১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর ছিল মঙ্গলবার। অগ্নিঝরা এ দিনে ভাটি বাংলার অন্যতম অকুতোভয় গেরিলা কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাস (শ্যাম) হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার নিজ জন্মস্থান জলসূখা থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে বদলপুর গ্রামের দক্ষিণে কৈয়ারবিলে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে এক সহযোদ্ধাসহ মৃত্যুবরণ করেন।
আজমিরীগঞ্জবাসীর কাছে অকুতোভয় এই গেরিলা কমান্ডার আজো কিংবদন্তী। দিবসটি উপলক্ষে আজমিরীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ঐতিহাসিক বদলপুর যুদ্ধ, বীর উত্তম জগৎজ্যোতি দাস’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা।
মুক্তিযুদ্ধে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনে বিস্তীর্ণ ভাটি অঞ্চল শত্রুমুক্ত রাখার দায়িত্ব পড়েছিল তার উপর। দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার নৌপথ পাক দখলমুক্ত রাখার যুদ্ধে প্রাণ বাজি রেখে লড়ে যান দাস কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা। এসব অঞ্চলে তিনি ছিলেন পাক বাহিনীকে দলিত-মথিত করে এগিয়ে যাবার অগ্রপথিক। শুধু তার সাহসী অভিযানের কারণে পাকিস্তান সরকার রেডিওতে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়, ‘এই রুট দিয়ে চলাচলকারী ব্যক্তিদের জানমালের দায়িত্ব সরকার নেবে না’।
মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধা নিয়ে বানিয়াচংয়ে পাক বাহিনীর ২৫০ সেনা ও দোসরদের অগ্রগতি রোধ করে দেন, যুদ্ধে প্রাণ হারায় পাক বাহিনীর ৩৫ সেনা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আল বদরদের কাছে জগৎজ্যোতি ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। পাক বাহিনীকে পরাভূত করতে বিশাল ভাটিবাংলায় দাবড়ে বেড়িয়েছেন তিনি।
১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর জগৎজ্যোতি জানতেন না এই দিনে তার অন্তিম অভিযান পরিচালিত হবে। জগৎজ্যোতি ও তার সঙ্গীদের লক্ষ্যস্থল ছিল বাহুবল মতান্তরে বানিয়াচং। কিন্তু লক্ষ্যস্থলে যাবার আগেই বদলপুর নামক স্থানে হানাদারদের পাতা ফাঁদে পা দেন জগৎজ্যোতি। বদলপুরে ব্যবসায়ীদের নৌকা আটক করে চাঁদা আদায় করছিল ৩-৪ জন রাজাকার। দেখতে পেয়ে ক্ষুব্ধ জ্যোতি রাজাকারদের ধরে আনার নির্দেশ দেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেই পিছু হটতে থাকে কৌশলী রাজাকাররা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন জগৎজ্যোতি, ভাবতেও পারেননি কী ফাঁদ তার সামনে। সঙ্গী ১০-১২ জন মুক্তিযোদ্ধা আর সামান্য গোলাবারুদ নিয়ে তাড়া করেন রাজাকারদের। অদূরেই কুচক্রী পাকসেনাদের বিশাল বহর আর প্রচুর সংখ্যক গোলাবারুদ নিয়ে অপেক্ষা করছিল তার।
অজান্তেই চক্রব্যুহে প্রবেশ করেন জগৎজ্যোতি। আগে থেকে প্রস্তুত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিশাল বহরের ফাঁদে পড়ে যান জগৎজ্যোতি ও তার সহযোদ্ধারা। শাল্লা উপজেলা সদর ঘুঙ্গিয়ারগাঁও থানায় পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে রাজাকার আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে ‘দাস কোম্পানি’।
তারা যুদ্ধ করতে থাকেন একটানা, কিন্তু হঠাৎ সহযোদ্ধা ইলিয়াস পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন। জ্যোতি পিছু না হটে তার মাথার লাল পাগড়ি খুলে শক্ত করে ইলিয়াসের বুকে এবং পিঠে বেঁধে দেন, যাতে তার রক্তক্ষরণ থেমে যায়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বিকেলে জগৎজ্যোতি দাস নতুন ম্যাগজিন লোড করে পজিশন নিয়ে শত্রুর অবস্থান দেখার জন্য মাথা উঁচু করতেই একটি বুলেট তার বুকে বিদ্ধ হয়। জগৎজ্যোতি তখন ‘আমি আর নাই, আমি গেলাম’ বলে কৈয়ারবিলের পানিতে ডুবে যান।