সারা বাংলা

সীমান্তে থামছে না বিএসএফের বুলেট 

সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ২০২৫ সালে লালমনিরহাট সীমান্ত ছিল রক্তাক্ত। বিদায়ী এই বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন দুই বাংলাদেশি যুবক এবং বুলেটের ক্ষত নিয়ে পঙ্গুত্ব হয়েছেন আরো অন্তত চারজন। দফায় দফায় পতাকা বৈঠক আর বিজিবির কড়া প্রতিবাদের পরও ভারতের ‘নন-লেথাল ওয়েপন’ বা প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র ব্যবহারের আশ্বাস কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

২০২৫ সালের শেষপ্রান্তে এসে গত ৪ ডিসেম্বর ভোরে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার জগৎবেড় ইউনিয়নের শমসেরনগর (পচাভান্ডার) সীমান্তে বিএসএফের বুলেটে প্রাণ হারান সবুজ মিয়া (৩০)। সিরাজুল ইসলামের ছেলে সবুজের নিথর দেহ সীমান্তে পড়ে থাকার দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। বিএসএফ প্রথমে মরদেহটি ভারতের অভ্যন্তরে টেনে নিয়ে গেলেও বিজিবির তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তা ফেরত দিতে বাধ্য হয়। এই হত্যাকাণ্ডে গোটা সীমান্ত এলাকায় শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। 

এর আগে গত ১৭ এপ্রিল হাতীবান্ধা উপজেলার সিংগীমারী সীমান্তে বিএসএফের নির্মমতার শিকার হন ২২ বছরের তরুণ হাসিবুল ইসলাম। অভিযোগ আছে, নিজের জমিতে ঘাস কাটার সময় তাকে লক্ষ্য করে বিএসএফ সদস্যরা গুলি চালায়। আহত অবস্থায় তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ভারতের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। একজন সাধারণ কৃষকের ওপর এমন নির্বিচার গুলিবর্ষণ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। 

হত্যার পাশাপাশি এ বছর বিএসএফের গুলিতে অঙ্গহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ছিল উদ্বেগজনক। গত ১০ নভেম্বর শ্রীরামপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একযোগে ৩ বাংলাদেশি আহত হন। বছরের শুরুতে ১১ জানুয়ারি জগতবেড় সীমান্তে বিএসএফের ছররা গুলিতে রক্তাক্ত হন শহিদুল ইসলাম নামে এক যুবক। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। 

বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ঘটনার পর বিএসএফকে কড়া প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে এবং সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত টহলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সীমান্তবাসীদের দাবি, গরু পাচার বা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি চালানো কখনোই সমাধান হতে পারে না। 

সীমান্ত সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তে হত্যা বন্ধে কেবল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকই যথেষ্ট নয়, বরং ভারতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন প্রয়োজন। ২০২৫ সালের পরও লালমনিরহাটের আকাশে-বাতাসে রয়ে গেছে স্বজনহারাদের কান্নার সুর।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম কামাল বলেছেন, “সীমান্তে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ যখন বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারায়, তখন তা কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং তা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। আমরা কারো সাথে বৈরিতা চাই না, কিন্তু বন্ধুত্বের নামে সীমান্তে লাশের মিছিলও মেনে নেব না। বিএসএফ-কে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে; এখন সময় এসেছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। জনতার দল ক্ষমতায় গেলে বা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলে আমরা নিশ্চিত করব, যেন একজন বাংলাদেশির রক্তও সীমান্তে বৃথা না যায়। দেশের এক ইঞ্চি জমিও আমরা অনিরাপদ থাকতে দেব না।”

সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবির অবস্থান ব্যাখ্যা করে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেছেন, “সীমান্তে প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সব সময় সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছে। আমরা বিএসএফের সাথে প্রতিটি স্তরের বৈঠকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়েছি যে, নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানো কোনো সমাধান হতে পারে না। আমরা তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি এবং পাল্টা প্রতিশ্রুতি আদায়ের চেষ্টা করছি, যাতে তারা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে চলে এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে।”

তিনি আরো বলেন, “সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কেবল প্রতিবাদপত্রেই সীমাবদ্ধ নই, বরং সমন্বিত টহল এবং আধুনিক নজরদারি বৃদ্ধি করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো—সীমান্তের সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং তাদের জীবন রক্ষা করা। বিজিবি সব সময় সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে আছে এবং থাকবে। আমরা সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে একটি রক্তপাতহীন সীমান্ত বিনির্মাণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”