‘একটি ক্লাসিক হলো সেই বই, যা কখনও তার পাঠকদের সঙ্গে যা কিছু বলার তা বলতে কখনো ক্লান্ত হয় না।’ — ইতালো ক্যালভিনো, Why Read the Classics?
‘ক্লাসিক’ শব্দটি এসেছে লাতিন classicus থেকে, যার অর্থ ‘সর্বোচ্চ শ্রেণির’। সাহিত্যে এর অর্থ কেবল কোনো পুরোনো বা মর্যাদাপূর্ণ রচনা নয়, বরং এমন এক সৃষ্টি যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে মানুষের সার্বজনীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে কথা বলে।
টিএস এলিয়ট বলেছিলেন, ‘A classic can only occur when a civilization is mature.’ অর্থাৎ ক্লাসিক তখনই জন্ম নেয়, যখন কোনো সভ্যতা নিজেকে ও তার অতীতকে বুঝতে শেখে। আর গ্যোথে ক্লাসিকের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘Classic is healthy, romantic is sick.’ রোমান্টিসিজমের অন্যতম প্রণেতার ভাষায়, ক্লাসিক সাহিত্যের প্রাণশক্তি তার ভারসাম্য ও পরিপূর্ণতায়। একটি ক্লাসিক তাই অতীতের নিদর্শন নয়; এটি যুগের পর যুগ ধরে চলমান এক জীবন্ত সংলাপ।
ক্লাসিক সাহিত্য টিকে আছে, থাকবে, কারণ এটি আমাদের ভিতরের অপরিবর্তনীয় সত্যগুলো প্রকাশ করে। যে প্রশ্নগুলো সোফোক্লিস বা শেক্সপিয়রকে ভাবিয়ে ছিল, সেগুলো আজও আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়: ন্যায়বিচার কী? ভালোবাসা কীভাবে ধ্বংস করে এবং কীভাবে মুক্তি দেয়? উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য কী? মানুষের চিরন্তন ঈর্ষা, লোভ, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো বোধগুলো ক্লাসিককে মহিমান্বিত করে।
হ্যামলেট বা মহাভারত পড়তে পড়তে আমরা তাই নিজেদের প্রতিফলন দেখি সেইসব চরিত্রের মধ্যে, যারা হাজার বছর আগে বেঁচেছিল বা কল্পনায় জন্মেছিল। তাদের আবেগ ও দ্বন্দ্ব আজও আশ্চর্যরকমভাবে আমাদের কাছে পরিচিত ও প্রাসঙ্গিক লাগে। ক্লাসিক তাই চিরন্তন হয়েও সদা সমকালীন।
আধুনিক চিন্তার শিকড়
প্রত্যেক সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে সেই গল্প ও ধারণার ওপর, যা তার আগে এসেছে। ক্লাসিক রচনাগুলো রচিত হয় সেই গভীর মাটি, যেখান থেকে আধুনিক শিল্প, রাজনীতি ও দর্শন বেড়ে উঠেছে। আপাতভাবে মনে হতে পারে, ক্লাসিক সাহিত্য মানে তো পুরোনো কথা। কিন্তু ক্লাসিক পুরোনো হলে তার পূর্ণ কলস শূন্য হয় না কখনো। রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করে বলি―
‘পুরানো জানিয়া চেয়ো না আমারে আধেক আঁখির কোণে অলস অন্যমনে। আপনারে আমি দিতে আসি যেই জেনো জেনো সেই শুভ নিমেষেই জীর্ণ কিছুই নেই কিছু নেই, ফেলে দিই পুরাতনে॥ আপনারে দেয় ঝরনা আপন ত্যাগরসে উচ্ছলি– লহরে লহরে নূতন নূতন অর্ঘ্যের অঞ্জলি।’
ক্লাসিক শিল্পসাহিত্য তাই অনন্ত ঝর্ণার জলধারা। এ জলধারা ছাড়া আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন হবে শিকড়হীন, যেন মাটিহীন এক অরণ্য। প্লেটো, ঠাকুর বা দান্তে পড়া মানে হলো বোঝা, আমাদের নৈতিক ও নান্দনিক সংবেদন কোথা থেকে এসেছে। ক্লাসিক শুধু সাহিত্য নয়। মানুষের জীবন আর সভ্যতার এক দলিল। এ এমন এক ধরনের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য, এমন এক সচেতনতা যা আমরা এক বিশাল ও জটিল চিন্তার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে পেয়েছি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহমান চিরন্তন ক্লাসিকের সুধা পান করে সুকুমার মানব হয়ে ওঠে।
গভীর পাঠের শৃঙ্খলা
তবে কথা হলো, ক্লাসিক পাঠে ধৈর্য লাগে। ওরা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি প্রতিরোধ করে, যা ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় প্রলোভন। তাদের ভাষা হয়তো ঘন, সংহত, তাদের গতি হয়তো ধীর, শান্ত কিন্তু এখানেই ক্লাসিকের আসল মূল্য। ক্লাসিক বা ধ্রুপদী সাহিত্য আমাদের ধীরে পড়তে শেখায়, গভীরভাবে ভাবতে শেখায়, জটিলতার সঙ্গে লড়াই করতে শেখায়। এভাবে তারা গড়ে তোলে এলিয়টের কথিত ‘ঐতিহাসিক বোধ’ সেই চেতনা, যা মানুষকে মানব-অভিব্যক্তির অবিরাম প্রবাহের মধ্যে নিজের অবস্থান চিনতে শেখায়।
নৈতিক ও আবেগীয় শিক্ষা
মহান সাহিত্য যেমন মস্তিষ্ক পরিশীলিত করে, তেমনি হৃদয়। এটি আমাদের সহানুভূতি বাড়ায়, কারণ এটি এমন সব জগতে প্রবেশ করায়, যেগুলো আমাদের নিজের জগতের একেবারে বাইরে। ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের কথায়― The only true voyage of discovery would be not to visit strange lands but to possess other eyes.
ক্লাসিক আমাদের সেই নতুন চোখ দেয় যা অন্যের জীবন, অন্যের সময়, অন্যের বেদনা অনুভব করার ক্ষমতা। আমরা অমল কিংবা ঈডিপাসের জন্য কাঁদি। আমরা গ্রেগর সামশা কিংবা কুবেরের জীবনকে নিজেদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। ক্লাসিক এই মিলটা ঘটায়, প্রাণে প্রাণে, কালে কালে।
সাংস্কৃতিক অগভীরতার প্রতিষেধক
অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল বিভ্রান্তির এই যুগে ক্লাসিক সাহিত্য এক বিপরীত শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এগুলো আমাদের ধীরে হাঁটতে শেখায়; মনে করিয়ে দেয় যে সব মূল্য নতুনত্বে নয়। ওরা শিক্ষা দেয় বিবেচনা, ধৈর্য, আর ধারাবাহিকতার এমন গুণ, যা আমাদের সময়ের সাংস্কৃতিক বিস্মৃতি থেকে রক্ষা করে।
ডিজিটাল যুগে ক্লাসিকের ভাগ্য
আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে মনোযোগই নতুন মুদ্রা, সেখানে একটি ক্লাসিক পড়া যেন এক নীরব বিদ্রোহের কাজ। দুনিয়া এখন ভাবার চেয়ে দ্রুত স্ক্রল করে; গল্পগুলো সংকুচিত হয়ে যায় ত্রিশ সেকেন্ডের রিল-এ; ভাষা বেঁকে যায় ক্যাপশনের সীমার মধ্যে। মনের চেয়ে দ্রুত আঙুল চলে আমাদের। লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের খাঁচাবন্দি মোবাইল জীবন থেকে হাঁপিয়ে উঠলে ক্লাসিক দিতে পারে শান্তি। সেই শান্তি যা জীবনানন্দ পেয়েছিলেন বনলতা সেনের কাছে― ‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।’
এই তাৎক্ষণিক ভোগের উন্মত্ততার যুগে ক্লাসিকরা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে―শান্ত, সত্য, এবং তারা জীবন্ত। একজন হ্যামলেট, রোমিও, নিতাই, পার্বতী, কুসুম পিয়াসী পাঠকের অপেক্ষায় থাকে― ‘এ গান যেখানে সত্য অনন্ত গোধূলিলগ্নে সেইখানে বহি চলে ধলেশ্বরী; তীরে তমালের ঘন ছায়া; আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা ক’রে, তার পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
ক্লাসিক আদতে সেই সব সাহিত্য, সেই সব শিল্পকর্ম যারা অপেক্ষা করে থাকে আগামীর মগ্ন পাঠকের লাগি। তারা সময়ে বুড়ো হয় না, পুরোনো হয় না। ক্লাসিক খৈয়ামের অনন্ত যৌবনা বই―‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা যদি তেমন বই হয়।’ ক্লাসিক তেমনই বই যা আজকেও বাংলাবাজারে, নীলক্ষেতে ছাপা হচ্ছে। ভাবা যায়, কোথাকার এরিস্টটল, গ্যোথে, শেক্সপিয়র, কাফকা এই ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝকঝকে নতুন সব মলাটে আর বাঁধাইয়ে! এই তো ক্লাসিকের শক্তি।
ক্লাসিক আদতে টাইম মেশিন। যাতে চড়ে আমরা চলে যাই সময়ের যে কোনো পলে, প্রহরে। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ বা ‘পথের পাঁচালী’ পড়া মানে হলো সময়কেই পুনরুদ্ধার করা। এই সোস্যাল মিডিয়ার লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের অবিরত ‘আপডেটেড’, ‘নোটিফিকেশনের’ চাপ থেকে দূরে রাখে ক্লাসিক আর ক্লাসিক পড়ে আমরা সত্যিকারের ‘অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ’ হই। ক্লাসিকরা কখনও ক্লিকের জন্য প্রতিযোগিতা করে না; তারা অপেক্ষা করে চিন্তাশীল পাঠকের জন্য।
ক্লাসিকের দায় নেই ‘ভাইরাল’ হবার, বরং সে অটল, স্থির হিমালয়। সংবেদনশীল, সচেতন মানুষের দায় আছে সেই হিমালয় অভিযানে যাবার। মহিমান্বিত ক্লাসিকের কাছে আপনাকে যেতে হবে, যেমন আপনি গহন অরণ্যে, সুবিশাল সমুদ্রে বা উচ্চতম পর্বত শিখরে যান। ‘আরণ্যক’, ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘সিংহল সমুদ্র’, ‘মালয় সাগর’ আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমরা কি যাবো না ধ্রুপদি অরণ্যে-সমুদ্রে-পাহাড়ে?
আজকের যা ভাইরাল, তা উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠে এবং দেশলাই কাঠির মতো দ্রুত নিভে যায় আর চিরন্তন যে ক্লাসিক, তা যেন শিখা-অনির্বাণ। সে আলো ছড়িয়ে দেয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেতনা গড়ে তোলে। আজকের দিনে তাই বারবার আমাদের ক্লাসিকের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
মূলত, ক্লাসিক সাহিত্য নস্টালজিয়ার বিষয় নয়; এটি গভীরতার বিষয়। এটি সংরক্ষণ করে মানব চেতনার দলিল, তার যন্ত্রণা, বিস্ময়, ও নৈতিক অনুসন্ধান। ক্লাসিক পড়া মানে হলো অতীতের সঙ্গে কথা বলা, বর্তমানকে বুঝবার জন্য, ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। ক্লাসিক শুধু বই নয়, এটা ঠিক আমরা অধ্যয়ন করি, পাঠ করি, কিন্তু আদতে ওরাই আমাদের অধ্যয়ন করে, ধারণ করে।
ক্লাসিক হলো সেই আয়না যা আমাদের মুখের রূপ ও খুঁত তুলে ধরে অকপটে। আর এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায়, ক্লাসিকগুলোই মনে করিয়ে দেয়―স্থায়িত্বের মানে কী? ক্লাসিক দরকারি, কারণ তা আমাদের নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বর এক জগতের খোঁজ দেয়।