পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের আলোয় আমের সিঁদুর আরো লাল দেখাচ্ছিল। পশ্চিমের আধখোলা আকাশে থেকে গাঢ় মেঘের ফাঁক গলে চিলতে আলো নামছে খুব তীক্ষ্মরেখার। কামাল বৈরাগী লালাভ সিঁদুরে আমের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। টোলারবাগের চির তরুণ কামাল বৈরাগী। অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ তিনি। প্রতিদিন পোকাসহ আম খান। ছোট্টবেলার অভ্যেস। দাদিমার মুখে গল্প শুনেছেন― পোকাসহ আম খেলে নদীতে দ্রুত সাঁতার কাটা যায়। প্রবল স্রোতের মুখেও নদী পার হওয়া যায়। সেই থেকে আমের সঙ্গে পোকা খাওয়া তার অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। তাই গাঁয়ের লোকেরা তাকে ‘আম কামাল’ নামে ডাকতেন। কিন্তু এমন ডাক শুনে কামাল বৈরাগী পুলকিত বোধ করতেন। পোকা খাওয়া নিয়ে খারাপ লাগার চেয়ে তিনি নিজের সাহসের প্রতি সমীহ বোধ করতেন বেশি।
তীব্র স্রোতের নদী পার হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। দুঃসাহসী বিয়ার গ্রিলের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সাগরের সীমানা পেরুনোর মতো বীরত্ব তার মনে বাসা বেধেছিল। কখনো কখনো নিজেকে ভাবতেনও তাই। বাড়িতে নানাজাতের আমের স্বাদ নিতে গিয়ে টের পেয়েছিলেন― টক আমে পোকা ধরে কম। আর মিষ্টি আমে পোকা ধরে বেশি। মিষ্টি আমের স্বাদ ভুলতে পারেননি এত বছর পরও। আম তার জীবনের পাথেয় হবে কখনো ভাবেননি। দাদির আদর বেশিদিন পাননি কামাল বৈরাগী। যে-টুকুন পেয়েছেন, তা দশ বছরের বেশি নয়। আদুরে দাদির শেখানো সংস্কার তার জীবনে ভীষণ রেখাপাত ফেলে। মাঝে মাঝে সেই ফলও পেয়েছেন কামাল। বর্ষার প্রবল স্রোত তাকে আটকাতে পারেনি। একদিন খরস্রোতা দীর্ঘ নদী পার হয়েছিলেন তিনি। সেও তার এক ঢেউয়ের পাহাড় পেরোনো সময়।
বুড়ো দাদি কুড়োনো পাকা আম থেকে বড় মাছের মাথা সবই নাতির জন্য রেখে দিতেন। অমন মায়াবী আদর তাকে তুমুল দাদীভক্ত করে তোলে। দাদি ইহকাল ত্যাগ করার পরও কামাল সেই স্মৃতি আর বিশ্বাস বয়ে বেড়িয়েছেন। কামালের মনোস্নেহ এক দীর্ঘশ্বাসের মতো। নিজে নির্ভার হয় ঠিকই, তবে একবার বুক ভেদে ছেড়ে দিলে যেন প্রকৃতি বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। কামাল বুঝতে পারেন―উদার বাতাস বিষণ্ণতাকে কত অনায়াসে শুষে নেয়! বাতাসের কোনো অহঙ্কার নাই। ঘৃণা নাই। ঈর্ষা নাই। দম্ভ নাই। আছে অনুভূতি প্রবণ ছোঁয়া। তার কাছে জীবন মানে মায়া। মায়া কি জিনিস কামাল জানেন না, কিন্তু জানার মতোন থাকেন! যেন নিজেকে উজার করে দেওয়া এক ভালোবাসা। দাদির মৃত্যুর পর কামাল নির্লিপ্ত হয়ে যান। চঞ্চল টগবগে কিশোর বড় হতে হতে সবকিছু থেকে নিজেকে অন্যভাবের দিকে নিয়ে যান। এমন নয় যে, মা-বাবার আদর কম ছিল! একমাত্র সোনায় সোহাগা তো কামাল। দাদির শোক তাকে দুরন্তপনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এখন তিনি স্থির আর পরিণত স্বভাবী মানুষ― যাকে বলে থিতু, ঠিক সেই রকম হয়ে যান কামাল।
পণ করেছেন বিয়ে করবেন না। কুমার জীবন কাটিয়ে দেবেন। স্বাধীন সুখের মধ্যে এই যা সুখ! সুখের চাঁনপাখিকে মুক্তই দেখতে চান কামাল। সংসার মানে খাঁচা―এই বোধ জন্মানোর পেছনে তার মনে গভীর দুঃখ আছে। ছেঁড়া কাগজের মতো দুঃখেরও টুকরো টুকরো ভাগ আছে। কোনো টুকরো একবার উড়ে গেলে ফিরে আসে না। আবার কোনো টুকরো গহ্বরে ঢুকে গেলে আর আলোর মুখ দেখে না। দুঃখ হচ্ছে অন্ধকারের মতো। শুরু হলে শেষ হতে চায় না। নদীর স্রোতের মতো টেনে নিয়ে যায় অচেনা জগতে। অচেনা জায়গায় গেলে মানুষের যে ধরনের আত্মীয়তাহীন দশায় পতিত হয়, অনেকখানি তেমনই। দুঃখ তার কাছে তলহীন ঘোলাটে জগত। আর সেই জগত দেখলেই আঁতকে ওঠেন কামাল। এক ভয়ানক ঘটনা তাকে নির্মম জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সে ঘটনা বইয়ে বেড়িয়েছেন আজীবন। দুঃসহ সেই স্মৃতি কামালকে নিঃসঙ্গ করেছে। নির্বাক করেছে। একাকী করেছে। নিঃস্ব করেছে। হরহামেশা সেই স্মৃতি দুঃখের ছবি হয়ে ভাসে চোখে।
সেবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পরীক্ষা শেষ। ঠিক করেছেন গাঁয়ের বাড়ি যাবেন কামাল। বাড়ি বলতে পদ্মার পাড় ঘেঁষে দুটো ছোট্ট কুঁড়েঘর তাদের সম্বল। বড় দাদার দাদার আমল থেকে ভাঙতে ভাঙতে জমিজিরাত একদম নাই। কৃষিজীবী বাবা এখন দিনমজুরিতে কালাতিপাত করছেন জীবন। বাবা যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চালান। বাবার বাড়তি আয় আর মায়ের মুঠোভরা তোলা চাল বিক্রি করে কোনো রকমে ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালান। যাই হোক! সেবার বর্ষার মৌসুম। কামাল বৈরাগী ঈদের ছুটিতে গাঁয়ের বাড়ি যান। বাড়িতে দুটো ছোট্ট কুঁড়েঘর মাঝখানের উঠোন দু’ভাগ করে রেখেছে। একটি কুঁড়েঘরের পুবদিকে মুখ ফেরানো, যার সামনের দেইলে আছে ডালিমগাছ। আর আছে কয়েকখানা পেঁপে গাছ। কাঁচা-আধাকাঁচা পেঁপেগুলো মাতৃস্তনের মতো ঝুলে আছে। ঠিক লাল নয়, কমলা রঙের সাথে সবুজ দেখে কামালের অদ্ভুত দৃশ্যে চোখে ভাসে। যেন ভাঙা ভাঙা কালো মেঘে ঢাকা নিস্তেজ পড়ন্ত সূর্য খাঁজভাঙা পেঁপে পাতার ফাঁকে উঁকি মারছে। যেন শতাব্দি কোনো এক বেদনাভরা চকসা ঠিকরে বেরুচ্ছে। আর পুবমুখি কুঁড়েঘরকে সবুজাভ করে রেখেছে পেঁপে গাছেরা।
উঠোন পেরুলে পশ্চিমমুখো আরেক শনের ঘর। যে কুঁড়েঘরে থাকতেন দাদি আর কামাল। দাদির বিদায়ের পর সে একাই থাকতেন। গাঁয়ের স্কুলে থাকাকালে সেটাই ছিল কামালের পড়ার ঘর। ঘরের সামনের দেইলে আছে দুই জাতের পেয়ারা। একজাতের পেয়ারা বিচি শক্ত, দেশি। দেশি গাছে সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে। আরেকজাত সাউদি পেয়ারা। আধপাকা সাউদি পেয়ারাগুলো বাইরের মসৃণত্বক দেখতে গাঢ় সবুজ। কিন্তু সাউদি পেয়ারা যত পাকে ভেতরে তত লাল হয়ে ওঠে। নরম বিচির পেয়ারাগুলো খেতে খুব সুস্বাদু আর মিষ্টি। পাকলে সারাবাড়ি মৌ মৌ করে। হালকা বাতাসে পাকা পেয়ারার ঝাঁঝালো সুবাস, আরো স্নিগ্ধ আরো মধুর হয়। শখ করে ওরা সাউদি পেয়ারার নাম দিয়েছিল ‘তরমুজি পেয়ারা’। বাড়িটির আটকাঠার সীমানাজুড়ে ছিল নানাজাতের আমগাছ। হিম সাগর, মিঠালি, চোষা, রাম সিঁন্দুর, কাঁঠালি, মালতার, কালী টক আরো কত কি! বাহারী আমের কারণে গাঁয়ের লোকেরা বলত―আমালী বাড়ি।
যেদিন কামাল বাড়ি গিয়েছিলেন সেদিন বর্ষার আগমনী ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। হু হু করছিল স্রোতস্বিনী পদ্মার পানি। পড়ন্ত বিকেলে আকাশ ছাওয়া মেঘে অন্ধকার নেমেছিল। অঝোরে ঝিরঝির বৃষ্টির সঙ্গে ছিল দমকা হাওয়া। বাবা-মার সঙ্গে রাতে খেয়েদেয়ে কামাল তার ঘরে যান। শুয়ে শুয়ে তিনি দাদির স্নেহমাখা মায়াবী মুখখানা দেখছিলেন। আর ভাবছিলেন, শতাব্দির সেরা রূপকথার সেইসব ধ্রুপদী কাহিনী। হঠাৎ দাদির মৃত সাদা চোখ দুটো এক জোড়া চাঁদের মতো ভেসে উঠল চোখের সামনে। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললেন, আহা চাঁদ! আমার দাদিকে এভাবেই লুকিয়ে রেখে জোসনা বিলাচ্ছো! কত স্বাদ তোমার! কতটা সুন্দর তুমি! কত মানুষ জোসনার আলোয় চোখের ভাষার আভা পাচ্ছে তার। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যান কামাল।
রাত দ্বিপ্রহর গড়িয়ে যাচ্ছে। ঝিরঝির বৃষ্টির সঙ্গে গাছের শাঁ শাঁ শব্দ বাড়ছে। আর পদ্মার করাল স্রোতের হু হু ধ্বনি মিলে বাতাসের শোঁ শোঁ আরো বেড়ে গেল। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস ক্রমশ প্রবল হচ্ছে। দোলানো কোমরের মৃদু ঢেউগুলো ক্রমশ পাহাড়সম হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে ঘূর্ণি বাতাসে সৃষ্টি হচ্ছে স্রোতকুণ্ডলী। ফলে দমকা বাতাসে স্রোত আরো বিক্ষুব্ধ রূপ ধারণ করছে। অঘোর ঘোরে কামাল রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন। পদ্মার ঢেউগুলো বিক্ষুব্ধ হয়ে আছড়ে ভাঙছে পাড়। ধপাস করে মাটি তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে। মাটির ছোট টুকরোগুলো মিশে যাচ্ছে প্রবল পানিতে। দু’হাতে অনেক চেষ্টা করছেন মাটি রক্ষা করতে। কিন্তু কোনোভাবেই পারছেন না। যত ভাঙছে তত পেছনে সরে আসছেন কামাল। বাড়ির পশ্চিম পাশের আমগাছগুলো শেকড়শুদ্ধ উপড়ে যাচ্ছে। মাটির সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে অবোধ্য স্রোতে।
হঠাৎ দেখলেন প্রলয়ঙ্করী বিশাল বিশাল ঢেউ তেড়ে আসছে বাড়ির দিকে। ভাবছেন এবার তো সবশুদ্ধ নিয়ে যাবে। কুঁড়েঘর, কাঁচাপাকা পেঁপে আর লালচে-হলুদ ডালিম, হাড়ি-পাতিল, খাট-তোষক সবকিছুই। ঘুমের ভেতর ‘মা’ ‘মা’ করে ডাকছেন, অথচ শুনছেন না। আরো জোরে ডাকছেন―মা ওঠো! মা-অ-অ-অ ও-ও-ও-ঠো! বাবা ওঠো, বলে ডাকছেন। অথচ শুনছেন না। দুকানে হাত দিয়ে ‘মা’ ‘মা’ ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলা কণ্ঠস্বর হুহু স্রোত, শাঁ শাঁ বাতাস, ঝিরঝির বৃষ্টিতে মিইয়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত কামালের সামনে মা-বাবা কুঁড়েঘর সবকিছু তলিয়ে-ভাসিয়ে নিয়ে গেল। অসহায় কামাল আর সহ্য করতে পারছেন না। ঘুমের ভেতর যেন অজ্ঞান অবস্থা তার!
হঠাৎ আড়মোড়া ভাঙতেই তার ঘুম কেটে যায়। কী যে দুঃস্বপ্নে কাটলো রাত! ফিনফিনে ঠান্ডা, অথচ ঘামে কামালের বালিশ ভিজে গেছে। চুলের গোড়ালি ভেজা। কপাল বাওয়া লবণাক্ত জলে তার চোখ জবজব করছে। লবণ জলে খানিকটা জ্বলছেও চোখ। কামাল বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ান। কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। টেবিলে রাখা জগ থেকে ঢকঢক করে গিললেন পানি। স্বপ্নের বিষণ্নতা কাটিয়ে ওঠার আগে মনে হলো― মা-বাবা কই?
দরজা খুলে পশ্চিম দিকে তাকাতেই দেখেন হালকা লালাভ আকাশে অবিরল টুকরো টুকরো বিদ্যুৎ ঝিলিক মারছে। উঠোনের অর্ধেক নেই। কুঁড়েঘর নেই। মা-বাবা নেই। ডালিম গাছের শেকড় আঁকাবাঁকা শির তুলে আছে ভাঙাপাড় ঘেঁষে। ঝিরঝির বৃষ্টিতে কামাল বেরিয়ে পড়ল মা-বাবার খোঁজে। জোরে মা বলে চিৎকার করার মতোন শক্তি নেই কামালের। পদ্মার স্রোত যেদিকে নামছে কামাল পাড় ঘেঁষে সেদিকে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ চমকালে দাঁড়িয়ে দেখেন― কোথাও যদি মা-বাবা ভেসে থাকেন। হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেলেন, দূরে কোথাও থেকে বাতাস বয়ে আনছে ফজরের আজান। আকাশ ফর্সা হয়ে উঠছে। অবগুণ্ঠিত সূর্যের আলো মেঘের খাঁজ কেটে বেরিয়ে আসছে বিষণ্ন আবছায়ায়। এমন দুঃসময়ে এক খোদা ছাড়া কামালের আর কিছু নাই এখন! শেষ সহায় বলতে যা!
ভিজে জবজবে কামাল চার রাকাত ফজরের নামাজ আদায় করলেন। মোনাজাতে বসে, খোদার কাছে পানাহ্ চাইলেন। যেন তার মা-বাবার সন্ধান দেন তিনি। মোনাজাত শেষে আবার হাঁটা শুরু করলেন। বেশ কিছুটা দূরে নদীর কূলে মানুষের শব্দ শুনতে পেলেন। সেদিকে হাঁটা ধরলেন কামাল। যেতে যেতে কখনো খাড়ি, আবার কখনো আকাশের দিকে তাকান তিনি। স্রোত যে বইছে তার অন্ত নেই। ভাটার টানে খরস্রোতা পানি নিচের দিকে নামছেই তো নামছে। শেষ নেই যেন অকূল সীমার! খুব কাছাকাছি একদল জটলা করছে। আর কী যেন বলাবলি করছে! কামাল দৌড়ে গেলেন জটলার কাছে। গিয়ে দেখেন নিথর দুটি লাশ।
কামাল জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন― মা মা বলে! বাবা বাবা বলে! জটলার ভেতর নরেন জলদাস কামালকে টেনে তুললেন। বললেন, ‘সকালে গাঙে আইসে জাল তুলতেই দুজনের লাশ পাই। হিম হইয়া আছে শরীর।’ বলেই কেঁদে ফেললেন নরেন। জড়িয়ে ধরলেন কামালকে। নরেন বললেন, ‘ঈশ্বর, তুমি আঘাত বইবার শক্তি দেও! সাহস দেও বাইচা থাকার।’ কামাল কাঁদছেন আর কাঁদছেন। আর বলছেন, ‘আমার আর পৃথিবীতে কিছু নাই। কেউ নাই― মা গো! বাবা গো! কেমন নিষ্ঠুর পৃথিবী! কিছুই রইলো না আর। মা গো! বাবা গো! কোথায় চইলে গেলে তোমরা!’
জটলা থেকে বেরিয়ে খোকন আলী কামালের কাছে আসলেন। কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘সবুর করেন! মানুষের মৃত্যুর উপর কারো হাত নেই। মৃত্যু হইলো ইহকাল আর পরকালের মিলন বিন্দু। যাকে কেন্দ্র কইরে জীবনরেখা আবর্তিত হয়। আসলে জীবতকালে মানুষ মৃত্যু থেইকে একসুতো দূরে থাকেন। সুতোয় টান পড়লে জীবন ওই বিন্দুতে পৌঁছায়।’
খোকনের কথায় কামাল আরো আবেগি হয়ে উঠলেন। আসলে দুঃখ মানুষকে অচল করে দেয়। হাত-পা স্থির রেখে দাঁড়াতে পারছেন না তিনি। খোকন কামালকে বুকে টেনে নেন। কাঁধে মাথা রাখা অশ্রুসজল কামাল তাকে জড়িয়ে ধরলেন। আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলছেন, ‘ভা-ই, ও ভা-ই!’ খোকন আবার বললেন, ‘বাড়ি কই আপনের?’ কান্না জড়ানো মৃদু কণ্ঠে বললেন কামাল, ‘আমার আর কিছুই নাই। নদী সব ভাইঙে নিয়া গেছে। মা গেছেন। বাবা গেছেন। সহায় সম্পদ গেছে। শেষ আশ্রয়ের বাড়িটিও ভাইসে গেছে নদীর স্রোতে। আমার আর কিছুই নাই। আমার আর কেউ নাই। সব গেছে। খোদা, এ জীবন রাইখে কী করব আমি! খোদা গো! মা গো! বাবা গো!’
কামালের কথা শুনে খোকন আলীর চোখে কেমন জানি ব্যথা অনুভব করলেন। চোখ দুটো হালকা ঝাপসা রক্তাভ হয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। ক’ফোটা গড়ানোর পর গামছা দিয়ে চোখের চারপাটি মুছলেন। আর মনে মনে ভাবতে লাগলেন―‘তাহলে দাফন সারতে হইবে আমাদের!’ নদীতে মাঝে মাঝে ভেসে আসা অচিন মানুষের লাশ কবর দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার আছে। গাঁয়ের কৃষক খোকন আলী দয়ালু লোক। সহজ-সরল সারা জীবনে তিনি মানুষেরই উপকার করেছেন। এবারও তাই করলেন। কামালের আর্তনাদে ভারী পরিবেশ থেকে নিজেকে সমঝে নিলেন। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন কামালকে, ‘লাশ কি নিয়া যাইবেন বাড়িতে?’ উত্তরে কামাল, ‘ভাইরে, কোথায় নিয়া যামু?’ খোকন আলী বললেন, ‘তাহলে কি দাফনের সুরাহা করমু?’
কামালের নির্বাক কণ্ঠে কোনো শব্দ বেরোয় না। সম্মতির ঢঙে শুধু মাথা নাড়ে। সম্মতি বুঝে খোকন বলেন, ‘খাড়ান, সব ব্যবস্থা করতেছি। ১০টা মিনিট সময় দেন।’ বলেই হাঁটা ধরলেন ইমাম সাহেবের পথে। মিনিট দু’য়েক হাঁটা রাস্তায় পৌঁছুতে দেরি হয়নি। মসজিদের ইমাম সাহেবকে সব কাহিনী খুলে বললেন খোকন। ইমাম সাহেব কথা শুনে খাটিয়া ধোয়ার ব্যবস্থা করলেন। দু’জনকে পাঠালেন দাফনের কাপড়সহ আনুষাঙ্গিক সুগন্ধির ব্যবস্থা করতে। আর খোকন আরো তিনজনসহ খাটিয়া নিয়ে রওনা হলেন নদীর পাড়ের দিকে। পেছনে পেছনে ইমাম সাহেব হাঁটছেন আর বলছেন, ‘খোদাতালা ছাড়া কার কোথায় কীভাবে মরণ রাখছে কেউই জানেন না। মৃত্যু হইল জীবনের সকল অর্জনের ছদগা! পবিত্র রুহ তার আলো বইয়ে নিয়ে যায়। পানিতে ডুইবে মরা মানুষ শহীদী মর্যাদা পায়। আল্লাহ ভরসা।’ তারা পৌঁছে গেলেন লাশের কাছে। কামাল আগের মতোই মা-বাবার মাঝখানে বসে আধো নিচু হয়ে কাঁদছে। কণ্ঠ ভেঙে গেছে। শক্তিহীন অসহায় মানুষ। তার উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই।
ইমাম সাহেব মাঝখান থেকে টেনে অসাড় কামালকে তুলবার চেষ্টা করলেন। তুলতে তুলতে মনে হলো হাত-পা ছেড়ে দিয়েছেন কামাল। নরেনও এসে হাত লাগালেন ইমাম সাহেবের সঙ্গে। দু’জনের কাঁধে দু’টি হাত রেখে কামাল দাঁড়িয়ে থাকে। আস্তে আস্তে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। যেন কিছুতেই পারছে না! তারপরও চেষ্টা করছে বারবার। হঠাৎ মাটির সঙ্গে পায়ের একটান অনুভব করলেন। খানিকটা সম্বিৎ ফিলে পেলেন তিনি। ইমাম সাহেব নরেনকে বললেন, ‘এক মগ পানি আনতে পারবেন?’ নরেন্দ্র বললেন, ‘আজ্ঞে, হুজুর!’ পানি আনলেন নরেন্দ্র। ইমাম সাহেব পানিতে কামালের মুখ ধুইয়ে দিলেন। বললেন, দুই ঢোক পানি মুখে দিতে। কামাল পানি মুখে দিয়ে গিলতে যাবেন, মনে হলো এত ভারি পানি আর কখনো পান করেননি। যেন অন্ননালী তার সবকিছু বইবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। অনেক কষ্টে পানি পান করলেন কামাল। খানিকটা সম্বিৎ আর আরাম বোধ করলেন। হালকাভাবে নরেনের কাঁধ থেকে হাত নামান তিনি। একহাত ইমাম সাহেবের কাঁধে। কাঁদতে কাঁদতে কামালের চোখ শুকিয়ে গেছে। কণ্ঠে তার করুণ হাহাকার ম্রিয়মান হয়ে উঠছে।
এদিকে খোকন আলী ক’জনকে নিয়ে লাশ খাটিয়ায় তুললেন। লাশ কাঁধে নিয়ে আস্তে আস্তে মসজিদের দিকে যেতে লাগলেন সবাই। ইমামের কাঁধে হাত রেখে চললেন কামাল। কিছুদূর যেতে নরেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হুজুর আমারও কি যাইতে হবে?’ বললেন ইমাম সাহেব, ‘নাহ আর কষ্ট করে আইতে হইব না!’ নরেন বললেন, ‘যদি কিছু মনে না লন, আমি লোকটার জন্য কিছু টাকা দিবার চাই।’ হুজুর বললেন, ‘দেন না! আজ আপনি যা করলেন তার তুলনা হয় না। অসহায় মানুষের সহায়ের রহমতে একদিন আপনার জীবন তরীও পার হবে। আর মৃত মানুষের অশেষ রহমত রুহে!’
ধুতির কোঁচা থেকে নরেন্দ্র একখানা পাঁচশ টাকার নোট গুজে দেন ইমাম সাহেবের হাতে। নোটটি পাঞ্জাবির পকেটে রাখলেন ইমাম সাকেব। বললেন, ‘ভালো থাকেন নরেন!’ নরেন মাথা নেড়ে আস্তে আস্তে নিজের পথে আড়াল হলেন। মিনিট চার কি দু’য়েকের মধ্যে তারা পৌঁছালেন মসজিদের উঠানে। লাশ দুুটি সৎকার করা হলো। আতর-চন্দন মেখে জানাজার জন্য বারান্দায় রাখা হলো। বাদ জোহর শেষে দাফন হলো। জানাজার আগে লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কামাল বললেন, ‘আপনারা কেউই আমার রক্তের সম্বন্ধ নন, তারপরও আজ যা করছেন, এই ঋণ আমি অর্থ দিয়াও কোনোদিন শোধ করতে পারমু না। আপনারা আমাকে আর আমার মা-বাবাকে ক্ষমা কইরে দেন। আল্লাহু আমিন!’ ইমাম সাহেব বললেন, ‘মসজিদের দরজায় আমাদের মোয়াজ্জিম হুজুর রুমাল নিয়ে খাঁড়াইবেন। আপনারা যে যা পারেন কামালের জন্য দান-সদগা রাইখে যান।’
জানাজা শেষে যে যার মতো করে দান-সদগা দিয়ে গেলেন। মোয়াজ্জিম সাহেব গুনে দেখলেন তাতে মোট ছয় হাজার পাঁচশ পঞ্চান্ন টাকা উঠেছে। তার সাথে যোগ হলো নরেনের টাকা। আর দাফনের সব খরচ বহন করেছেন খোকন আলী। কামাল মসজিদের দরজায় সিঁড়িতে বসে গুমরে গুমরে কাঁদছেন। ইমাম সাহেব কামালের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘বাবা আসেন, দুইটা দানাপানি মুখে না দিলে বাঁচবেন কী করে!’ ইমাম সাহেব হাত ধরে টেনে তুললেন। পাশে বসিয়ে খাওয়ালেন। কোনো রকমে দু’মুঠো খেয়ে হাত ধুতে গিয়ে কামালের চোখ গিয়ে পড়ল মা-বাবার কবরের উপর। আবার বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আবার ভিজে গেল চোখ। কুয়াশাচ্ছন্ন চোখে ভবিষ্যতের পথ ধুসর হয়ে উঠলো কামালের কাছে। ইমাম সাহেব কামালের কাছে আসলেন। কামালের হাত ধরে টাকা গুজে দিয়ে বললেন, ‘জীবন এমনি নিঠুর।
মৃত্যুকে মাইনে লয় বইলে জগৎ এখনো টিকে আছে। খোদার উপর ভরসা রাখেন, বাবা!’ কি বলবেন বুঝতে পারেন না কামাল। ভাবছেন, আর কত সময় থাকবেন এখানে! আনত স্বরে বললেন, ‘আপনি আমার পিতৃতুল্য। আপনার ঋণ শোধানোর শক্তি নাই আমার। আমার সবকিছু শেষ! মা-বাবাকে ফালাই রাইখে আমারেও এখান থেইকে যাইতে হবে! আহা রে জীবন!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন কামাল।
তারপর আবার মা-বাবার কবরের কাছে গেলেন। মাটি ছুঁয়ে কামাল বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহালাল কবর।’ আস্তে আস্তে কামাল হাঁটা ধরলেন নিজের বাড়ির দিকে। আর বারবার পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখছেন মা-বাবার কবর। যেন নৈঃশব্দ্য ও শূন্যতার মাঝখানে হেঁটে যাচ্ছে সে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। আর বারবার ভাবছেন আহা কত যে স্তব্ধ কবরের মাটি!