শিল্প ও সাহিত্য

রইদ: মায়া রহস্য নান্দনিকতা

দেশ থেকে প্রায় উজাড় হওয়া প্রেক্ষাগৃহের প্রেক্ষাপটে মহানগরে সিনেমা দেখার নতুন সংস্কৃতি এখন বেশ পাকাপোক্ত রূপ নিয়েছে। টিকেটের উচ্চমূল্য, পরিচ্ছন্ন জোরালো শ্রবণ সুবিধা, সম্পূর্ণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক প্রদর্শনালয় (সিনেপ্লেক্স), এমন বাস্তবতা ইতোমধ্যে চলচ্চিত্রের নিয়মিত নির্দিষ্ট ভোক্তাশ্রেণী তৈরি করেছে। হাজারখানিক বা তারও বেশি টাকা ব্যয় করে একটি চলচ্চিত্র উপভোগ (আছে যাতায়াত খরচও) কাদের পক্ষে সম্ভব, সেটি সহজেই অনুমেয়।

শিক্ষা, রুচি, নতুন কিছু গ্রহণের মনোভাব এবং মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় শ্রেণীভেদ ও স্তরভেদ থাকলেও দুই ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত একগুচ্ছ চলচ্চিত্রের ভেতরে দু’তিনটি দেখার মানুষের অভাব ঘটছে না। এই দর্শকদের একটি অংশ সিনেমা দেখার পর প্রতিক্রিয়া বা অভিমত প্রকাশেও বেশ আগ্রহী। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারকালে দীর্ঘ দীর্ঘ সব রিভিউ বেরিয়ে যেতে দেরি হচ্ছে না। ফলে তাৎক্ষণিক দর্শক-সাড়ায় ছবির পরিচালকসহ টোটাল টিমের জন্য প্রেরণা ও উদ্দীপনা লাভের সুযোগ ঘটছে। রইদ-এর বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি, বরং প্রাপ্তি কিছুটা বেশিই।

নেটফ্লিক্সের সুবাদে শিক্ষিত শহুরে দর্শকের অগতানুগতিক চলচ্চিত্র দর্শনের চাহিদা বাড়লেও এখনও সিনেমায় সবাই একটি উৎকণ্ঠাময় উপভোগ্য কাহিনি প্রত্যাশা করেন। গল্পের শুরু যখন হয়, তখন তার শেষও থাকবেই। এই পরিসমাপ্তিকে পরিণতি বা অনিবার্য অন্তিম হিসেবে বিবেচনা না করলেও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য যবনিকা চান দর্শক, যেটি স্বাভাবিক প্রবণতা। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী কিছু হলে মনের মধ্যে একটা খচখচ ভাব নিয়ে হল ত্যাগ করেন মুভিপ্রেমীরা। এটিকে অস্বস্তি বা অতৃপ্তি হিসেবে না দেখলেও একটা অসম্পূর্ণতার বোধ যে তৈরি হয়, অস্বীকার করা যাবে না। রইদ-এর বেলাতে এরকমই ঘটেছে বলেই ধারণা। সিনেমার শেষ নিয়ে শুরুতে কথা না বাড়িয়ে বরং অন্যদিকে যাওয়া যাক। 

মোটা দাগে সরলভাবে গল্পটি জেনে নিতে পারি। কাহিনির প্রধান দুই চরিত্র সাদু ও তার বউ। বউয়ের নাম উচ্চারিত হতে শোনা যায় না। সাদু ও তার ‘পাগলি’ বউয়ের বয়সের ব্যবধান একটু বেশিই। যদিও লক্ষ্যযোগ্যভাবে একমাত্র বউটিরই এ নিয়ে কোনো ভাবান্তর নেই। স্বামীকে সে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে। সমাজবাস্তবতা আজও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, গ্রামীণ সমাজে স্বামী, সে যতো বিত্তহীন, চালচুলোহীন, ভৃত্যসম সামাজিক অবস্থানের একজন হোক না কেন, নিজ স্ত্রীর সে পতি, কর্তা বা মালিক, বউ তার অধস্তন ও আজ্ঞাবহ। আমাদের ‘পাগলি’ বিয়ের পর সাদুর ঘরে আসার প্রথম দিন থেকেই সমাজের এই জগদ্দল চিরাচরিত অবস্থান অগ্রাহ্য করে চলে, বা বলা সংগত এ বিষয়ে তার যেন কোনো পূর্বধারণা নেই।

তাই স্বামীর সঙ্গে সে সমানে সমান ভাবভঙ্গি নিয়েই সংসার যাপন করে। দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানব-মানবী দাম্পত্যসঙ্গী হলেও কেবলমাত্র সক্রিয় যৌনতার ক্ষেত্রে পাগলিকে পূর্ণ উদাসীন বা বিমুখ দেখা যায়। সংগত কারণেই এতে স্বামী সাদুর আশাভঙ্গ ঘটে। অপরদিকে পাগলির পাগলামির মাত্রা বৃদ্ধি পেলে সাদু প্রথমে তার স্ত্রীকে দূর জঙ্গলে রেখে এসে মুক্তি পেতে চায় এবং দ্বিতীয় দফা পাগলিকে তার আগের বাসস্থান আত্মীয় বাড়ির ঘাটে রেখে আসে। দু’দফাই ঠিকঠিক চিনে সাদুর সংসারে ফিরে আসে পাগলি। পরের বার সে অন্তঃসত্ত্বা থাকে। এখানেই কাহিনির  প্রথম বাঁকবদল। 

এরই মধ্যে দুই নরনারীর ভেতর গড়ে উঠেছে অনির্ণেয় মায়ার সম্পর্ক। একে প্রেম বলাই সমীচীন। তাদের ভস্মীভূত ঘরের স্থানে দুজনে মিলে গড়ে তুলেছে নতুন ঘর। বউয়ের হাতের অতিসুস্বাদু তালের পিঠায় সাদু আসক্ত হয়ে পড়ে। যাহোক, পাগলির গর্ভের সন্তানের পিতা কে, এই জিজ্ঞাসায় বিপুলভাবে আন্দোলিত না হলেও সাদু চায় ভ্রূণ নষ্ট করতে। বেঁকে বসে পাগলি। তার সাফ কথা, গর্ভের সন্তান তার একার, আল্লাহ সে-সন্তান তাকে দিয়েছে। যদিও সাদুর প্রতি ক্ষোভ ও অভিমানবশত সে পরে নিজেই গর্ভস্থ সন্তানকে হত্যায় উদ্যত হয়। এরপর আর তাকে গ্রামে দেখা যায় না। পাগলির অদর্শনে পাগলদশা হয় সাদুর। নতুন বউ হিসেবে সাদুদের গ্রামে আসার সময়ে পাগলি তার প্রিয় ছাগল ‘কুলসুম’কে নিয়ে এসেছিল। এতদিনে সেই ছাগলটিও গর্ভবতী হয়।

সাদু চারদিকে খুঁজে চলে তার জীবনসঙ্গীকে। গাছে তাল পাকে, কিন্তু তালের পিঠা তৈরির মানুষ অনুপস্থিত। ছাগশিশুর জন্ম দিতে গিয়ে কুলসুম মারা যায়। এ পর্যায়ে সাদুর আশ্চর্য রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। সে মৃত ছাগমাতাকে কবর না দিয়ে তার মাংস পুরোটাই ভক্ষণ করে। পরদিন গাছ থেকে তাল পড়লে সাদু তালগাছের দিকে ছুটে যায়। একের পর এক তাল পতিত হতে থাকে। তালের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে সাদু। প্রায়মৃত অবস্থায় সে বুঝি দেখা পায় তার প্রিয়তমা জীবনসঙ্গীর। তার দিকে সাদু হাত বাড়িয়ে দেয়। পাগলিও তার দিকে হাত বাড়ায়, সেই হাতে ধরা থাকে একটি তাল, যেটি সাদুর জন্যেই নির্দিষ্ট। 

‘রইদ’ সিনেমার দৃশ্য

এখানেই সিনেমা শেষ। এতক্ষণে হয়তো পাঠক বুঝবেন সিনেমার শেষটা নিয়ে শুরুতে কেন কথা বলা। মানব-মানবীর সম্পর্ক হয়ে উঠতে পারে বিচিত্রমাত্রিক। মায়া আর ভালোবাসা সত্যিই তুলনারহিত। জীবনযাত্রায় প্রেমরশ্মি জীবনের নতুন অর্থ দেয়, মানুষ নিজেকে চিনতে শেখে। এটির প্রকাশ দেখি চলচ্চিত্রে।

আপাতদৃষ্টিতে ‘রইদ’ দুটি সরল উন্মুল স্বজনহীন নিঃসঙ্গ মানুষের যৌথ জীবনযাপনের গল্প মনে হলেও কিছু সূত্র ও সংকেত (তাল প্রসঙ্গে গন্ধম ফলের উল্লেখ, কুমারি-মাতৃত্ব, শেকলবন্দি অবস্থায়ও তালের পিঠা তৈরি এবং ঘর আগুনে পুরো পুড়ে গেলেও পাগলির ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসা, এবং আরও কিছু রহস্যময়তা) দর্শকমনে ভিন্ন জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়। এটিকে অনেকেই আদি মানব-মানবী আদম আর হাওয়ার (সেইসঙ্গে আদমের প্রথম নারীসঙ্গী লিলিথেরও) গল্প হিসেবে দেখছেন। লেখক হিমালয় পাই (ফেসবুক আইডি গধযভুঁ ঝরফফরয়ঁব ঐরসধষধু) রইদ মুভির এমন বয়ান উপস্থিত করেছেন যে, দর্শক পর্দায় যাই দেখুক, পরিচালকের পরিকল্পনা বা মনের ভেতর আদি মানব-মানবীর মিথই কাজ করেছে এবং আপাত সাধারণ ঘটনাকে ওই ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব, সেটিরই প্রয়াস ওই লেখা। ওই সুলিখিত ইন্টারপ্রেটেশন পাঠককে প্রভাবিত করার মতোই। 

যাহোক, ছবি দেখার পর দর্শক প্রতিক্রিয়া নানামুখী হওয়া বিচিত্র নয়, যদিও পরিচালকের প্রশংসা করতে করতে আকাশে তুলে দেয়া এবং পক্ষান্তরে মাটিতে আছড়ে ফেলার চূড়ান্ত বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বিস্ময়করই বটে। বিস্তৃত বড় পর্দাকে মানে ফ্রেমকে চিত্রশিল্পীর ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা চলে নিশ্চয়ই। পল্লীগ্রামের ছবির নেপথ্যে অবারিত আকাশের নিচে উঁচু পাহাড়ের স্থিতি সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা আনে। এমন লোকেশন নির্বাচনের বিচক্ষণতার প্রশংসা করব।

প্রতিটি শিল্পেরই নিজস্ব ভাষা রয়েছে। চলচ্চিত্রের ভাষা পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন ভালো রপ্ত করেছেন, এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। প্রায়োগিক শিল্পশাখার ভেতর চলচ্চিত্র হলো সেই মাধ্যম যেটির থাকে বহুমুখী টিম এবং কোনো একটি টিমের কাজে দুর্বলতা রয়ে গেলে চলচ্চিত্রটি প্রত্যাশিত মান অর্জনে সমর্থ হয় না। যোগ্য পরিচালক যেমন শিল্পযাত্রার প্রধান নাবিক, কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব তারই হাতে, তেমনি তিনি সব টিমের সমন্বয়কারী এবং তার ভূমিকা সব ছোট ছোট টিমের কাছ থেকে সর্বোচ্চ কাজ আদায় করে নেয়া। চলচ্চিত্রে চোখে দেখার একটা শান্তি থাকবে; প্রকট হয়ে উঠবে না ক্যামেরার কাজ, বরং দৃশ্যের সহগামী থাকবে; নেপথ্যে যে সুর বাজবে সেটি দৃশ্যের ভাবের সঙ্গে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ; অভিনয় হবে যথাযথ, বিশ্বাসযোগ্য; আলোর ব্যবহার হবে পরিমিত, এই তো। সর্ববিচারেই রইদ মানোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের সিনেমা এফডিসি যুগ থেকে শত শত মাইল সামনে এগিয়ে গেছে, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বলা দরকার, সিনেমার শেষার্ধের শেষাংশে, ঘুমন্ত সন্তানসম্ভবাকে প্রাণিজগতের জননীসুলভ মহিমা দানের দৃশ্য থেকেই বাস্তব পরাবাস্তব জাদুবাস্তব, সব একাকার হতে থাকাটাই মুভিতে শিল্পের চূড়ান্ত আরোহন। এসব উপভোগ ও অনুধাবনের জন্যে বুঝি শিল্পীমনও জরুরি। 

গাঁয়ের পাগলি, চাষাভুষো জেলে রাখাল, দেখেও যাদের আমরা দেখি না, যারা প্রায় অদৃশ্য, সেইসব চরিত্রকে গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে রূপালি পর্দায় তুলে আনার জন্য পরিচালক অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন।