সারা বাংলা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বছরজুড়ে ডিএনসি ফেনসিডিল উদ্ধার করেছে ৫৮৮ বোতল

ভারত সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ দীর্ঘকাল ধরেই মাদক পরিবহনের নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে জেলার প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত মাদক চোরাকারবারিদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

এই অরক্ষিত পথ দিয়ে প্রতিদিন ফেনসিডিলসহ নানা মরণঘাতী মাদক দেশে ঢুকছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার বিপরীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) জেলা কার্যালয় যে বার্ষিক পরিসংখ্যান পেশ করেছে, তা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক পরীসংখ্যানে দেখা গেছে, সংস্থাটি ২০২৫ সালে ১ হাজার ১৫০টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় তারা উদ্ধার করতে পেরেছে মাত্র ৫৮৮ বোতল ফেনসিডিল। এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর খোদ সরকারি সংস্থার কাজের গতি, আন্তরিকতা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। 

সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ৪২১টি মামলা দায়ের ও ৪৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের প্রায় সবাই মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতা। অভিযোগ উঠেছে, মূল হোতারা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নথিতে ফেনসিডিল ছাড়াও আরো ১৩ ধরনের মাদক ও সরঞ্জাম উদ্ধারের তালিকা দেওয়া হয়েছে। গেল বছরজুড়ে ৩ কেজি ৮১৩ গ্রাম হেরোইন, ৪ হাজার ১৩৩ পিস ইয়াবা, ৬৪ কেজি ৬৩১ গ্রাম গাঁজা এবং ৩০২ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়েছে। মাদক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ১৪০০ লিটার ওয়াশ এবং মাত্র ৪০ অ্যাম্পুল ইনজেকশন জাতীয় মাদক বুপ্রেনরফিন জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে মাদক বিক্রির নগদ ২৩ লাখ ১০ হাজার ৭৯৫ টাকা এবং আলামত হিসেবে সাতটি মোবাইল ফোন, দুটি অটো ভ্যানগাড়ি ও একটি সিলার মেশিন উদ্ধার করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাঁটাতারবিহীন চৌকা সীমান্ত

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কুকড়িপাড়া, চৌকা ও কিরণগঞ্জ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শুধু রাত নয়, কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত দিয়ে দিনের আলোতেও অনেক সময় মাদক পাচার হয়। তাদের দাবি, ফেনসিডিলের চালানগুলো যখন দেশের ভেতরে ঢোকে, তখন সেগুলো কয়েক হাজার বোতলের লট হিসেবে আসে। 

শিবগঞ্জ উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আখতার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যুবসমাজ মাদকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ ডিএনসির কচ্ছপ গতির কার্যক্রম অপরাধীদের আরো উৎসাহিত করছে। মাদক নির্মূল করতে হলে লোক দেখানো অভিযানের চেয়ে মাদক সিন্ডিকেটের মূলে আঘাত করা জরুরি।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা তৌহিদ আলম বলেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় হাত বাড়ালেই ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরণের মাদক পাওয়া যায়। যে জেলার সীমান্ত দিয়ে এতো এতো মাদক ঢুকে; সেই জেলায় মাত্র ৫৮৮ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের বিষয়টি হাস্যকর।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব মুনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, জেলায় মাদকের বন্যা বইছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সারা বছর মিলে মাত্র ৫৮৮ বোতল ফেনসিডিল ধরল। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, তাদের গোয়েন্দা নজরদারি অত্যন্ত দুর্বল।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে বলেন, “প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের জনবল কম। মাত্র একটি গাড়ি দিয়ে পুরো জেলার কাজ চালাতে হচ্ছে। সীমিত লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়েও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। গত বছর বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও ৩ কেজির বেশি হেরোইন উদ্ধার হয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় অর্জন।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সীমান্তে দিয়ে মাদক চোরাচালান হয়।  দায়িত্বপূর্ণ এলাকার সীমান্ত সুরক্ষাসহ যেকোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম রোধে আমাদের বিজিবি সদস্যরা সবসময় তৎপর রয়েছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া বলেন, “অস্ত্র, গোলাবারুদ, মাদক এবং চোরাচালানের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সীমান্ত এলাকায় অপারেশনাল কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ টহল পরিচালনা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।”