শিল্প ও সাহিত্য

বিস্মৃতির অতলে কবি শেখ ফজলল করিম

উজ্জল জিসান, লালমনিরহাট থেকে ফিরে : কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর?মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক মানুষেতে সুরাসুর।রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয়,আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনি পুড়িতে হয়।প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে মিলি যবে পরস্পরে,স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।কবি শেখ ফজলল করিমের ‘স্বর্গ ও নরক’ শিরোনামের কালজয়ী এই কবিতাটি ১৩২১ বঙ্গাব্দে ভারতবর্ষ-এর আষাঢ় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পর থেকেই তিনি ‘কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক?’ কবিতার কবি হিসেবে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে পাঠকপ্রিয় এই কবিতাটি বঙ্গবাণী ও ও মালঞ্চ-তেও স্থান পায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা পাঠ্যসূচিতেও তার কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।কথা হচ্ছিল কবি শেখ ফজলল করিমের বংশধর তার নাতি ওয়াহেদুন্নবীর(৭৪) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দাদুর লেখা ৩৭টি পাণ্ডুলিপি আমার সংগ্রহে রয়েছে। গত বছর জলপাইগুড়ি গিয়েছিলাম। সেখানে দেখে এসেছি তারা ৪৯টি লেখা সংগ্রহ করে রেখেছেন। তাদের পাঠ্যবইয়ে কবির অনেক লেখা এখনও পড়ানো হয়।’  কবি শেখ ফজলল করিমের জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি বাংলা ১২৮৯ সনের ৩০ চৈত্রের শেষ রাতে জন্মগ্রহণ করেন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ থানার কাকিনা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। কবি পরলোকগমন করেন ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে। কবি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন কাকিনায় তার বাসভবনের সামনে পারিবারিক গোরস্থানে। কবির একমাত্র সন্তান মরহুম মতিয়ার রহমানের বড় ছেলে ওয়াহেদুন্নবী কবির কবর রক্ষণাবেক্ষণসহ সযত্নে আগলে রেখেছেন কবির পবিত্র দাড়ি মুবারকের কিছু অংশ, তার বসার চেয়ার, বিশ্রামের খাট, দোয়াত-কলম, টুপি, কাঁসার গ্লাস, তিনটি মেডেল, কবির লেখা দুটি ডায়েরি, একটি কুর্তাসহ কয়েকটি বোতাম। এ ছাড়া এখনো রয়েছে কবির পঠিত একটি ছোট কোরআন শরিফসহ ম্যাগনিফাইং গ্লাস। কবি শেখ ফজলল করিম জীবিত ছিলেন ৫৩ বছর। তিনি লেখালেখি শুরু করেন মাত্র ১২ বছর বয়সে। এ সময় তিনি ‘সরল পদ্য বিকাশ’ নামে একটি শিশুপাঠ্য কবিতার বই প্রকাশ করেন। ফলে সেই বাল্যকালেই তার কবিশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। এরপর থেকে একে একে তিনি লিখেছেন তৃষ্ণা, পরিত্রাণ, অগ্রবীণা বা ইসলাম চিত্র, লাইলি-মজনু, মহর্ষি হযরত খাজা মইনউদ্দীন চিশতি (রহঃ), মুন্সী মেহেরুল্লাহ্ শোক গাথা, রাজা মহিমারঞ্জন শোকগাথা, সরদার বংশ চরিত, মুন্সী মোহাম্মাদ সাহেবের স্বর্গাবোহানে মর্মগাথা, মহর্ষি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ), পরশমণি (হজরত জীবনী), ছোটদের কবিতা উচ্ছ্বাস, রাজর্ষি মহিমারঞ্জন, মাথার মণি, রাজা মহিমা রঞ্জনের পশ্চিম ভ্রমণ, পান্থশালা, আফগানিস্তানের ইতিহাস, ভক্তি পুষ্পাঞ্জলি, পথ ও পথের গাথা, হারুন-অর-রশীদের গল্প, চিন্তার চাষ, সোনার জাতি, বিবি খাদিজা, প্রেমের স্মৃতি, যীশুখ্রিষ্টের জীবনী সমালোচনাসহ বিভিন্ন গ্রন্থ। ওমর খৈয়ামের অনুবাদও তিনি করেছেন। লিখেছেন ছেলেদের শেক্সপিয়ার। তবে তার অনেক পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত অবস্থায় রয়ে গেছে। অনেক পাণ্ডুলিপি কলকাতার নূর লাইব্রেরিতে প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল। হয়তো এখনো সেই অবস্থাতেই রয়েছে। খোঁজ করলে সেই পাণ্ডুলিপিগুলোর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।কবি ফজলল করিমের সাহিত্যকর্মে রয়েছে সুফিবাদের সুর। তার সম্পর্কে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অগণিত সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের ধারণা যে কতটা উজ্জ্বল তা কবির বাড়িতে সংরক্ষিত পরিদর্শন খাতা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু কবির রেখে যাওয়া সবকিছু অযত্নে অবহেলায় পড়ে রয়েছে।রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ অক্টোবর ২০১৪/জিসান/তাপস রায়/কমল কর্মকার