কটিয়াদি ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-২ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে একই পরিবারের দুই সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে এই পরিবারের প্রার্থী এবং তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ করছেন ভোটাররা।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এ আসনটি শুধু কটিয়াদি উপজেলা নিয়েই গঠিত ছিল। এরপর পাকুন্দিয়া উপজেলাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। জাতীয় সংসদে এটি ১৬৩ নম্বর আসন।
এই আসনে বিএনপি থেকে একসময়ের হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন দুবারের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান। তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসাবে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (জুন) সালে কটিয়াদি আসন থেকে জয়লাভ করেন। দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক এই সংসদ সদস্য পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। বর্তমানে জামায়াতের পক্ষে বিভিন্ন টক শোতে তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।
সম্প্রতি আখতারুজ্জামান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। এ নিয়ে এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তার অনুসারীদের অনেকেই হতাশ হয়েছেন। আবার মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছেন অনেকে। তবে, জামায়াতে যোগদান করলেও এবার তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। সরাসরি ভোট না করলেও তিনি ভোটের মাঠও ছেড়ে যাননি। মাঠেই আছেন।
আখতারুজ্জামান বলেন, “আমি নিজে এবার নির্বাচন করছি না। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যে কেউ নির্বাচন করতে পারে। সে হিসাবে আমার ছেলে ও ভাই নির্বাচন করছেন, এটি দোষের কিছু না। আমাদের পরিবার সবসময় মানুষের কল্যাণে কাজ করেছে। ভোটের মাঠে নির্বাচিত হয়ে যিনিই আসুক, তিনি যেন সবার উন্নয়নে কাজ করেন সেটাই প্রত্যাশা।”
কিশোরগঞ্জ-২ আসনে এবারের নির্বাচনে আখতারুজ্জামানের বড় ছেলে শাহরিয়ার জামান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। প্রার্থী হয়েছেন আখতারুজ্জামানের বড় ভাই সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুজ্জামান খোকনও। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন।
এই আসনে দুজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এরপর থেকে চাচা-ভাতিজার রাজনৈতিক অবস্থান এলাকার ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডায় মানুষের মুখে মুখে এখন তাদের নিয়ে আলোচনা।
ভোটাররা জানান, একই পরিবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্নতা থাকায় এ আসনে নির্বাচন জমে উঠতে পারে। আখতারুজ্জামান নির্বাচন না করলেও তার একটি প্রভাব থাকবে। কারণ এক সময় তিনি এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন। তাছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি বেশ পরিচিত। ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি এলাকায় আলোচনায় থাকবেন। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হতে আরো কিছু দিন সময় লাগবে।
আনিসুজ্জামান খোকন বিএনপি থেকেই ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ-১৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সহ-সম্পাদক। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে কর্নেল আবু তাহেরের অধীনে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেন।
ছাত্রজীবনে ১৯৭০ সালে তিনি সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আনিসুজ্জামান খোকন বলেন, “আমি দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আমি দীর্ঘ সময় ধরেই জড়িত। একটি নতুন ধারার রাজনীতি ও পরিবর্তনের জন্যই আমি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে আখতারুজ্জামানের বড় ছেলে শাহরিয়ার জামান বলেন, “আমাদের পরিবারের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আমার বাবা একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সম্প্রতি তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। আমার বড় চাচা এই আসন থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন। এতে আমি কোনো সমস্যা দেখছি না। ভোটাররাই তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেবেন।”
তিনি বলেন, “আমি যেহেতু এখানে মনোনয়ন পেয়েছি। ভোটের মাঠে আমি কোনো সমস্যাই দেখছি না। আমি নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।”
কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে জেলা কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিনকে। তিনি এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে এখানে প্রার্থী হয়েছেন মাওলানা শফিকুল ইসলাম মোড়ল। তিনি কটিয়াদি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আখতারুজ্জামান, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির হাবিবুর রহমান দয়াল, ২০০১ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ডা. আবদুল মান্নান, ২০১৪ সালে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নূর মোহাম্মদ ও ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ-২ আসনে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৯৪ হাজার। নারী ও পুরুষ ভোটার প্রায় সমান। এখানে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন পাঁচজন।