শিল্প ও সাহিত্য

ইন্দ্রের সভা থেকে পূর্ববঙ্গে

দেবরাজ ইন্দ্রের সভা। একটু আগে গীতবাদ্য শেষ হয়েছে। প্রশান্ত মনে সভাসদ নিয়ে বসে আছেন মহান অধীশ্বর। ঠিক তক্ষুণি মুখ কাচুমাচু করে সামনে দাঁড়ালেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ইন্দ্র বললেন, ‘কী চাও হে সাহিত্যসম্রাট?’ বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘স্বর্গবাস তো অনেক হলো। এবার একটু মর্ত্যবাসে যেতে চাই, প্রভু।’ ‘মর্ত্যে কেন হে?’ ‘আজ্ঞে, প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।’ ‘কীসের প্রায়শ্চিত্ত?’ ‘প্রভু, এবার একটু পূর্ববঙ্গের দিকে যেতে চাই।’  ‘কেন? কেন?’ ‘প্রভু, পূর্ববঙ্গের দিকে আমার দৃষ্টি পড়েনি। একটা দিনের জন্য একটু ঘুরে দেখতে চাই।’

বঙ্কিমচন্দ্রের মনে পড়ল, একবার পূর্ববঙ্গ থেকে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন পণ্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন। বঙ্কিম খুব একটা পাত্তা দেননি। নাসিকা কুঞ্চিত করে ধান-পাটের বাজার নিয়ে আলাপ করেছিলেন। বহুকাল ধরেই ভাবছিলেন কাজটা ভালো হয়নি। সুযোগ খুঁজছিলেন কোনো একদিন পাপস্খালন করবেন। আজ দেবরাজকে বলেই ফেললেন। দেবরাজ বললেন, ‘বুঝলাম যেতে চাও। কিন্তু পূর্ববঙ্গ কি আর পূর্ববঙ্গ আছে! ওটা এখন বাংলাদেশ। জানো সে খবর?’ বঙ্কিমচন্দ্র অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। ইন্দ্র বললেন, ‘যেতে চাচ্ছো যাও। তবে সাবধান। ফেসবুক, ইউটিউব থেকে দূরে থাকবে।’  ‘এই বস্তুর নাম কখনো শুনিনি, প্রভু!’ ‘গেলেই বুঝতে পারবে।’ ‘ঠিক আছে প্রভু। আমি তাহলে এখনই রওনা হচ্ছি।’ ‘তথাস্তু!’

দেবরাজ বঙ্কিমচন্দ্রকে বেশ কদর করেন। মর্ত্যগমন উপলক্ষে তার সঙ্গে দিলেন অশ্বরথ ও সারথি। আশীর্বাদ করলেন দেবী সরস্বতী; বললেন, ‘চিন্তা কোরো না। মর্ত্যবাসে মাঝেমধ্যেই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে।’   ঢাকার উদ্দেশে ছুটল সেই রথ। সাত আকাশ থেকে বঙ্কিমচন্দ্র দেখতে পেলেন কুচকুচে কালো একটা রেখা। মনে হচ্ছে কালো একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। বঙ্কিম রথচালককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওটা কী?’ রথী বলল, ‘মহাত্মা, ময়লা পূরীষপ্লাবিত ওই জলপ্রবাহিণীর নাম বুড়িগঙ্গা। ঢাকার সমস্ত বায়ুপিত্তকফ ওখানেই পড়িয়া থাকে।’  বঙ্কিমচন্দ্রের নাকে ভুরভুর করে পচা গন্ধ ঢুকে পড়ল। তিনি রুমাল চাপলেন। বললেন, ‘তুমি তো সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াও, নানারকম খবর রাখো। আচ্ছা, ঢাকার সাহিত্যের লোকজন কোথায় থাকে বলো তো?’ রথী বলল, ‘প্রাথমিকভাবে ওই বুড়িগঙ্গার তীরস্থলেই। একদা এ স্থানেই গড়িয়া উঠিয়াছিল পুস্তকের বাজার। এক্ষণে ইহার নাম বাংলাবাজার।’ ‘পাশেই? এই ময়লা আবর্জনায়?’ ‘হ্যাঁ। এ স্থলেই জগতের... মানে বাংলার কীর্তিধন্য সব কবিলেখকের সমাগম ঘটিয়া থাকে।’ ‘তাই নাকি!’ ‘ওই যে সড়সড় ফড়ফড় শব্দ শুনিতে পাইতেছেন উহা প্রেস। বোধ করি, নাকে কালির গন্ধ পাইতেছেন। গ্রন্থমেলা উপলক্ষে এক মুর্গি কবির কবিতাপুস্তক ছাপা হইতেছে।’ ‘মুর্গি কবি! এ আবার কী বস্তু?’ ‘নবীন কবি। পাঠক নাই। কেহই কিনিবে না। যাহার বই উঁইপোকা কাটিয়া সাবার করিতে গিয়াও নিরতিশয় ক্লান্ত হইবে। দায়ে পড়িয়া হয়তো-বা মিনসে কবিটির স্ত্রী অথবা প্রেয়সী কিনিবে। এতদ্দেশে এ জাতীয় কবিকেই মুর্গি কবি কহা হইয়া থাকে।’ ‘ওহ্! মুর্গি কেন?’

‘কারণ এ জাতীয় পদ্যসেবীকে জবেহ করা হইয়া থাকে। ধরুন, গ্রন্থ ছাপাইতে লাগিবে বিশ সহস্র টাকা। কসাইরূপ মুদ্রক কিংবা প্রকাশক তাহার নিকট হইতে লইবে পঞ্চাশ হাজার টাকা। তাহারা দ্বিগুণ-চতুর্গুণ অর্থ আত্মসাৎ করিয়া ইহারা কবিযশোপ্রার্থীদিগকে কতল করিয়া থাকে। তো এই কতলকৃত প্রাণীটিকে মুর্গি না বলিয়া, কী বলিবেন!’ ‘থাক। আমার ওসব জানার দরকার নেই। একজন কবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারো?’ ‘ওই যে, লম্বিত কেশ দোলাইয়া ল্যাংচ্যাং করিয়া যিনি বিড়ি ফুঁকিতেছেন তিনিই কবি। উহার পদযুগল দেখুন, শূন্যপাদুকা। পকেট হাতড়াইয়া দেখুন শূন্যকপর্দক, বসনের আবস্থা দেখুন ধূসরিত।’

বঙ্কিমচন্দ্র ছেলেটির কাছে গেলেন।  ‘তুমি বুঝি কবি?’ ‘হ্যাঁ। আপনি কে?’ আমতা আমতা করে বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘আমি বঙ্কিমচন্দ্র...।’ কবি ছেলেটি বলল, ‘বঙ্কুবাবু?’ ‘না, না বঙ্কিমচন্দ্র...’ ‘তা যাই হোক, আমরা নাম ছোট করেই বলি। যেমন ধনঞ্জয়কে আমরা বলি... তা যাক সে কথা! বঙ্কুবাবু আপনাকে দেখে তো এ যুগের মানুষ মনে হয় না।’ বঙ্কিমচন্দ্রের মাথায় পাগড়ির মতো শামলা বাঁধা। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। পায়ে চটি জুতা। নাম বঙ্কিম বলে, জুতাটা একটু বেশিই বাঁকা। ‘তা ঠিক। আমি অন্য যুগের মানুষ।’ ‘মানে?’ ছেলেটি তেমন পাত্তা দিচ্ছে না দেখে বঙ্কিমচন্দ্র খুলেই বললেন, ‘আমি ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’ ‘অ..! তাই বলুন...। কী সব বিদঘুটে লেখা লিখেছেন আপনি...ওসব কেউ পড়ে!’ বঙ্কিমচন্দ্রের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। পরিচয় শুনে ছেলেটি যেন পাত্তা দেয়ার ভাব আরো একটু কমিয়ে দিল। ‘এখানে কী মনে করে?’ ‘এই একটু ঘুরতে আরকি। হাওয়া খেতে।’ ‘হাওয়া খাওয়ার আর জায়গা পেলেন না। বাংলাবাজারে তো হিসুর গন্ধ।’ স্বর্গ থেকে দেবী সরস্বতী তখন মিটমিট করে হাসছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘তুমি কি আমার কোনো লেখা পড়েছো?’ ‘ওসব পড়া যায় নাকি! বিড়াল-টিড়াল কিছু একটা পড়েছিলাম। কমলাকান্তের দপ্তর না কি যেন, একদম ফালুত!’ ‘ফালতু’ শব্দটি বঙ্কিমচন্দ্রের কানে কড়াৎ কড়ে ঢুকে পড়ল।

এর মধ্যে কে যেন কড়কড়ে গলায় বলে উঠল, ‘আব্বে, কবিছাব এই ছব ছাহিত্য লইয়া আপনেরা এলায় দূরে গিয়া খাড়ান।’ বঙ্কিমচন্দ্র কিছু বুঝলেন না। ছেলেটি বলল, ‘উনার দোকানে হাজারখানেক টাকা বিল বাকি পইড়া আছে আমার। তাই দাঁড়াইতে দিতে চাইতেছে না। চলেন অন্য কোথাও বসি।’ বঙ্কিমচন্দ্র আর ছেলেটি হাঁটতে হাঁটতে ভিক্টোরিয়া পার্কে এসে দাঁড়ালো। গাছ তলায় বসল। একটা কোকিল ‘কুহু’ স্বরে ডাকছে। ছেলেটি বলল, ‘বসন্তের বাতাস। টের পাইতেছেন?’ বঙ্কিমচন্দ্র মাথা নাড়লেন। ছেলেটি বলল, ‘আপনি তো আবার সংস্কৃত শব্দ ছাড়া লিখতে পারেন না। বাতাসকে বলেন ‘সমীরণ’, ঘোড়াকে বলেন ‘অশ্ব’, উস্টা খাওয়ারে বলেন ‘কঠিন দ্রব্যসংঘাতে পদস্খলন’। বঙ্কিমচন্দ্র ভাবলেন, ‘এই রে, সেরেছে। একেবারে জায়গামতো।’ বললেন, ‘নাহ, মানে, ওরকমটাই তখনকার নিয়ম ছিলো।’ ছেলেটি বলল, ‘ধুর কী যে বলেন। আমরা যে কতো খাইতাছি, আইতাছি, যাইতাছি বলি, সমস্যা কই?’ ‘সমস্যা না, মানে, অভ্যাস।’ ‘তো অভ্যাস কইরা সহজ ভাষায় লিখতে পারতেন না? আমরা কতো সহজে লিখি...।’ বঙ্কিমচন্দ্র মাথা নাড়লেন। আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঢাকায় পত্রিকা-টত্রিকা হয়?’ ‘কয়শ পত্রিকা লাগবো আপনার? দৈনিক তেলেসমাতি, সাপ্তাহিক তেল মারি, ডেইলি চুদলিংপং...’ বঙ্কিমচন্দ্র কানে হাত দিলেন। ‘ওসব নয়, বাপু। সাহিত্যপত্র... আছে কি?’ ‘ওহ্! আছে কয়েকটা। ভাইবেরাদর কোম্পানি।’ ‘মানে?’ ‘মানে হইল, ভাই-বেরাদর-বেয়াই-শালা-সম্বন্ধি টাইপের লোকজন নিয়া পত্রিকা।’

বঙ্কিমচন্দ্র বুঝলেন না। কবি ছেলেটি বলল, ‘বোঝেন নাই। জানি। এসব পত্রিকার লেখকই পাঠক, পাঠকই লেখক। নিজেরা লেখে, নিজেরাই পড়ে। আবার নিজেরাই নিজেদের লেখকদের পুরস্কার দেয়। তাই ভাইবেরাদর পত্রিকা। আমরা আর মামুরা মিলা পত্রিকা বানাইছে। একসময় লিটিল ম্যাগাজিন আছিল। এখন আর নাই।’ ‘লিটিল ম্যাগাজিন কী?’ ‘ওহ্। আপনি তো আবার পুরাইন্যা মানুষ। লিটিল ম্যাগাজিন হইল ছোটকাগজ। দেমাগি পত্রিকা। কাউরে পোছে না। অনেকটা আপনের ‘‘বঙ্গদর্শন’’ টাইপের।’ বঙ্কিমচন্দ্র মনে মনে একটু আনন্দবোধ করলেন। ‘আচ্ছা, একটা কথা শুনেছিলাম। এখনকার লেখকরা নাকি ‘‘ফেসবুক’’ নামের বইয়ে লেখালেখি করে।’ কবি ছেলেটি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘বঙ্কুবাবু, ফেসবুক কোনো বই নয়। মনে করেন, আপনের বাড়ির দেয়াল, আপনি যা খুশি তা-ই লেইখা রাখলেন। তবে দেয়ালটায় লেখার জন্য আপনার একটা অ্যাকাউন্ট খুলন লাগব।’

বঙ্কিমচন্দ্র কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝলেন না। ছেলেটি বলে চলল- ‘দাঁড়ান আপনারে একটা অ্যাকাউন্ট খুইলা দেই।’ পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে ছেলেটি তার মোবাইল ফোনে ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ নাম দিয়ে একটা অ্যাকাউন্ট খুলল। রিকুয়েস্ট পাঠালো বিভিন্ন জনের কাছে; যেমন বাল্মীকি, বেদব্যাস, কালিদাস, হোমার আর শেক্সপিয়রের কাছে। এর বাইরে রিকুয়েস্ট পাঠালো ঢাকার হামবড়া এক কবির কাছে। সাড়ে তিনশো উপন্যাস লিখেছে দাবি করা এক ঔপন্যাসিকের কাছে। বঙ্কিমচন্দ্র এসবের কিছুই বুঝলেন না।  ছেলেটি একটা পোস্ট লিখল, ‘আমি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আমিই সেই ঔপন্যাসিক।’ কলকাতা থেকে একজন কমেন্ট লিখল, ‘তুই কে রে বে শান্তিপোগাল?’ ঢাকাই কবি লিখলেন, ‘ব্যর্থ কবি।’ বাল্মীকি লিখলেন, ‘হবে, তোকে দিয়েই হবে, পাগলা।’ ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে’ নামের আইডি থেকে লিখেছে, ‘কম দামী গাঞ্জা খাইলে এইরকমই হয়।’ ‘নার্গিস নার্গিস’ নামের আইডি থেকে লিখেছে, ‘লাগবে? ইনবক্স প্লিজ। ইমোতে আছি। ভিডিওতে। অ্যাডভান্স লাগবে না।’ মধুসূদন লিখেছে, ‘অজ্ঞান তুই যা ফিরি যা ঘরে।’ অধ্যাপক ড. কুতুবউদ্দিন পিএইচডি নামের আইডি থেকে লিখেছে, ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ।’ বঙ্কিমচন্দ্রকে কমেন্টগুলো দেখিয়ে ছেলেটি বলল, ‘কেমন?’ ‘এসব তো বুঝি না বৎস!’ ‘কয়েক দিন ঢাকায় থাকলেই বুইঝা যাবেন।

বঙ্কিমচন্দ্র বইয়ের দোকানগুলোতে যেতে চাইলেন। ছেলেটি তাঁকে নিয়ে গেলো ঢাকার এক বিখ্যাত বইয়ের দোকানে। বঙ্কিমচন্দ্র তাকিয়ে দেখলেন শেলফের ওপর অসংখ্য বই; একটা শেলফে কেমন সব বই : ‘বড় লোক হবেন কীভাবে’, ‘ইংরেজি শিখুন বিদেশ যান’, ‘ইউটিউবার হওয়ার সহজ উপায়’, ‘গার্লফ্রেন্ড পটাতে চান?’। সাহিত্যের বই কোথায়? মনে মনে ভাবছিলেন। দেখলেন, বিরাট একটা শেলফে উপন্যাস, কবিতা আর প্রবন্ধের বই। বইয়ের স্তূপে ধুলো জমে আছে। কাউন্টারে বসে দোকানের লোক দুটি ঝিমাচ্ছে। দোকানের এক কোনায় গিয়ে তারা বসলেন। ছেলেটি বলল, ‘কফি খাবেন?’ ‘বইয়ের দোকানে কফি?’ ‘চা-কফি, সব আছে। কী চাই আপনার?’ ‘দাও দেখি এক কাপ কফি। দেড়শো বছর আগে খেয়েছি স্বাদ মনে নেই।’ কফিতে চুমুক দিতে দিতে বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘বইটই বিক্রি হয় কেমন?’ ছেলেটি হো হো করে হেসে উঠল- ‘বই! ওই যে দেখুন সেলফি তুলছে।’ ‘সেলফি?’ বঙ্কিম দেখলেন রোহিণীর মতো দেখতে এক তরুণী বহুবিধ ভঙ্গিতে ছবি তুলছে। একটা বই হাতে নিয়ে ছেলেবন্ধুটিকে বলছে, ‘দেখো কী সুন্দর! কিউট একটা বই!’ বইটিকে জড়িয়ে কসরত করে আরও কয়েকটা ছবি তুলে বইটি যথাস্থানে রেখে দিয়ে রোহিণী বেরিয়ে গেলো। কবি ছেলেটি বলল, ‘দেখলেন তো! এই হলো বই পড়া। যাউকগা, আসেন আপনার সঙ্গে একটা সেলফি তুলি।’ মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ছেলেটি বঙ্কিমচন্দ্রের পাশে বসে ছবি তুলল। এর একটু পরে এলেন এক ঔপন্যাসিক। কবি ছেলেটি তাকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে বসল। ফিসফিস করে বলল, ‘উনি সচিববান্ধব ঔপন্যাসিক।’ ‘মানে?’ ‘মানে উনি সরকারি আমলা লেখকদের সঙ্গে চইলা ফিইরা খান। আপনিও তো আমলা ছিলেন। উনি আমলাদের সামলে চলেন। তাদের গুণকীর্তন করেন। কলকাতা থেকে পুরস্কার এনে দেন।’ ‘ওহ্! তাই!’ ‘হতাশ হইয়েন না। কলকাতার লেখকরাও তারে ধইরা ঢাকা থেকে পুরস্কার নিয়া যায়।’

সচিববান্ধব ঔপন্যাসিক তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এর মধ্যেই ক্রিং ক্রিং করে তার ফোন বেজে উঠল। বললেন, ‘ভাই, আপনারে লইয়া বিশেষ সংখ্যা করব। কলকাতা থিকা দেবশদা, সুনীলদা লেখা দেবে।’ ছেলেটি ফিসফিস করে বলল, ‘দেখছেন, মারল একটা চাপা! দেবেশ-সুনীল মইরা কবে ভূত হইয়া গেছে! ভুইলা গেছিলাম, আপনি হালায়ও তো ভূত!’  ‘ওরা কারা?’ ‘কে আবার, ওরা আপনার মতোই কলিকাতা হারবাল, মানে কলিকাতার ঔপন্যাসিক! একজন আবার কবিও। আমগো এই ঔপন্যাসিক আপনেগো সার্টিফিকেট আমগো কাছে বেচে। আমগো সার্টিফিকেট আপনেগো কাছে বেচে।’ ‘কলকাতার ওপর তোমার অনেক রাগ?’ ‘নাহ্। তা না। ঢাকাই আর কলকাত্তাই সাহিত্যিক বাটপারগো নিয়া মশকরা করি।’

বঙ্কিম বই হাতড়ে দেখছিলেন। একটা শেলফে দেখলেন তার লেখা সব বই সারি সারি করে সাজানো। মনে হলো না ইহজন্মে কেউ ওইসব ছুঁয়ে দেখেছে। তাকে নিয়ে লেখা একটা বইয়ের ওপর চোখ গেলো- ‘শতবর্ষের ফেরারি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’। বঙ্কিমচন্দ্র পৃষ্ঠা উল্টে দেখলেন লেখক ভদ্রলোকের নাম আহমদ ছফা। ভাবলেন, আসামি দশা থেকে কবে যে তার মুক্তি ঘটবে! বাংলার এক অধ্যাপক এসেছেন। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। কী যেন একটা বই খুঁজছেন। কবি ছেলেটি বলল, ‘এরা আধুনিক ভিখারি। ওই ঝোলায় যে কী জ্ঞান আছে কে জানে! এরা কথা বলে থিয়েটারের গদগদ ভাষায়- ‘‘ভায়া, রোমান্টিকতা নিয়ে একটা ভালো বই হবে?’’ মনডায় কয়...’ ছেলেটি ভেংচি কেটে দেখালো। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘থাক, থাক।’ ‘আপনি জানেন না, এরা পাঁচ পাতার প্রবন্ধে বিশ পাতার রেফারেন্স দেয়। বারো হাত বাঙ্গির তেরো হাত বিচি।’

বঙ্কিমচন্দ্র এদিক-ওদিক তাকালেন, ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, তোমাদের এখানে বড় লেখক কারা? স্বর্গ থেকে আসার সময় কয়েকজনের নাম শুনে এসেছিলাম।’ ‘এখানে সবাই বড় লেখক। এরা প্রতিদিনই নোবেল প্রাইজ পায়।’ বঙ্কিমচন্দ্র কিছু বুঝলেন বলে মনে হলো না। ‘এরা এতো বড় লেখক যে, হোমারকে মনে করে তৃতীয় শ্রেণির কবি। শেক্সপিয়রকে মনে করে পাড়ার দোকানে বইসা থাকা গাঞ্জাখোর।’ বঙ্কিমচন্দ্রের বুক ঢিবঢিব করে উঠল, ‘আমাকে না জানি কী মনে করে!’ ছেলেটা বোধ হয়, বঙ্কুবাবুর মনের কথা বুঝতে পারল। বলল, ‘আর আপনাকে হাতে পেলে হামানদিস্তায় রেখে পিইষা ফেলত।’ ‘কেন? কেন?’ ‘কেন আবার? স্বর্গে ফিরে যাওয়ার সময় আহমদ ছফার বইটা নিয়া যাইয়েন। মন দিয়া পইড়েন।’ ‘যাই হোক, আমাদের সবচেয়ে বড় লেখক হইলেন মি. চ্যাটজিপিটি।’ ‘উনি কি ইংরেজ? নামটা কেমন ইংরেজি শোনাচ্ছে। ছদ্মনাম?’ ‘না গো বঙ্কুবাবু, ওইটাই আসল নাম। উনি ইংরেজ, বাঙালি, ওড়িয়া, হটেন্টট, মাউরি, বুশম্যান, অ্যাবরিজিনাল... সব।’ বঙ্কিমচন্দ্র হাঁ করে আছেন। ‘উনি একই অঙ্গে বহু রূপ। উনি সব লিখতে পারেন, পড়তে পারেন, বলতে পারেন। যা চাই, সব পাবেন। আরও একজন আছেন।’ ‘কে?’ ‘জেমিনাই।’ বঙ্কিমচন্দ্র পূর্ববৎ। ‘উনিও একজন লেখক।’ বঙ্কিমচন্দ্র ভাবলেন কোনো ‘মহিলা লেখক’ হবে হয়তো। ‘দেখবেন নাকি উনারে?’ ‘দুজনকে দেখতে পেলে মন্দ হতো না।’

ছেলেটি তার মোবাইল ফোন বের করে চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাই খুলে বঙ্কিমচন্দ্রের সামনে মেলে ধরল। বঙ্কিমচন্দ্র দেখলেন এরা কোনো সাক্ষাৎ পুরুষ বা রমণী নন। কর্কট যন্ত্রমাত্র। সরস্বতী বঙ্কিমচন্দ্রের কানে দৈববাণী করলেন, ‘ওরে বঙ্কিম, ওরাই একালের বিদ্যাধর আর বিদ্যাধরী। জগতে আমার পূজা নেই রে!’ ছেলেটি বলে চলেছে, ‘এরা যা খুশি তাই লিখতে পারে। কথাও বলতে পারে। আপনারে নিয়া এখনই একপাতা লিইখা দিতে পারবে। এই দেখেন...।’ ছেলেটির মোবাইলের স্ক্রিনে বঙ্কিমচন্দ্র দেখতে পাচ্ছেন ফটফট করে লেখা হয়ে যাচ্ছে। অশরীরী কেউ যেন লিখছে। বঙ্কিমচন্দ্র পড়তে লাগলেন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে পূর্ববঙ্গের কবিলেখকদের নালিশ কী?

অভিযোগ নম্বর ১: বাংলা মানেই কি নদীয়ার বাংলা? তাঁর ভাষা ছিল বেশ সংস্কৃতমাখা, ঝরঝরে, ভদ্রলোকি। পূর্ববঙ্গের লেখকেরা বলতেন- ‘আমাদের কথাবার্তা কি তবে বাংলা না? নাকি আমরা আলাদা গ্রহের বাসিন্দা?’

অভিযোগ নম্বর ২: বঙ্গদর্শন না কি পশ্চিমদর্শন? তিনি যে পত্রিকা চালাতেন- বঙ্গদর্শন- সেটাতে পশ্চিমবঙ্গীয় ঢংটাই বেশি চোখে পড়ত। পূর্ববঙ্গের কবিদের মনে হতো, ‘এই মঞ্চে উঠতে হলে আগে ভাষা পাল্টাও!’

অভিযোগ নম্বর ৩: চরিত্রে কেমন যেন একচোখা নীতি! কিছু উপন্যাসে পূর্ববঙ্গের চরিত্ররা নাকি একটু সাদাসিধে, একটু কম কেতাদুরস্ত। আর কলকাতার ভদ্রলোকেরা? আহা! শিক্ষিত, মার্জিত, বীর!

অভিযোগ নম্বর ৪: আমাদের কথা কই? পূর্ববঙ্গের মুসলিম লেখকদের কেউ কেউ বলতেন- ‘ভাই, বাংলার ছবিটা তো একটু বড় করে আঁকুন! আমরা কি ছবির বাইরে?’ 

পূর্ববঙ্গের কবিলেখকদের ক্ষোভটা ছিল এমন: ‘বঙ্কিমবাবু বাংলা সাহিত্যের রাজা ঠিকই, কিন্তু রাজ্যটা যেন শুধু পশ্চিমেই সীমাবদ্ধ!’ 

বঙ্কিমচন্দ্র চোখ বড় বড় করে লেখাটা পড়লেন। আদালতের অভিযোগগুলো নিয়ে তিনি আবার ভাববেন। কিছুটা ভেবেছিলেন বলেই তো পূর্ববঙ্গে আসা। সরস্বতী কানে কানে বললেন, ‘বঙ্কিম, তোমার যাওয়ার সময় হলো। তাছাড়া, দেশকালের অবস্থা খারাপ। কখন কোন মবের পাল্লায় পড়ো, ঠিক নেই।’ মব সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো ধারণা নেই। তবে অনুমান করলেন বাজে কিছুই হবে। বঙ্কিমচন্দ্র ছেলেটিকে বললেন, ‘মর্ত্যবাসের সময় ফুরিয়ে এলো। আমাকে যেতে হবে। শেষ বেলায় সত্যি করে একটা কথা বলবে?’ বিস্মিত হয়ে ছেলেটি বলল, ‘কী কথা?’ ‘আমার লেখাগুলো কিছু হয়নি?’ ছেলেটা মুচকি হেসে বলল, ‘বঙ্কুবাবু, সন্দেহ নাই, আপনি ভালো লেখক। আপনার স্টোরি টেলিং দুর্দান্ত। কিন্তু জেনজিরা কি আপনারে পড়বে?’  বঙ্কিমচন্দ্রের ইচ্ছা হলো একবার জিজ্ঞেস করেন, ‘জেনজি কারা’। কিন্তু বারবার মূর্খতা প্রকাশ করা ঠিক হবে কি? বিরত থাকলেন। সস্নেহে ছেলেটিকে বললেন, ‘শুরু থেকেই তোমাকে বড় চেনা চেনা লাগছে। তোমার নামটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি।’ ছেলেটি বলল, ‘আমার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ ‘রবীন্দ্রনাথ। জোড়াসাঁকোর?’ ‘ছিলাম। এখন এই বাংলাদেশে কবি হওয়ার চেষ্টা করতেছি।’ ‘কলকাতায় যাবে না?’ ‘নাহ্। এককাল তো ওই দেশে কাটাইছি। এইবার এই দেশে আছি। শুধু আমিই না। আরও কয়েকজন ফিইরা আসছে। মীর মশাররফ হোসেন, নজরুল, জীবনানন্দ- ওরাও আছে। ওদের মনে হয় চিনবেন না। মীর মশাররফ হোসেন তার দ্বিতীয় বউরে নিয়া রিলস্ বানায়, নজরুল এখন ইউটিবার। জীবনানন্দ মাঝেমধ্যে ফেসবুক লাইভে আইসা খেঁজুরের গুড় বেচে।’ 

বঙ্কিমচন্দ্রের সন্দেহ এখনও ঘোঁচেনি- ‘আচ্ছা, তুমি কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?’ ‘হ্যাঁ, কেন বিশ্বাস হয় না? আপনি যদি বঙ্কিমচন্দ্র হন, আমার রবীন্দ্রনাথ হইতে সমস্যা কী?’ বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘তা ঠিক!’ ছেলেটি বলল, ‘আপনি তো এক লেখায় আমার নাম উল্লেখ করছিলেন। লিখছিলেন: যখন এই প্রবন্ধ লিখিত হয়, তখন রবীন্দ্রবাবুর কাব্য সকল প্রকাশিত হয় নাই।’  ‘ভুলে গেছি। তোমার মনে আছে?’ ‘আমিও আপনারে নিয়া লিখছিলাম: ‘পেয়েছে তোমার হাতে তব দেশ, কালের যে বর,/ হে বঙ্কিম নহে সে স্থাবর।’ ‘তাই! পড়িনি বোধ হয়।’ ‘পড়বেন কী কইরা! তখন তো আপনি স্বর্গলোকে।’ ‘ওহ্! মৃত্যুর পর।’ সরস্বতী তাড়া দিলেন, ‘বঙ্কিম, চলো, আর কতো। স্বর্গবাসীর পক্ষে দীর্ঘকাল মর্ত্যবাস স্বাস্থ্যকর নয়। চাও তো পুনর্জন্ম নিতে পারো। দেবরাজের কাছে প্রার্থনা করো।’  এমনও হতে পারে সরস্বতী হয়তো চিন্তায় পড়ে গেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র আবার ইউটিউবার হয়ে ওঠে কিনা।

রবীন্দ্রনাথের কাঁধে হাত রেখে বঙ্কিমচন্দ্র বললেন, ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’। ফারসিতে বললেন, ‘খুশা বাঙ্গাল-ও ওয়াজা-ই বে-মিসালশ/ খুদাভান্দা নেগাহ দার আয যাওয়ালশ- চমৎকার বাংলা আর তার অতুলনীয় অবস্থা, হে ঈশ্বর! একে ধ্বংস থেকে রক্ষা করো।’ বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। অশ্বরথে যেতে যেতে ভাবলেন, সুযোগ পেলে পূর্ববঙ্গে জন্ম নেবেন। মীর মশাররফ হোসেন আর দীনেশচন্দ্রের সঙ্গে একটা বৈঠক করবেন। একটা পত্রিকা করবেন, নাম দেবেন ‘পূর্ববঙ্গদর্শন’।