শিল্প ও সাহিত্য

ঈদ-আনন্দোৎসব

ধর্মের একটা দিক চিরন্তন এবং যার পরিবর্তন হয় না। এই যে আমি পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে বিশ্বভুবনের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছি তার বাইরে যে সত্তার কল্পনা আমি অনুভব করতে চাই, তিনি আদিঅন্তহীন, অপরিবর্তনীয়। যে মানুষ সাধনার ক্ষেত্রে যতখানি অগ্রসর হয় সে সেই অনুপাতে তাঁর নিকটবর্তী হয়, তাঁর অনুভূতি নিবিড়তর হয়। আমাদের হজরত বলতেন তিনি সেই চরম সত্তাকে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেন তাঁর স্কন্ধের শিরার (স্পন্দনের) মতো। বলা বাহুল্য আমরা মনন দ্বারা যে পরমসত্তাকে অনুভব করি তিনি চিন্ময়। শিরার স্পদন-জনিত অনুভূতি সম্পূর্ণ মৃন্ময়। চিন্তার মারফত আমরা কল্পলোকে যে অনুভূতি পাই, স্পর্শলব্ধ দৃঢ় মৃত্তিকাজাত শিরার অনুভূতি তার তুলনায় অনেক বেশি নিবিড়, অনেক বেশি দৃঢ়। তাই হজরত সেই পরম সত্তাকে শারীরিক অভিজ্ঞতার ভ্রান্তিহীন সত্যের মতো প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতেন। 

পক্ষান্তরে ধর্মানুভূতির জগৎ থেকে বেরিয়ে ধর্মাচারণের কর্মভূমিতে আমরা যখন নামি, তখন সে আচরণের অনেকখানি দেশকালপাত্রের ওপর নির্ভর করে। অবশ্য অন্বেষণ বিশ্লেষণ করলে অবশেষে দেখা যাবে আমাদের প্রত্যেকটি ধর্ম-আচরণও সেই অপরিবর্তনীয় চিরন্তন সত্তাশ্রিত। কর্মজগতে তাই প্রথমতো পাত্রের ওপর নির্ভর করে ধর্মাচারণ- আমল। আমি পক্ষাঘাতে চলৎশক্তিহীন, অথর্ব। মক্কা শরিফ দর্শনের তরে আমার চিত্ত যতই ব্যাকুল হোক না কেন, আমার যত অর্থ সম্পদই থাকুক না কেন, কোনো ধর্মজ্ঞজন কোনো ফকিহ আমার হজ-যাত্রার অপরাগতাকে নিন্দনীয় বলে মনে করবেন না। আমি এ অবস্থায় যে কোনো হাজিকে, আমার হয়ে, পুনরায় হজ করার জন্য মক্কা শরিফে পাঠাতে পারি; অবশ্য তার সমস্ত খর্চাপত্র আমাকেই দিতে হবে। এর থেকে কিন্তু এহেন মীমাংসা করা সম্পূর্ণ ভুল হবে যে, আমার ওপর যেসব ধর্মাচারণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে তার সবকটাই আমি অন্যলোককে দিয়ে করাতে পারি।

‘পাত্রের’ মতো ‘কালও’ ধর্মাচারণের সময় হিসাবে নিতে হয়। পূর্বাকাশ ঈষৎ আলোকিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে সলাৎজিক্‌র ধ্যানধারণার পক্ষে সর্বোত্তম সময় ইহলোকে সব ধর্মই একথা স্বীকার করেছেন। এ স্থলে বলা প্রয়োজন মনে করি যে, একশ বছর আগেও সাধারণ ধার্মিকজন আপন ধর্মবিশ্বাস (ঈমান) ও ধর্ম-আচরণ ক্রিয়াকর্ম (আমল) নিয়ে সন্তুষ্ট থাকত, প্রতিবেশীর ধর্ম সম্বন্ধে তার কোনো কৌতূহল ছিল না। থাকলেও সে কৌতূহল নিবৃত্তি করা আদৌ সহজ ছিল না। কারণ অধিকাংশ স্বধর্মে বিশ্বাসীজনই পরধর্মাবলম্বীর সংস্রব এড়িয়ে চলত, তথা তাকে আপন ধর্মকাহিনি শোনাতে কোনো উৎসাহ বোধ করত না। উপরন্তু হিন্দু, জৈন এবং পারসিরা বহু শত বৎসর পরধর্মাবলম্বীকে আপন ধর্মে দীক্ষিত করার দ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছেন। এবং আশ্চর্য বোধ হয়, আমাদের আলিমফাজিলগণ প্রতিবেশী হিন্দুকে শুদ্ধমাত্র ‘কাফিরা, হানুদ, মলাঊন’ ইত্যাদি কটুবাক্য দ্বারা বিভূষিত করেই পরম তৃপ্তি অনুভব করেন; অথচ তাঁরা সকলেই আমার মতো না-দানের চেয়ে ঢের ঢের বেশি দানিশমন্দ- তাঁরা বিলক্ষণ অবগত আছেন, তাঁদের পক্ষে আপন ধর্ম প্রচার করা অবশ্য কর্তব্য। এবং তাঁরা কেন, অতিশয় আহাম্মখও জানে, বিধর্মীর ধর্ম তুলে কটুবাক্য বললে, তাকে ইসলামের প্রতি তো আকৃষ্ট করা যায়ই না, উপরন্তু আরেকটি প্রতিবেশীকে রুষ্ট করা হয় মাত্র।...

‘কাল’ ও ‘পাত্রের’ কথা হল। ‘দেশের’ ওপর ধর্মাচরণ নির্ভর করে আরো বেশি। যে-দেশে ছমাস ধরে সূর্যাস্ত হয় না, সেখানকার মুসলিমের এবং বাংলাদেশের রোজা রাখার কায়দা-কানুন যে হুবহু একই রকমের হতে পারে না সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।

ঈদের পরব, এবং অন্যান্য তাবৎ পরবই এই ‘দেশ’ অর্থাৎ স্থানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে। এবং এই সুবাদে আবার পাঠকের স্মরণে এনে দিই, বহুবিধ কারণে আমরা প্রতিবেশীর ধর্ম সম্বন্ধে এখন আর সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারিনে। মহরমের আর জগদ্ধাত্রী পুজোর মিছিল যদি একই দিনে পড়ে তবে তার হিসাব যে নগরপাল আগের থেকেই নেয় না, তাকে আমরা বিচক্ষণ আই জি বলে মনে করব না। তদুপরি খ্রিস্টান মিশনারিরা দু’শবছর ধরে পাক নবীর বিরুদ্ধে এত কুৎসা রটিয়েছে যে তেনাদের ধর্ম- বিংশ শতাব্দীর প্রচলিত খ্রিস্টধর্ম, যে ধর্ম একদিকে শেখায় ‘কেউ ডান গালে চড় মারলে বাঁ গাল এগিয়ে দেবে,’ অন্যদিকে বিশ-পঁচিশ বৎসর পরপর আপোসে কেরেস্তানে কেরেস্তানে লাগায় প্রলয়ঙ্কর যুদ্ধ, টাকার লোভ দেখিয়ে দুই দলই টেনে আনে বিধর্মীদের, সরল নিগ্রোদের, এবং সর্বশেষে শ্মশানযজ্ঞ চালায় হিরোশিমার নিরীহ নারীশিশুদের ওপর। এবং সঙ্গে সঙ্গে নতমস্তকে স্বীকার না করে উপায় নেই, ইয়েহিয়া এদেশে যে তাণ্ডবনৃত্য জুড়েছিলেন সেটাও ধর্মের নামে ইসলামের দোহাই দিয়ে সেটাও ‘জিহাদ’! কিন্তু এই আনন্দের, ঈদের মৌসুমে হানাহানির কাহিনি সর্বৈব বর্জনীয়। আমি শুধু তুলনার জন্য কথাটা পেড়েছি, মুসলমানদের আনন্দোৎসব তার সত্য পরিপ্রেক্ষিতে দেখবার জন্য।

ঈদ অর্থাৎ আনন্দ, আনন্দ-দিবস, পরবের দিন। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উদ্‌-দোহাতে কিন্তু ঈদ সীমাবদ্ধ নয়। ঈমানদার ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দোৎসব করার বিশেষ একটা কারণ আছে। এক মাস ধরে সুখে-দুঃখে, মানসিক অশান্তির ভিতর দিয়েও উপবাস করাটা সহজ কাজ নয়- কঠিন শারীরিক পীড়া ইত্যাদির ব্যত্যয় অবশ্য আছে। তাই যে মুসল্লি পূর্ণ ঊনত্রিশ বা ত্রিশ দিন শরিয়তের আদেশমতো উপবাস করতে সক্ষম হয়েছে, তার আনন্দই সর্বাধিক হয়। তার অর্থ এই নয়, যে-ব্যক্তি পূর্ণ মাস রোজা রাখতে পারেনি, সে ঈদ আন্দোৎসবে যোগ দেবে না। অবশ্যই দেবে। যে লোক বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে যোগ দিতে পারেনি- যে কোনো কারণেই হোক- তাকে স্বাধীনতা-দিবসের ঈদ-আনন্দোৎসব থেকে বঞ্চিত করার হক স্বাধীনতা-সংগ্রামে যাঁরা লিপ্ত হয়েছিলেন তাঁদের পুরুষোত্তমেরও নেই। অতিশয় অভাজন জনও যদি আনন্দোৎসবে যোগ দিতে আসে তাকে বিমুখ করা, তার সঙ্গে তর্কাতর্কি করা ঈদের অঙ্গহানি করে। কারণ আনন্দের দিনে যে কোনো প্রকারের অপ্রিয় কর্ম করা নিরানন্দের লক্ষণ, অতএব সর্বথা বর্জনীয়।

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদ-উল-ফিতরের নামাজ আদায়ের দৃশ্য 

ঈদ বা আনন্দ সম্বন্ধে সুন্নি ও শিয়া এবং শিয়াদের নানা শাখা-প্রশাখা সকলেই প্রাগুক্ত ধারণা পোষণ করেন। বাংলাদেশে একদা প্রচুর খোজা ও বোরা ছিলেন। এঁদের দু’দলই ইসমাইলি শিয়া, পক্ষান্তরে মুর্শিদাবাদ ও সিলেটের পৃথ্বীম-পাশার শিয়ারা ইসনাআশারি শিয়া নামে পরিচিত। ঈদ সম্বন্ধে সকলেরই ধারণা মোটামুটি এক হলেও ঈদ পরব পালনের কর্ম-পদ্ধতি শিয়াদের ভিতর অতি বিভিন্ন।

সুন্নি হানিফিরা বিশুদ্ধ শরিয়তের দৃষ্টিবিন্দু থেকে ঈদ সম্বন্ধে সর্বোৎকৃষ্ট পথনির্দেশ পাবেন ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর শিষ্যগণ, ইমাম আবু ইউসুফ ইত্যাদির সাহচর্যে সংকলিত প্রামাণিক ফিকাহ গ্রন্থে। ঈদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গভীর আলোচনা পাবেন প্রখ্যাত দার্শনিক, ফকিহ ও সুফিহ ইমাম গজ্জালির অজরামর ‘কিমিয়া সা’দৎ’ গ্রন্থে। মরহুম ইউসুফ খানের অনুবাদ অনিন্দ্যসুন্দর। কলকাতায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

তুলনাত্মক আলোচনা করলে দেখা যায়, ঈদ বা আনন্দ মাত্রেরই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ‘দেশ’ বা ভৌগোলিক অবস্থান তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ইসলামের উদয়কালে খাস আরবদেশ সমৃদ্ধিশালী ছিল না। পক্ষান্তরে ভারত বহু বহু শতাব্দী ধরে ছিল ধন-ধান্যের বিত্তবান দেশ। জনসাধারণের অবকাশও ছিল যথেষ্ট। তাই এই বঙ্গভূমিতে, বর্তমান দারিদ্র্যের দুরবস্থাতেও কি হিন্দু কি মুসলমান সকলেই বারো মাসে তের পার্বণের কথা জানে। ওইসব পার্বণে একদা দানই ছিল প্রধান অঙ্গ- অন্নবস্ত্র, ছত্র, পাদুকা, প্রকৃতপক্ষে কুটির-শিল্পে হেন বস্তু ছিল না যেটা বিত্তবান কিনে নিয়ে দান করত না। কিন্তু দান বাধ্যতামূলক ছিল না।

পক্ষান্তরে গরিব আরবদেশে নিত্য নিত্য নানামুখী দান কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব ছিল; ধর্ম কখনো মানুষকে এ ধরনের কর্ম করতে বাধ্য করে না। তদুপরি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ইসলামের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই সে ধর্ম যে একদিন আরবভূমির বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে তার সম্ভাবনাও ছিল। সেসব দেশ আরবভূমির চেয়ে বেশি ধনী বা বেশি গরিবও হতে পারে। অতএব যতদূর সম্ভব অল্পসংখ্যক ‘ঈদ’ বা আনন্দের দিন বিধিবদ্ধ করে দেওয়া হয়। দান কিন্তু ইসলামের বিধিবদ্ধ আইন, তার অতি শৈশব অবস্থা থেকেই। ঈদ-উল-ফিতরে দান অলঙ্ঘ্য ধর্মাঙ্গ। বস্তুত ইসলামই ইনকাম ট্যাক্স- জাকাত- ধর্মের অঙ্গরূপে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম বাধ্যতামূলক করে।

সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিবিন্দু থেকে দেখি, আনন্দোৎসব (ঈদ) বা বাধ্যতামূলক ধর্মাচার (নামাজ রোজা ইত্যাদি) একসঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ ওক্ত নামাজ বাড়িতে পড়তে পার কিংবা মসজিদে। জুম্মার নামাজ কিন্তু অবশ্যই মসজিদে পড়তে হবে। কারণ ধর্মসাধনা ভিন্ন এর অন্য উদ্দেশ্য ছিল; প্রত্যেক মুসলিম যেন সপ্তাহে অন্তত একদিন মসজিদে প্রতিবেশী সহধর্মীর সঙ্গে মিলিত হয়ে একাত্ম-বোধ-জাত শক্তি অনুভব করতে পারে। এরপরই আসে বৎসরে দুবার করে ঈদের নামাজ। ঈমানদার মুসলিম মাত্রই চেষ্টা করে, বৃহত্তম মুসলিম জনসংঘের সঙ্গে বৃহত্তম জমাত-এ সে যেন নামাজ পড়তে পারে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য যত দূর-দূরান্ত থেকে যত সব নামাজার্থী ঈদগাহতে জমায়েত হয় তাদের সংখ্যা, তাদের ধর্মানুরাগ দেখে তাদের প্রত্যেকেই যেন আত্মবল, সংহতি-শক্তি অনুভব করতে পারে। ওইদিন পরিচিত জনের মাধ্যমে বিস্তর অপরিচিতের সঙ্গে তার পরিচয় হয় ভ্রাতৃভাবে আলিঙ্গন দ্বারা। এই দূর-দূরান্ত থেকে, বৃহত্তম জমাত যে ঈদগাহে হবে, সেখানে নামাজ পড়ার পুণ্য ইচ্ছা নিয়ে ধাবমান যাত্রীদলকে আমি একাধিকবার বহুদূর অবধি তাকিয়ে দেখে দেশের জনসাধারণের প্রতি প্রীতি ও শ্রদ্ধা অনুভব করেছি, বিস্ময় বোধ করেছি।

বাড়িটি ছিল একেবারে বিরাট পদ্মার পাড়ে, রাজশাহীতে। ওপারে, বহুদূরে দেখা যেত শ্যামল একটি রেখা- ভারত সীমান্ত। বারান্দায় দাঁড়িয়েছি অতি ভোরে। অন্ধকার মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে দেখি, কত না দূর-দূরান্ত থেকে, হেথা-হোথা ছড়ানো চরভূমি থেকে, শুনলুম পদ্মার ও-পার ভারত থেকে, কত না নামাজার্থী শীতের শুকনো বালুচরের উপর দিয়ে হেঁটে আসছে রাজশাহী শহরের দিকে। শহরের প্রায় পূর্বতম প্রান্তের বাড়িটি থেকে দেখি, যেখানে সূর্য অস্ত যায় সেই দূরে অতি পশ্চিম প্রান্ত অবধি যেন পিপীলিকার সারির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানবসন্তান শহরের দিকে এগিয়ে আসছে- নিরবচ্ছিন্ন ধারায়। পূর্বপ্রান্তে, যারা প্রাচীন দিনের জাহাজের খেয়াঘাট, পাশের ফুটকি পাড়ার দিকে এগিয়ে আসছে তাদের নতুন পাজামা-কুর্তা, বাচ্চাদের রঙিন বেশভূষা, হাসিমুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সবাই অক্লান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে সদর রাজশাহীর ঈদগাহের দিকে।

এদের কেউই হয়তো জানে না, ঈদের নামাজের সামাজিক মেলামেশার তাৎপর্য। গ্রামের জুম্মাঘর বা শহরের জামি’ মসজিদ ত্যাগ করে করে বৃহত্তম ঈদগাহে এসে বহুগুণে বিস্তৃত অঞ্চলের ঐক্যবদ্ধাবস্থায় বেশুমার নামাজরত মুসলিমের সঙ্গে শব্দার্থে তথা ভাবার্থে কাঁধ মিলিয়ে তখন পদ্মাচরের সরল মুসলিম ঈদের নামাজ পাঠ শেষ করে তখন সে কি সচেতন যে, বর্ষার উত্তাল তরঙ্গসঙ্কুল পদ্মা তার চরকে তার বউবাচ্চাকে বাদ-বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেও ঈদগার মুসল্লিদের কাছ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। দীন ইসলামের চিরন্তন চিন্ময় বন্ধনে প্রলয়ঙ্করী পদ্মার তাণ্ডব নর্তন কস্মিনকালেও ছিন্ন করতে পারবে না- অনুভব করে তার অবচেতন মন।

কার্যত আমরা রোজার ঈদেই আনন্দোল্লাস করি বেশি। কিন্তু সর্ব দৃষ্টিবিন্দু থেকেই ঈদ-উল-আজহা বহুগুণে গুরুত্বব্যঞ্জক। ১. আপন আবাসে পড়া পাঁচ ওক্ত নামাজের ক্ষুদ্রতম গণ্ডি, ২. সেটা ছাড়িয়ে জুম্মার নামাজের বৃহত্তর পরিবেশ, ৩. সে পরিবেশ ছাড়িয়ে ঈদগার বৃহত্তম পরিবেশ- সাধারণ মুসলিমের জন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু আল্লা যাকে তওফিক দিয়েছে, ৪. সে যেন জীবনে অন্তত একবার মক্কা শরিফে গিয়ে বিশ্ব মুসলিমের সঙ্গে একত্র হয়। বিশ্ব মুসলিমের সত্তা-সংহতি-ব্যাপ্তি সে যেন দেখে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তার ক্ষুদ্র সত্তা যেন বৃহত্তম মুসলিম সত্তার সঙ্গে সম্মিলিত হয়।

সে কাহিনি দীর্ঘ, সর্ব বিশ্বে তার গুরুত্ব ছেয়ে আছে। তার জন্য আগামীতে অন্য ঈদ।

বি.দ্র.: ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সংস্করণ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘অপ্রকাশিত রচনা’ গ্রন্থ থেকে লেখাটি পুনরায় প্রকাশ করা হলো।