২৫০ শয্যার ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্না করাসহ নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার ঘটনায় এবার তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের গঠন করে দেওয়া কমিটি।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) তদন্ত কমিটির প্রতিনিধিরা ফেনীর হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরিদর্শন করেন এবং নার্স ও চিকিৎসকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব রয়েছেন ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রাজিব আহমেদ চৌধুরী এবং ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম, যিনি কমিটির সদস্য সচিব।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অপারেশন থিয়েটারে রান্না করাসহ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির সুপারিশ করতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয় থেকে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৫০ শয্যার ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রোকন উদ দৌলা বলেন, “তদন্ত টিম নিরপেক্ষভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী যাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার মনে করেছেন, নিজেরাই কথা বলেছেন। এ প্রক্রিয়ায় আমরা সম্পৃক্ত ছিলাম না।”
ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) নির্দেশনায় গঠিত কমিটির দায়িত্ব নিয়ে আমরা ফেনী জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং ঘটনাস্থল সরেজমিনে ঘুরে দেখেছি। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় এখনই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।”
ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, “আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার চেষ্টা করেছি। প্রথম দিনের পরিদর্শনেই মাঠপর্যায়ের তদন্ত শেষ হয়েছে। এখন প্রতিবেদন লিখে জমা দেওয়ার কাজ বাকি রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগির প্রতিবেদন জমা দিতে পারব। তদন্তে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।”
শনিবার (১১ জানুয়ারি) নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পৃথক দুই আদেশে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার কল্পনা রানী মণ্ডল ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রানী বালা হালদারকে সাময়িক বরখাস্তের খবর প্রকাশের পর তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন হাসপাতালের সেবাপ্রত্যাশীরা।
সেবাপ্রত্যাশী আবু নাঈম বলেন, “পানি বরাবর নিচের দিকে বয়। তড়িঘড়ি করে মাত্র দুজন নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য বিভাগ কি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে? দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্না চলেছে। এটি দায়িত্বরত চিকিৎসক, হাসপাতালের আরএমও ও তত্ত্বাবধায়ক জানতেন না- এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নার্সদের শাস্তি হলে তারাও কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।”
ফারহানা আক্তার নামে আরেক সেবাপ্রত্যাশী বলেন, “অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্নার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের দিনই গ্যাসের চুলা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এত বড় ঘটনার তদন্ত শুরুর আগেই কার নির্দেশে আলামত নষ্ট করা হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।”
তাদের অভিযোগ, শুধু দুজন নার্সকে শাস্তি দিয়ে এত বড় অনিয়মের দায় শেষ করা যায় না।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, “আমরা কারো দ্বারা প্রভাবিত হব না। সুষ্ঠু তদন্ত শেষে এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সকলের বিরুদ্ধেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে।”
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গ্যাসের চুলায় রান্না, অবাধ যাতায়াত ও শৃঙ্খলাহীনতার কারণে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের সংক্রমণের উচ্চঝুঁকি নিয়ে রাইজিংবিডি ডটকমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরপর কর্তৃপক্ষের নেওয়া একের পর এক পদক্ষেপের খবর আসছে।
খবর প্রকাশের পরদিন হাসপাতালের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি করে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা।
রবিবার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আনোয়ার হোসেন আকন্দের সই করা পৃথক আদেশে দুই সিনিয়র স্টাফ নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিভাগীয় পর্যায়ের কমিটির তদন্তের কী তথ্য উঠে আসে, সেটিই দেখার বিষয়।