুই করে না। চুপচাপ নিজের কাজটি সারে। সাইকেলকে মোটরগাড়ির মতো পেট্রোলের খরচ জোগাতে হয় না। কথাটি কিন্তু অসম্ভব বাস্তব। হাল আমলে সাইকেল এখন বিত্তহীনদের প্রতীক। বিত্তবানদের অনেকে অবশ্য সাইকেল চড়েন দেহের মেদ ঝরানোর জন্য।

কলকাতায় যখন প্রথম সাইকেল এলো তখন অনেক বিখ্যাত মানুষই কিন্তু সাইকেলে আসক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র রায়, বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ডাক্তার নীলরতন সরকারের নাম সাইকেল সংক্রান্ত বিভিন্ন রচনায় পাওয়া যায়। রমনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় তাঁর ছাত্রাবস্থায় অনেক অধ্যাপক সাইকেলে চেপে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। এ ধারা অনেকদিন অব্যাহত ছিল। কলকাতার সাইকেল নিয়ে বেশ কিছু লেখার সঙ্গে পরিচয় আমার হয়েছে। কিন্তু সাইকেল কবে এলো ঢাকায়, কী ধরনের বিস্ময় বা রহস্য তৈরি হয়েছিল— সে সম্পর্কে কিছু চোখে পড়েনি আমার। হয়তো আছে, কিংবা নেই, আমি জানি না।

বইয়ে পড়েছি, ইউরোপেও বিখ্যাত ব্যক্তিরা সাইকেল চালাতেন। বার্নাড শ’র সাইকেল-জীবন বেশ ক্ষত-বিক্ষত। বার্টান্ড রাসেলও সাইকেল চালাতেন। বার্নাড শ’র নিজের জবানীতে পাওয়া যায়—তিনি আর রাসেল দুজনে সাইকেলে বেড়াতে বেরিয়েছেন। রাসেল চলেছেন আগে, তিনি পেছনে। ঢালু এক রাস্তায় বার্নাড শ মনের আনন্দে সাইকেল ছোটালেন। এরপর বার্নাড শ বলেছেন, ঠিক সেই সময়ে দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ রাসেল নির্ভুল গণনায় আমার ছুটন্ত সাইকেলের সামনে অদ্ভুত কায়দায় নিজের সাইকেলের ব্রেক কষে দাঁড়ালেন সহর্ষে। আমি কীভাবে যে সামাল দিলাম জানি না। আরেকটু হলেই কিন্তু দর্শন ও নাট্যসাহিত্যের সব ভরসা নির্মূল হয়ে যেতো।

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তখনকার পাকিস্তানে আমার এক ভাই এয়ারফোর্সে চাকরি নিয়ে করাচি যান। খুব সুন্দর চেহারার মানুষ। হাসিটাও ছিল সুন্দর। বছরে একবার বাড়ি আসতেন। শোনাতেন মজার সব গল্প। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম শুনি ব্রতচারী নৃত্যের গানের কথা─ ‘চল কোদাল চালাই, ছেড়ে মানের বালাই’; ‘চল ভাই চল মাঠে লাঙ্গল বাইতে’। ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা ১৯৫৮-এ। কেন জানি না এরপরে আর দেখা হয় নি। এমনিতেই হাসি খুশি মানুষ। সেবার আরো প্রাণবন্ত ছিলেন।  আমাদের বললেন, জানিস সাইকেলের তলে চাপা পড়ে কখনো মানুষ মরে না। মরে ব্যাঙ। এই বলে তিনি দুই লাইনের এক ছড়া বললেন— ‘দূর থেকে চেয়ে দেখি পড়ে আছে মানিব্যাগটা। কাছে গিয়ে দেখি ছিঃ ছিঃ ও যে ব্যাঙ চ্যাপ্টা।’

ভাই থামলেন, বললেন আর মনে নেই। ভাইয়ের অকস্মাৎ নীরবতায় ছড়াকারের নাম জানা হলো না। সে নাম আর কখনো খুঁজে পাইনি।

সাইকেল-দুর্ঘটনা ‘অ্যাকসিডেন্ট’ হিসেবে মর্যাদা পায় না। কিন্তু ছোট-বড় যে কোনো দুর্ঘটনা থেকে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে। যেমন আমার হয়েছিল। ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগে চাকরি পেয়ে জার্মানির কোলন শহরে যাই ১৯৮৮‘র জুলাইয়ে। প্রথম-প্রথম বুঝে না বুঝে এটা-ওটা খেয়ে ৩২ ইঞ্চি কোমর ৩৪-এ দাঁড়িয়ে যায়। অবস্থা দেখে বিভাগীয় প্রধান ব্যার্ন্ড ভেগমায়ার একদিন বললেন, কীরে তোর তো বডির গতিক সুবিধের দেখছি না। দাঁড়া, তোকে ফারাড কিনে দিই, বরফ গলার দিন শেষ হয়ে গেলে চালাবি। এদিক-ওদিক ঘুরবি, পেটও কমবে।

সাইকেলকে জার্মানি ভাষায় বলে ফারাড। ভেগমায়ার আমাকে বলতো ‘ফারহাড’। এ নিয়ে সে বেশ মজা করতো। ও হ্যাঁ, জার্মান ভাষায় কিন্তু আমাদের মতো আপনি, তুমি, তুই রয়েছে। প্রয়োগও সেই একই রকম।

শীতে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ভেগমায়ার সস্তায় কিনে দিলো এক ‘ফারাড’। গোড়াতেই বিপত্তি ঘটলো। সাইকেলের যে তালার সঙ্গে প্রথম পরিচয়, সেটাকে ছোটবেলায় আমরা বলতাম গা-তালা। জার্মান সাইকেলে দেখলাম চাকায় জড়ানো চেইনের সঙ্গে তালা। যাহোক, পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার পর ভাবলাম বিদেশ বিভুঁই বলে কথা, প্রথম দিনই আর না-চড়ি। সাইকেল নিয়ে আগে বাড়ি যাই। দু’একদিন প্র্যাকটিস শেষে তারপর পথ হারাবো বলে পথে নামবো। হঠাৎ মনে হলো, তালার চাবিটা আনিনি। ফিরে গেলাম। দেখলাম যার কাছ থেকে কেনা হয়েছে তিনি বেরিয়ে গেছেন।

বারবার আসা পোষায় না। সিদ্ধান্ত নিলাম তালার একটা নতুন চাবি বানিয়ে নিয়ে যাই। যাওয়ার পথে একটা তালাচাবির দোকান পড়ে, আগেই দেখেছিলাম। সেটা রাস্তার ওপারে। দোকান মানে ছোটখাটো একটা কারখানা। সাইকেল নিয়ে দাঁড়াতেই দশাসই এক জার্মান। জিজ্ঞাসু নেত্র। আমার টুটাফুটা জার্মান ভাষা তার মর্মে পশলো বলে মনে হলো না। তাই দিলাম ইশারা ভাষা। কাজ হলো। কিন্তু যে কাজ তাতে তো আমি থ! প্রায় দেড় হাত লম্বা একটা কাঁচি দিয়ে সে তালাশুদ্ধ চেনটা কেটে ফেলে দিলো তার বিনে। তারপর সে যা বোঝালো তার মমার্থ হলো, চাবি বানাতে গেলে খরচা তিন মার্ক আর এই চেনতালা নতুন যেটা দিচ্ছি তার দাম মাত্র দুই মার্ক। যে এক মার্ক বাঁচলো সেটা যদি আমাকে দিয়ে যাস তাহলে এক বোতল বিয়ার কিনে খাই, অনেকক্ষণ ফাঁকা বসে আছি।

আমার সৌভাগ্য তিন বছরের প্রবাস-জীবনে শুধু দরদীদের সাক্ষাৎ পেয়েছি। বেদরদী কারো কথা মনে পড়ে না। তাই তাকে শুধালাম, তোদের দেশে এই চেনতালার ঝামেলা কেন রে? সে বলল, বাড়ির সামনে দেখিসনি দুহাত উঁচু খুটিতে বাঁধা সাইকেল? খুঁটিতে বাঁধা না থাকলে ভিনপাড়ার বিচ্ছুরা এসে সাইকেল নিয়ে যায়। আর কিছু চুরি না গেলেও জার্মানিতে সাইকেল চুরি যায়। শুনে মজা পেলাম।

মনের আনন্দে হঠাৎ মনে হলো, দেখি না সাইকেলটা একটু চালিয়ে। ভুলে গেলাম, আমি জার্মানির রাস্তায়। সেখানে রাস্তায় চলার অনুশাসন— ডান পাশ দিয়ে এগোও। কিন্তু বাংলাদেশে তো উল্টো। সব ভুলে আমি প্যাডেলে চাপ দিলাম। পরেই ঘটলো এক ভয়াবহ কাণ্ড! আমাতে আর এক জার্মান সুন্দরীতে মুখোমুখি সংঘর্ষ ও পতন। ভয়ে তো আমার বুকের রক্ত হিম। পড়ে থাকলাম ঝিম মেরে। চোখ বন্ধ। দেখি জার্মান সুন্দরী আমাকে টেনে তুলছেন। দাঁড়ালাম। তার প্রশ্ন— নতুন? বললাম—  হ্যাঁ। বিস্ময়ে দেখি, সুন্দরী আমার গায়ের জ্যাকেট ঝেড়ে দিচ্ছে। তার পরের ঘটনা আরো ভয়ঙ্কর! তিনি আমার মাথার অবিন্যস্ত চুল, বিন্যস্ত করে দিলেন। বললেন, সুন্দর চুল তোর! তারপর? কবি বলেছেন, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?