শিল্প ও সাহিত্য

ঘুড়ির স্বাধীনতা

তাপস রায় : একভাবে আর কতক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকা যায়? অথচ খোলা আকাশে মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়তে না পারলে সাধ মেটে না কিছুতেই। আকাশটা কত্তবড়! সেখানে ছোট-বড় কত রঙের মেঘ, কত পদের পাখি। কেউ দলবল নিয়ে, কেউ দলছাড়া উড়ে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। হঠাৎ আবার কী মনে হতেই তাদের কেউ কেউ নতুন দল পাকিয়ে উড়ে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। মনে হচ্ছে এই বুঝি পেছন থেকে কেউ ‘এই ... হুস্ হুসস’ করে তাড়া দিচ্ছে। সেও তো ওদের সঙ্গে যেতে পারে। যাবে নাকি?ছোট্ট ঘুড়ি মুহূর্তেই মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলল। বিকেলের মৃদু বাতাসে সে উড়ছিল আপনমনে। উড়তে উড়তে বেশ একটু উঁচুতেই সে উঠে এসেছে। একটু আগে এই পথে উড়ে গেছে সাদা বক। তাকে দেখেই চোখ কপালে তুলে বলল, ভালোই তো উড়তে শিখেছ, দেখো আবার পথ হারিয়ে ফেল না!বড়দের এই এক দোষ, সারাক্ষণ শুধু ‘এটা কোরো না, ওটা কোরো না’। প্রাণখুলে একটু উড়বার যেখানে উপায় নেই, সেখানে পথ হারানোর আর ভয় কী? সুতরাং ও ভয় সে করে না। আর উড়বেই বা কী করে? একটু নড়লেই সুতায় টান পড়ে। তখন বাধ্য ছেলের মতো সোজা হয়ে উড়তে হয়। অথচ উড়ে উড়ে সে আরো বহুদূরে যেতে চায়। ওই আকাশে যেখানে চিল চামচিকের মতো এই এতটুকু দেখায়, সেখানে যেতে চায় সে। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ঘুড়ির পুরো শরীর দুলে ওঠে। দমকা বাতাসের কারণেই হয়তো এমন হয়। আর তাতেই মাথা নিচের দিকে ঘুরে যায় নিমিষেই। সে অবস্থাতেই বাতাসে ডুগডুগির তালে ডিগবাজি খায় কয়েকবার। তারপর সাইসাই করে এক ঝটকায় নিচে নেমে আসে অনেকটুকু। ঘুড়ির নাজেহাল অবস্থা দেখে সারস পাখি হো হো করে হেসে ওঠে। একেই বলে কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ! কোথায় এগিয়ে এসে সাহায্য করবে তা নয়, উল্টো দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ঘুড়ির গা জ্বলে যায়। হঠাৎ সুতায় টান লাগায় পরক্ষণেই বুকে বল ফিরে আসে তার।  যাক্ বাবা, এ যাত্রায় তাহলে রক্ষা পেল সে!একটু সামলে নিয়ে মাথা উঁচু করে ঘুড়ি পুনরায় তরতর করে উপরে উঠতে থাকে। আহ্! বিপদ কেটে যাওয়ার আনন্দে শিস দিয়ে ওঠে সে। সত্যি, উড়তে পারার মতো মজা আর কিছুতেই হয় না। আজ সে ইচ্ছেমতো সাধ মিটিয়ে আকাশে উড়বে। উড়তে উড়তেই মেঘের ছেলে টেঘের সঙ্গে ঘুড়ির দেখা হয়ে যায়। দুজনে টক্কর লাগার উপক্রম হতেই ঘুড়ি বামে গোত্তা খেয়ে নিজেকে সামলে নেয়। ¯্রােতের অনুকূলে ভেসে থাকতে চাইলে তার কায়দা যেমন জানতে হয় বাতাসে ভেসে থাকাটাও তেমনি। কায়দা রপ্ত করতে পারাটাই আসল কথা। রপ্ত করতে না পারলেই ভোকাট্টা! টেঘ ঘুড়িকে দেখেই চেঁচিয়ে জানতে চায়, কোথায় চললে? ঘুড়ি শিস বাজাতে বাজাতেই বলে, জানি না। : এ কেমন কথা! : এই আসল কথা। আমার আজ খুব আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করছে।ঘুড়ির কথা শুনে টেঘের চিন্তা হয়। কারণ ঘুড়ির স্বভাব সে জানে। তাই দ্রুত ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর পথ আগলে বলে, আকাশ ছোঁয়া ছোটদের কাজ নয়। তুমি ফিরে যাও।টেঘের কথায় ঘুড়ি খুব বিরক্ত হয়। আবার সেই বাধা। কিন্তু টেঘ তো বড় নয়, তাহলে সে কেন তাকে বড়দের মতো সাবধান করছে, ঘুড়ি ভেবে পায় না। টেঘ পুনরায় বলে, দূর আকাশে অনেক বিপদ। বাতাসের বড় বড় ঢেউ সেখানে সারাক্ষণ খেলে বেড়ায়। একবার সেই ঢেউয়ের নিচে পড়লে আর রক্ষা নেই। ঘুড়িও এমন কথা শুনেছে। কিন্তু এগুলো বিশ্বাস হয় না। সে উল্টো টেঘকে প্রশ্ন করে, সেকথা তুমি জানলে কী করে?এ কথায় টেঘ অপ্রস্তুত হয়। তারপর বেশ চড়া গলায় বলে, কেন তুমি জানো না? সবাই তো তাই বলে।: সবার সব কথা বিশ্বাস করতে নেই। তুমি আমার সঙ্গে চলো, গেলেই বুঝতে পারবে।ঘুড়ির প্রস্তাবে টেঘ সায় দেয় না। তাকেও দক্ষিণে যেতে হবে। দলছুট হলে পথ হারাবার ভয় আছে। সে ঘুড়িকে শেষবারের মতো নিষেধ করে মেঘের দলের সঙ্গে মিশে যায়। টেঘের হঠাৎ চলে যাওয়া দেখে ঘুড়ির খুব হাসি পায়। আপনমনেই বলে ওঠে, ভীতু কোথাকার!আকাশে আজ ছোট-বড় অনেক ঘুড়ি উড়ছে। কোনোটার নাম ফেচক্যা, কোনোটার নাম সাপ ঘুড়ি, কোনোটা কোঁয়ারে, বজরা বা বাক্স ঘুড়িÑ বিচিত্র সব নাম। একেক ঘুড়ি দেখতেও একেক রকম। ফেচক্যা দেখতে ঠিক ফিঙে পাখির মতো। সাপ ঘুড়ি ডানে-বামে কেঁপে কেঁপে যখন আকাশে ওড়ে তখন দূর থেকে ফণা তোলা সাপের মতো দেখায়। মনে হয় কাছে গেলেই ছোবল দেবে। ঘুড়ি ভয়ে ওদিকটায় যায় না। তবে ফেচক্যার সঙ্গে তার দারুণ ভাব। বেয়ারা বাতাস সামলে, দুষ্টু পাখির নখের আচড় এড়িয়ে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে আকাশে ওড়ার কৌশল সেই তো তাকে বলেছে। কোঁয়ারে দেখতে গোয়ারের মতো। একেকটা ঠিক জানালার মতো বড়। মাথার দুপাশে দুটো শিং। সেখানে পতাকা লাগানো। নিচের দুপাশে ইয়া বড় দুটো লেজ। পতাকা এবং লেজ পুরনো শাড়ি কেটে বানানো। শরীরে তার অসম্ভব জোর। উড়িয়ে দেয়ার পর কোঁয়ারে শক্ত খুঁটি বা গাছের ডালে বেঁধে রাখতে হয়। নাটাই দিয়ে ওকে সামলানো অসম্ভব!ঘুড়ির অবশ্য অত হাঙ্গামা নেই। লেজ থাকলেও তার আনন্দ, না থাকলেও আপত্তি নেই। লেজ থাকলে সবাই তখন তাকে ‘চিল্যা’ বলে। সে যাই হোক, আকাশে তার মতো করে স্বাধীনভাবে উড়তে পারলেই সে খুশি। কিন্তু এখানেই যত বিপত্তি। কোঁয়ারে বা বজরার কথা না হয় আলাদা, ফেচক্যার মতো অত উঁচুতে ওঠার সুযোগ সে কখনও পায় না। অথচ সব দোষ যেন তার; সবাই বলে সে নাকি উঁচুতে উড়তে পারে না। কেন সে পারবে না? অবশ্যই পারবে। আর এ কথাটিই প্রমাণের জন্য ঘুড়ি আজ আকাশ ছুঁতে চাইছে। হঠাৎ ফেচক্যার কণ্ঠ শুনে ঘুড়ি থমকে দাঁড়ায়। ফেচক্যা দূর থেকে এতক্ষণ ঘুড়ির ওড়া দেখছিল। এইবার কাছে এসে বলে, বাব্বা, তোর সাহস আছে দেখছি! কিন্তু বেশি সাহস তো ভালো নয়।ফেচক্যার কথা শেষ না হতেই ঘুড়ি অধৈর্য হয়ে বলে ওঠে, শেষ পর্যন্ত তুমিও ভয় দেখাচ্ছ!: দেখাচ্ছি কারণ ওপরে কিছু ভয়ের ব্যাপার তো আছেই।: তাহলে চলো আমরা দুজনেই যাই।: তা তো হবার নয়। : কেন?ঘুড়ি এত জোরে বলে যে আশপাশের অনেকেই উড়ে যেতে যেতে ঘাড় বাঁকিয়ে চায়। পায়রার দল ধান ক্ষেত থেকে ঘরেই ফিরছিল বোধ হয়। তারা চমকে ওঠে। সেখান থেকে সবচেয়ে বড় ঝুঁটিঅলা পায়রাটি এগিয়ে এসে জানতে চায়, কী হয়েছে? ফেচক্যা ঘুড়িকে দেখিয়ে বলে, ওর ঘোড়ারোগ হয়েছে।পায়রা ঘাড় নেড়ে কণ্ঠে বিস্ময় নিয়ে বলে, কই এমন রোগের কথা তো কখনও শুনিনি!: ঘোড়ার ডিমের কথা তো শুনেছ?: হ্যাঁ, তা শুনেছি।: ওই রকমই একটা ব্যাপার আর কী। এ রোগ খুব ছোঁয়াচে। তুমি যেখানে যাচ্ছিলে যাও। এ রোগের ওষুধ আমি জানি। ছেঁয়াচে রোগের কথা শুনে ঝুঁটিঅলা পায়রা আর দাঁড়ায় না। সে উড়ে যেতেই ঘুড়ি ভীষণ রেগে বলে, মিথ্যা বলা খুব খারাপ। তুমি মিথ্যা কথা বললে কেন? তাছাড়া এই ঘোড়ারোগটাই বা কী?ফেচক্যা এবার ফিক্ করে হেসে বলে, আরে বাবা, সবাইকে তো কথাটা জানাতে হবে তাই না। ওকে বলে দিলাম, ও এখন সবাইকে বলে দিবে। : কিন্তু ও তো নিজেই জানে না ঘোড়ারোগ কী?: সেজন্যই তো আরও বেশি করে বলবে। যারা বুঝবার তারা ঠিক বুঝে নিবে। ও নিয়ে চিন্তা করিস না। এখন ফিরে চল।আমি যাব না। তুমি যাও। ঘুড়ি ফেচক্যাকে পাশ কাটিয়ে আরও উঁচুতে ওড়ার চেষ্টা করে। ফেচক্যা কিন্তু ঘুড়িকে একা ছেড়ে দেয় না। সেও পাশাপাশি উড়তে থাকে। তারপর সময় নিয়ে বলে, এই যে তুই মিছেমিছি জেদ করছিস এটাই ঘোড়ারোগের প্রথম লক্ষণ।: আমি মিছেমিছি জেদ করছি?: হ্যাঁ। নইলে তুই ভুলে যাচ্ছিস কেন, তুই ছোট্ট ঘুড়ি। পাখি না।: কিন্তু আমিও পাখিদের মতো উড়তে পারি। তারা যদি ওই দূর আকাশে উড়তে পারে তাহলে আমি পারব না কেন?: কারণটা খুব সহজ।: মানে!এবার ফেচক্যা ধমকে ওঠে। আরে বেকুব, পাখির আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা আছে। তোর সেটা নেই। তুই লাটাইয়ের সঙ্গে বাধা এ-কথা ভুলে গেলে চলবে কেন?এই প্রথমবারের মতো হতাশার কালো মেঘ ছোট্ট ঘুড়ির সবুজ মনে ছেয়ে যায়। এভাবে সে ভাবেনি। কতদিন সে আপনমনে আকাশে উড়েছে আর ভেবেছে, মেঘের দেশ পারি দিয়ে একদিন সে আকাশ ছুঁয়ে দেখবেই। ভেবেছিল আজকেই সেই দিন। কিন্তু সে যে পাখির মতো স্বাধীন নয় এ কথাটাই তো তার কখনও মনে হয়নি। ঘুড়ি আর একটি কথাও না বলে নিচের দিকে নামতে থাকে। সুতায় ঢিল পড়ায় বাতাসে বার কয়েক গোত্তা খায়। পুনরায় স্থির হয় সে। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। বাতাসের ধাক্কায় মাথাটা দুলে উঠে বামে হেলে যায়। ওভাবেই গোত্তা খেতে খেতে নামতে থাকে সে। ফেচক্যার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। পাখি ছাড়া আকাশে আর কারো ওড়ার স্বাধীনতা নেইÑ এ কথা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। পাখির মতো দেখতে হওয়ায় রোজ কত পাখি তার সঙ্গে ভাব করতে আসে। ওদের সঙ্গে আনন্দে ফেচক্যাও বাতাসে ভেসে ভেসে ওড়ে। ওইভাবে উড়তে উড়তেই সে জেনেছে সুতায় টান পড়লেই তাকে ফিরে আসতে হবে মাটিতে। মাটিতে নামার আগে জেদ চেপে বসে ঘুড়ির মনে। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেয়, সে শেষ চেষ্টা করবে। বুদ্ধিটাও মাথায় আসে ঠিক সময় মতো। ঘুড়ি বাতাসে গা এলিয়ে দেয়। যেন আজ সে কত ক্লান্ত! বাতাস তাকে আজ ইচ্ছেমতো উড়িয়ে নিয়ে যাক, বাধা দেবে না। কারণ এই বাতাসই পারবে তাকে ওই দূর আকাশে নিয়ে যেতে। ঘুড়িকে ওভাবে উড়তে দেখে টেঘের খুব কান্না পায়। ঘুড়ি বাতাসের বড় বড় ঢেউয়ের নিচে পড়েছে। ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে দূরে আরো দূরে। অথচ তার কিছুই করার নেই। ঝুঁটিবাধা পায়রা ডানা ঝাপটে উড়ে সরে যেতে যেতে বলে, ওর ঘোড়ারোগ হয়েছে। খুব ছোঁয়াচে। খুব সাবধান। ‘খুব’ কথাটা সে খুব করেই বলে।খুব ছোঁয়াচে!খুব সাবধান!ফেচক্যা কিছু বলে না। কারণ সে জানে সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি ওভাবেই ওড়ে। আর সুতা ছিঁড়ে না যাওয়া পর্যন্ত কোনো ঘুড়িই স্বাধীনভাবে উড়তে পারে না। ছোট্ট ঘুড়ির এবার আর আকাশ ছুঁতে বাধা নেই।

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ জুন ২০১৪/শান্ত