ঈশা খাঁ। বাংলার ইতিহাসে একজন প্রতাপশালী জমিদার। তিনি বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম বীর। তাঁর অরক্ষিত সমাধি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিবলী সাদিক। সম্প্রতি তিনি উপজেলার বক্তারপুরে সমাধি স্তম্ভ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
জানা গেছে, উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ হবে। সাড়ে ১৭ ফুট উঁচু এবং ২৪ ফুট প্রস্থের স্তম্ভটি লাল সিরামিক ইট দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, ঈশা খাঁর কবরটি দীর্ঘ দিন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির হিসেবে এলাকাবাসী জানতো। ৩৫-৪০ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বক্তারপুর গ্রামে এসে কবরটি ঈশা খাঁর সমাধি বলে চিহ্নিত করেন। স্থানীয়রা বেড়া দিয়ে কবরটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেন। বক্তারপুর দুর্গের অস্তিত্ব আর এখন নেই। মাটি খুঁড়লে প্রাচীন ইট বের হয়। দিঘিটি প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। ঈশা খাঁর কবরের স্থানটি একটু উঁচু ঢিবির মতো ছিল। পূর্বপুরুষরা বলে গেছেন, এটি পবিত্র স্থান। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ স্থানটি খনন করে। প্রাচীন ইট ও কবর আকৃতির সমাধি আবিষ্কৃত হয়। পরে তারা জানায় যে, এটি ঈশা খাঁর সমাধিস্থল।
বক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মু. আতিকুর রহমান আকন্দ বলেন, ৩০-৩৫ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বক্তারপুর পুরনো দিঘির পশ্চিম পাড়ে থাকা কবরটি ঈশা খাঁর সমাধি বলে চিহ্নিত করে। এরপর ২০০৪ সালে প্রথম উপজেলা প্রশাসন দেয়াল তুলে কবরটি ঘিরে দেয়। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কবরটির চারদিকে ইটের দেয়াল এবং উপরে লোহার বেড়া দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েক মাস আগে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম ঈশা খাঁর সমাধিস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সমাধিতে যাওয়ার মাটির সড়কটি সংস্কার করার নির্দেশ দেন। পরে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি ১০ ফুট প্রশস্ত করে সংস্কার করে গাড়ি যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে উপজেলা প্রশাসন। এখন সমাধি স্তম্ভ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শিবলী সাদিক বলেন, ঈশা খাঁর অরক্ষিত সমাধিটি সংরক্ষণ করতে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস. এম. তরিকুল ইসলাম স্যার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্মাণ কাজ শেষ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঈশা খাঁর বীরত্বের ইতিহাস এবং বাংলায় তাঁর অবদান ফুটে উঠবে।
উল্লেখ্য, ঈশা খাঁ ১৫৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন ঈশা খাঁ। ন্যায়পরায়ণ শাসক ও বীরত্বের প্রতীক হয়ে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। মুসলিম এ শাসকের রাজধানী ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়। মোগল শাসকদের সঙ্গে তাঁর একাধিক যুদ্ধ হয়েছিল। জীবনের শেষ দিকে সোনারগাঁয় ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি অবস্থান নেন গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর দুর্গে। সেখানে একজন প্রখ্যাত হেকিমের চিকিৎসা গ্রহণকালে ৭০ বছর বয়সে ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় তাঁর।
শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় বক্তারপুর দুর্গের দিঘির পশ্চিম পাড়ে। কালের পরিক্রমায় অযত্ন-অবহেলায় একসময় হারিয়ে যায় সমাধিচিহ্ন। তাঁর বীরত্ব, শাসন, মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মপরায়ণতা নিয়ে নানা জল্পনা ও কল্পকাহিনি থাকলেও ইতিহাসের কোথাও তাঁর সমাধিস্থলের কথা উল্লেখ নেই। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দীর্ঘ দিন অনুসন্ধান করে বক্তারপুরের ধ্বংস হয়ে যাওয়া দুর্গে একটি প্রাচীন সমাধির সন্ধান পায়। নানা তথ্য-উপাত্ত ও ইতিহাস বিশ্লেষণ শেষে প্রত্নতত্ত বিভাগ নিশ্চিত হয় যে সমাধিটি ঈশা খাঁর।