শিল্প ও সাহিত্য

ফরিদ কবিরের ‘ট্রেন’ 

আশির দশকের কবি ফরিদ কবিরকে প্রথম জেনেছিলাম ‘ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল’-এর মাধ্যমে। কখনও দেখা-সাক্ষাৎ বা ব্যক্তিগত পরিচয় হয়নি। তবে এই নামটি এখনও গেঁথে আছে মনের ভেতর। মুখোমুখি দেখা না হলেও কবিতায় তাকে দেখেছি ঘনিষ্ঠ চোখে। তার কিছু কবিতা বারবার পাঠ করেছি। কিন্তু তার সৃজনকর্ম নিয়ে কোথাও কোনও উল্লেখযোগ্য আলোচনা আজও আমার চোখে পড়েনি।

কেন? কারণ, তিনি বাজারি পণ্যের মতো নিজেকে বিকোননি। আরেকটি কারণ, কবিতা ও সাহিত্যের অন্য প্রকরণগুলির সমালোচনা এখানে নৈর্ব্যক্তিক নয়, সেভাবে গড়ে ওঠেনি। পাঠক অপ্রতুলতার সঙ্গে আছে কবিকর্তৃক অন্য কবির কবিতা নিয়ে নির্মোহ নিষ্ঠ আলোচনার অভাব; তদসঙ্গে আমাদের স্বভাবজাত উন্নাসিকতা। তবে এর মধ্যেও কিছু পাঠক আছেন আন্তরিক; যাদের পাঠনিবেশ এবং জিজ্ঞাসা আছে― কেবল তাদের জন্যই আমার এ লেখা।

কবি ফরিদ কবিরের জন্ম ঢাকায়, ১৯৫৯ সালের ২২ জানুয়ারি। পুরোনো ঢাকার জিন্দাবাহারে বেড়ে ওঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক। মুদ্রণব্যবসা দিয়ে জীবিকা শুরুর চেষ্টা। ব্যর্থ হয়ে অতঃপর ব্যাংকের চাকরি। সেটাও ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতায় প্রবেশ। সংবাদপত্র ছেড়ে বারডেমের জনসংযোগ কর্মকর্তা। অতঃপর এই প্রতিষ্ঠানেরই অধীনে ডায়াবেটিক সমিতির পরিচালক। 

সাকুল্যে পাঁচটি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ। আশির দশকের মাঝামাঝি ‘হৃদপিণ্ডে রক্তপাত’ দিয়ে শুরু। এরপর ‘ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল’, ‘অনন্ত দরোজাগুচ্ছ’, ‘মন্ত্র’ এবং ‘ওম প্রকৃতি ওম প্রেম’। ধ্যানস্থ ঋষির মতো জীবনের মাঝখানে বসে চৌদিকে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব তপোবন। তার উচ্চারিত শব্দ কথা বলে না। নিমজ্জিত করে ধ্বনির নৈঃশব্দে। এবং সেই নৈঃশব্দের ভেতর ধৃত অলক্ষিতপ্রায় এক দৃশ্যের গোপন কম্পনে। যেন বলার আকুতি নয়। ধমনীর অন্তর্গত স্রোত বেয়ে আপনা থেকে নেমে আসা এক একটি বোধের অগর্বিত স্বতঃমুদ্রা; রৌদ্র-বায়ু-জলের ছোঁয়ায় যারা ধীরে পাতা মেলে, জানান দেয় ধ্বনির চিৎকারের সীমা ছাড়িয়ে শান্ত জীবনের আরেক কথাতীত কথকতা, সৌষম্য সুরের নিরুচ্চার মাধুরি। 

মদ্যমাংসের হল্লা টেবিল থেকে নয়, তিনি ফিরে আসেন একাকী ভ্রমণের কোনও অলৌকিক ছবি হাতে, মিলন-কি-বিচ্ছেদের সুদূর ওপার থেকে অঘোষিত এক সম্রাটের মতো। অক্ষরের আপন নীরবতায় ছড়িয়ে দেন তার নৈকট্যঘন প্রবল প্রভাবের দ্যুতি। গন্তব্যহীন জীবনের উদ্দেশ্য কিংবা উদ্দেশ্যহীনতায় সেই ছবি ঝুলে রয় শূন্যের পটে, দোল খায়, আর থেকে থেকে কেবলি বদলায় দৃশ্যমুখ। এই হরিৎ বিভ্রম ক্রমিক আবর্তনে পাঠককেও এক আবর্তনশীল অক্ষে ও কক্ষপথে টেনে নিতে থাকে। 

তার ‘ট্রেন’ শীর্ষক ছোট্টঘন কবিতায় আছে জীবনের এই আলকেমি; নির্লিপ্তপ্রায় তবু কী এক ইশারায় টেনে নেওয়া এই চলমান জীবন―   ‘ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল মাঝপথে, অচেনা স্টেশনে মানুষ যেখানে যেতে চায় সেটাই কি গন্তব্য? নাকি, তারা যেখানে নামে? নাকি, গন্তব্যই খুঁজে নেয় তার নিজস্ব মানুষ! বিহ্বল স্টেশনে নেমে আমরাও ভাবি— এখানেই কি নামতে চেয়েছি নাকি, ট্রেনই নামিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের … এই ঘন কুয়াশারাত্রিতে! যেখানে নেমেছি, কিংবা যেখানে যাওয়ার কথা ছিল কিছুই আসলে সত্য নয় আমাদের চোখের সামনে শুধু ছবি হয়ে থাকে … ট্রেনের জানালা আর, খুব দ্রুত ছুটে চলা যমুনা ব্রিজ...’

আমাদের সবাকার চোখ নিবদ্ধ এক ধাবমান জানালায়। শুধু চেয়ে দেখি দৃশ্যের বদলে যাওয়া। হয়তো কোনও গন্তব্যমুখী; তবু জীবনশকটে চড়ে আমরা কখনও নেমে পড়ি ভুল জায়গায়। অথবা অভীষ্ট গন্তব্যে নেমে ভাবি, এইখানে অবতরণ এক নিরেট বিভ্রম।  কেবল পশ্চাতে ছুটে-চলা, অগ্রসরমান ছবিগুলিই আমাদের দোলাচলের ভেতর আমূল গেঁথে থাকে; হাহাকারে, পালাক্রমে পলায়নপর হর্ষ ও বিষাদ বৈপরীত্যের চিরকালীন গল্প হয়ে।  

কিন্তু এ তো কবিতার কালাতীত সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা, যা স্থানিক পরিপার্শ্ব বা আবহের প্রেক্ষিতটিকে প্রায় ভুলিয়ে দেয়। এমন সুন্দরের সত্য ও বস্তুমূল্য কতোটুকু? কবিতার কাছে তাৎক্ষণিকেরও একটা দাবি থাকতে পারে। এই দাবি কতোটা পূরণ হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে জনগণের আশাভগ্ন এবং কেবলই ঘন ঘন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতবদলে কবিতার ভরকেন্দ্র সৃজন করেছে। যেমন বর্তমান সময়ে এসেও আমরা একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। বিশ্বপরিস্থিতিও আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের জীবনের কাঙ্ক্ষিত গতি বদলে দিচ্ছে। আমাদের চাওয়া আর যাপনের মধ্যে তৈরি হয়েছে দুস্তর ব্যবধান। বস্তু ও ভাবের এমন জুৎসই যুগলমিলনে এভাবেই ‘ট্রেন’ কবিতাটি হয়ে উঠেছে একইসঙ্গে কালানুগ ও কালাতিক্রান্ত। কবি উপস্থিত সত্যকে ধরেছেন, আবার তাকে ছাড়িয়েও গেছেন।

নিঃসন্দেহে এটি একটি উত্তম কবিতার বৈশিষ্ট্য। প্রয়োগবাদীরা সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন একে ‘নৈরাশ্যবাদী’ লেখা বলে (একে অ্যাবসার্ড ঘরানার লেখা বলেও দাবি করা যেতে পারে)। কিন্তু একটি ভালো কবিতায়, প্রকাশবিভঙ্গগুণে আপাত বিবেচনায় যা নৈরাশ্য, তা চেতনা বিকাশেরও সহায়ক শক্তি। 

জীবনের মর্মমূলে যে দ্বৈরথ, তার টানাপোড়েনে তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক বিস্ময় সংহতি। কেন্দ্রাভিগ ও কেন্দ্রাতিগ বলের এক আশ্চর্য ভারসমতা। ছিটকে যাবার বদলে তিনি ওই কেন্দ্রের চারপাশেই ঘোরেন আর পাঠকদেরও করে নেন তার লব্ধ অভিজ্ঞতার অংশভাগী। জীবনকাব্যসত্যের এই দ্বন্দ্ব-দ্বৈরথ কেবল কবি ফরিদ কবিরের কবিতাতেই এক অতুল মোহন ঐশ্বর্যে ফলবতী হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস হারাতে হারাতে তিনি আরেক বিশ্বাসের কাছে, বিষ থেকে আরেক মোহিনী বিষের কাছে আশ্রয় খুঁজে ফেরেন। জীবনকে ঘৃণা করতে করতে জীবনের কুহকের কাছেই সঁপে দেন নিজেকে। তার ‘সাপ’ কবিতাটি এই যাপনোপলব্ধ সত্যেরই শৈল্পিক প্রকাশ। 

তার কবিতার মৌলিকত্ব প্রসঙ্গে একজন সমালোচকের উক্তি এরকম: “কবিতায় নানা ধরনের নিরীক্ষার প্রচলন যখন আমাদের ভূখণ্ডে এসে রীতিমতো ক্রেজ শুরু করেছিল, ঠিক সে সময়ের কুশীলব তিনি। সেই স্রোতেই প্রথমে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। তারপর ঠিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেছেন। 

প্রশ্ন উঠতে পারে, কোন ভঙ্গি বা উপাদানের জন্য তিনি অনন্য হলেন? তিনি অনন্য হলেন, কবিতার ভাবকেন্দ্র থেকে এর প্রাণভোমরাকে বিতাড়িত না করার মাধ্যমে। আমরা দেখেছি, কবিতাকে মাল্টিডাইমেনশনাল করতে গিয়ে কেন্দ্র থেকেই উড়ে চলে গেছে এর প্রাণভোমরা। শুধু কবিতার অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কতিপয় শব্দ। এ ধরনের নিরীক্ষার প্রধান ঝুঁকি হলো কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। ফরিদ কবির তার কবিতার ভাবকে নানা বিচ্ছুরণে ছড়িয়ে দিয়েছেন ঠিক কিন্তু রচনা করে দিয়েছেন এমন এক সূক্ষ্ণ সেতু, যে-সেতু এর ভারকেন্দ্রের সঙ্গে নিয়ত যোগাযোগ রেখে চলে। ফলে পাঠক ছিটকে পড়ে না কবিতার অন্তঃসুষমা থেকে।’’ 

কবি ফরিদ কবির যেন শব্দ নয়, বরং ওই শব্দানুষঙ্গের ভেতর থেকে এক মিহি কোমল করস্পর্শে তুলে আনেন তার অন্তঃলীন সুর, বাতাসে ছড়িয়ে দেন তার অপরূপ মোহ ও মায়া। আর পাঠকের হৃদয়ের কান স্বতঃস্ফূর্ত শ্রবণে ধরে নেয় তার বিভোল তরঙ্গ, আকণ্ঠ পান করে তার শারাবান তাহুরা। এক অরূপ জগতে ডুবে যায় মন অথবা ভেসে ওঠে কোন অমর্ত্যলোকের অলকানন্দাপারে। তার ‘ঘ্রাণ’ কবিতায় পাই সুন্দরের নিগূঢ় অবলোকন, যে সুন্দর বাইরের মেক-আপ নয়, আত্মার অম্লান বিভূতির দ্যোতক: 

‘ঘ্রাণেই সম্পূর্ণ স্নান, তবু খোঁজো তুমি জল-সাবানের ফেনা কী আছে রোমাঞ্চ স্নানঘরে চামড়ার নিচে যদি রয়ে যায় অন্ধকার আর, কালো ময়লার স্তূপ সহস্র বুদবুদ থেকে ফিরে কিভাবে নিজেকে ভাবো তুমি শতভাগ পরিষ্কার যে-কারণে বলি, ফুলই প্রকৃত সমুদ্র কেননা, তাকেই আমি ঘ্রাণসহ বর্ণিল রেখেছি কাঁটার সংঘাতে যদি ঝরে কিছু রক্তের গরম তুমি কাটো সাঁতার গোলাপে আর, পাপড়ির বর্ণে করো জন্মোৎসব কেবল ঘ্রাণের জন্যই আমি  এতকাল পুষ্পপূজা নিষিদ্ধ করি নি।’

প্রায় একইরকম অনুভব ধরা আছে ‘আয়না’ কবিতায়:  

‘আমি দেখি? নাকি আয়নাই আমাকে দেখায়? নিজেকেই দেখছি হয়তো যদিও সামনে যাকে দেখি— দেখতে আমারই মতো কিন্তু আমি নই কেননা, আমি তো মৃত বিধ্বস্ত আমার মুখ, ভয় দুই চোখের পাতায় আয়না রহস্যময়, ভার্চুয়াল আরেক দুনিয়া সেখানে আমার বিম্ব বরাবর ঝকঝকে, জীবন্ত বরং কিছুটা স্মার্ট যেমন আজ সে বাইরে এসেই আমাকে পাঠিয়ে দিল আয়নার ভেতরে আয়নার ওপাশে ভয়ানক অন্ধকার অথচ এপাশ থেকে সব সময় উজ্জ্বল দেখায়!’

ফরিদ কবির পেখমবিস্তারী হয়েও ভূমিলগ্ন। বৃক্ষের মতো ডালপালা মেলে দেন আকাশে, বায়ুতে কেঁপে কেঁপে নৃত্য করে সে-বৃক্ষের পাতার সবুজ, আলোকাভিসারী বলেই ক্লোরোফিলের রহস্যে ভরা তার অগ্নিরন্ধন, শেকড় তাই মাটিতেই পোঁতা যে-কারণে সব উড়ালডানার বিশ্বাস পাতা থাকে সেই বৃক্ষের কোলে। আকাশ আর মাটির যুগলসঙ্গমে তার কাব্যসৃজন হয়ে উঠেছে লোক আর অলোকের অমেয় সখ্যস্মারক।  

প্রচুর ‘কবিতা’ লিখেও ব্যর্থ কবির অভিধা পাওয়া যায়। কবি ফরিদ কবিরের সৃষ্টিকর্মের আয়তন খুব বিশাল নয়। তবে জীবনবোধ ও শিল্পদৃষ্টির গভীরতায়, ঘনত্বে তা দামি। তার সৃষ্টির সাথে পাঠকের পরিচয় অবিমিশ্র এক আনন্দ অভিজ্ঞতা। তার কবিতায় যেমন বেকেটীয় অ্যাবসার্ডিটির ছোঁয়া আছে। তেমনি আছে পরাবাস্তব নিমগ্নতা। সম্ভবত কোনও আধুনিক কবিই জীবনসত্যের এই নিগূঢ় অভিজ্ঞতার বাইরে নন। ‘বাড়ি’ কবিতা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার কবিতার ভাষাবিভঙ্গ বদল ও বৈচিত্রে চিহ্নিত। তবে দর্শনে স্থিতধী। জীবনের উন্মত্ততাকে একটা কাব্যিক দূরত্বের প্রতিভূমে স্থাপন করে দেখিয়েছেন। এই দূরত্ব এক সন্ন্যাস, কবিতার জন্য হিতকর; কবিমনে তাৎক্ষণিকের প্রবল বিক্ষেপ কবিতানুভূতিকে হত্যা করে। একে তুলে আনতে হয় একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের অবস্থান থেকে। ফরিদ কবির সে কাজটিই করেছেন। তাতে তার লেখার গ্রহণযোগ্যতা আরো বেড়েছে। ভাষার মোহন চালাকি কিংবা পাণ্ডিত্য তিনি করেননি। সারল্য তার বড়ই আগ্রাসী। অনেকটা আত্মঔদাসীন্যে ভরা। আর নিজের প্রতি উদাসীন বলেই আমাদের তা এতো নিবিড় করে টানে। 

তার কবিতা সেই সুন্দরের প্রতিভূ যা কোনও আয়নায় মুখ দেখে না― নিরাভরণা, নগ্নিকা এবং তার কাছেই নিজেকে সহজে সানন্দে সমর্পণ করে যে তাকে ভালবাসে, সুরক্ষা দেয়। এই সুন্দরের সাথে স্বভাবধ্যানী সন্ত কবির সঙ্গম এক অমলিন আনন্দধারার মোহনায় এসে মিলেছে।