বাবা হারা, বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান রফিকুল ইসলাম এমন চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়বেন কে জানতো! ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়ে দিন মজুর মায়ের কষ্ট লাঘব করতে চেয়েছিলো যে সন্তান, সে নিজেই এখন বিছানায়।
একটি পা তার অস্বাভাবিক। এই পা তিনি আর বহন করতে পারছেন না। এই পা তার কাছে অভিশপ্ত। এই পায়ের জন্য তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারছেন না।
চিকিৎসক বলছেন তিনি ‘নিউরোফাইড্রোমা’ নামক রোগের কারণে তার এই দশা। এখন তার দিন কাটছে হাসপাতালের বেডে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রফিকুলের জীবন। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আকুলতায় পাংশা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেডে শুয়ে রাইজিংবিডিকে শুনিয়েছেন তার স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের কথা।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চরঝিকড়ি গ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে মেধাবী রফিকুল ২০১৫ সালে এসএসসি ও ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এরপর ভর্তি হন ডা. কাজী মোতাহার হোসেন ডিগ্রি কলেজে। কিন্তু নিউরোফাইড্রোমায় আক্রান্ত হয়ে থেমে গেছে তার শিক্ষাজীবন।তবে চিকিৎসকেরা বলেছেন উন্নত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন রফিকুল।
যেখানে অন্যের বাড়িতে কাজ করে দু’বেলা দু’মুঠো আহার জোগাড় করেন রফিকুলের মা, সেখানে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার অর্থ জোগাবেন কী করে।
রফিকুলের মা বলেন, ছোট সময় রফিকুলের পা একটু মোটা ছিল। সেই থেকে আস্তে আস্তে পায়ের মাংস বাড়তে থাকে। একসময় একা একা চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে যায়। এই অবস্থাতেই রফিকুল এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে। কিন্তু বর্তমানে তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে, চিকিৎসা ছাড়া তার ভালো থাকার কোন উপায় নেই। এজন্য ভালো চিকিৎসার দরকার। আমার সামর্থ্য নেই রফিকুলকে ভালো চিকিৎসা করানোর।
তিনি সমাজের বিত্তবান ও সরকারের প্রতি ছেলের দুরাবস্থায় পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তার স্বপ্ন তার ছেলেটা সুস্থ হয়ে আবার কলেজে ভর্তি হবে। সমাজের অন্য দশজন মানুষের মত বেঁচে থাকবে এবং পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবে।
অসুস্থ রফিকুল জানান, ২০০৯ সালে প্রথম ঢাকার মিডএইড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। সেখান থেকে অর্থাভাবে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সাভারের ফাইলেরিয়া হাসপাতালে যান। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। এরপর বেশি অসুস্থ বোধ করলে অর্থাভাবে ভাল কোন হাসপাতালে না যেতে পেরে ২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাজবাড়ী পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাসপাতালে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন।
পাংশা উপজেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার তরুণ কুমার পাল বলেন, রফিকুলের বাম পায়ে বড় আকারের সোয়েলিং হয়েছে। প্রথম দিকে তারা ভেবেছিলে গোদ রোগ। ঢাকা থেকে চিকিৎসক বেনজির স্যার এসে দেখে বলেছেন এটি নিউরোফাইড্রোমেটাসিসের সিমটম। এই রোগের উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে অপারেশন করাতে পারলে ভাল হতে পারে। এ জন্য ঢাকা মেডিক্যালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসা প্রয়োজন। এই রোগের কারণে দীর্ঘ সময় সে বসে থাকায় আলসার দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, রফিকুলের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা বহনের সক্ষমতা ওদের নাই। অনেকে কম বেশি সহযোগিতা করছে, কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত না। সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে চিকিৎসা নিয়ে হয়তো রফিকুল সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরতে পারবে।
পাংশা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক এসএম রাসেল কবির বলেন, রফিকুল অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। রফিকুল এখন ধীরে ধীরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়েতো আবার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন।