ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশালের ৬টি আসনেই জনসংযোগ চালাচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত জোট ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
তবে নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী মাঠও তেমনি বদলাচ্ছে। সদ্য ঘোষিত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে আসার পরপরই বরিশালের নির্বাচনী এলাকায়ও এর কিছুটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এর আগে বরিশালের প্রতিটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে ইসলামী দলগুলো প্রার্থীরা সমানে সমান টক্কর দিলেও ধীরে ধীরে বিএনপি তাদের আসনগুলো পুনরুদ্ধারে আরো বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে। এর পরও বরিশাল সদর-৫ আসনসহ অন্যান্য আসনগুলোতে নির্বাচনে সমানে সমান টক্কর দেওয়ার চেষ্টা করবে ইসলামী দলসহ সতন্ত্র প্রার্থীরা। বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অব্যাহত থাকায় আশার আলো দেখছেন বিরোধী দলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির প্রয়াত সাবেক চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দীন স্বপন। নির্বাচনী মাঠে তিনি ব্যাপক জনসংযোগ চালাচ্ছেন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আগৈলঝাড়া উপজেলা ও গৌরনদী উপজেলার প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে ভোট চাইছেন স্বপন।
তবে এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জহির উদ্দীন স্বপনের বিজয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজ দল বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় ভোটাররা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রায় ৭০ ভাগ ভোটই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
২০০১ সালের নির্বাচনে জহির উদ্দীন স্বপন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় আগৈলঝাড়া উপজেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এ হামলার জন্য স্বপনকেই অভিযুক্ত করেন অনেকে। তবে হামলা ও নির্যাতনের সময় সংখ্যালঘুদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। যে কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার পরও আগৈলঝাড়া উপজেলায় সোবাহানকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন অধিকাংশ সংখ্যালঘু।
এছাড়া গৌরনদী উপজেলায়ও সোবাহানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে বলে জানান স্থানীয় ভোটাররা। ফলে সোবাহান নির্বাচনী মাঠে টিকে থাকলে অনেকটাই চাপে পড়বেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জহির উদ্দীন স্বপন। এমনকি স্বপনের বিজয় রথ থামিয়ে দিয়ে চমক দেখাতে পারেন সোবাহান- এমনটা মনে করছেন অনেকেই।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী কামরুল ইসলাম খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. রাসেল সরদার ও জাতীয় পার্টির সেরনিয়াবাত সেকেন্দার আলীও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তারাও যে যার মতো জনসংযোগ চালাচ্ছেন।
এ ক্ষেত্রে ইসলামী দলগুলোর একক প্রার্থী হলে বিএনপি- বিএনপির বিদ্রোহী এবং ইসলামী দলীয় জোট প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার আশংঙ্কা রয়েছে।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) সংসদীয় আসনে প্রার্থীর ছড়াছড়ি। এ আসনে বিএনপির এস সরফুদ্দীন আহম্মেদ সান্টু, জামাতের আব্দুল মান্নান, জাতীয় পার্টির (জেপি) আ. হক, জাতীয় পার্টির (জাপা) এম এ জলিল, খেলাফত মজলিসের মুন্সি মোস্তাফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ নেছার উদ্দীন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের মো. তারিকুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের রঞ্জিত কুমার বাড়ৈ এবং এনপিপির সাহেব আলীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে বরিশাল জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন।
তবে মনোনয়নপত্রে দলীয় প্রধানের সই না থাকায় বাংলাদেশ জাসদের মনোনীত প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তবে তিনি প্রার্থীতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন।
এ আসনে মূলত বিএনপির বিপরীতে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নেই। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এস সরফুদ্দীন আহম্মেদ সান্টু নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়। নির্বাচনী এলাকায় তিনি নিজ খরচে তিনটি কলেজ স্থাপন করে এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে অবদান রেখেছেন। এছাড়া নিজ বাড়ি গুঠিয়ায় নির্মাণ করেছেন দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন গুঠিয়া বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও গুঠিয়া আইডিয়াল কলেজ। শিক্ষা বিস্তারে এবং অসহায় মানুষের সহায়তায় তাঁর ব্যাপক সুনাম। যে কারণে নির্বাচনী এলাকায় বেশ প্রভাব রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ জাসদের মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বাদল একজন সৎ ও সুপরিচিত মানুষ। এর আগে তিনি ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে সাধারণ মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হন। প্রার্থীতা ফিরে পেলে তার সঙ্গে বিএনপি প্রার্থী এস সরফুদ্দীন আহম্মেদ সান্টু ও জামায়াত প্রার্থী আব্দুল মান্নানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
বরিশাল-৩ ( বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনটিতে ধারাবাহিকভাবে কোন দলের প্রার্থীই বিজয়ী হননি। এর আগে এ আসনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ওয়াকার্স পার্টির প্রার্থী একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। এ আসনে বর্তমানে বিএনপির ব্যাপক সমর্থন থাকলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এখানে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমানের ব্যাপক বিরোধ রয়েছে। সেলিমা রহমানের সমর্থকরা জয়নুল আবেদীনের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। এছাড়া মুলাদী উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার খানও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। যদিও সাত্তার খানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। তিনি মনোনয়ন ফিরে পেতে আপিল করেছেন।
এদিকে এ আসনে এবি পার্টির ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভূইয়া, জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু, গণঅধিকার পরিষদ ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন, জাতীয় পার্টির ফকরুল আহসান, ইসলামী আন্দোলনের মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, বাসদের মো. আজমুল হাসান জিহাদ এবং জাতীয় পার্টির মো. ইকবাল হোসেন নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
এদের মধ্যে জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু পরপর কয়েকবার এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে জাতীয় পার্টির মো. গোলাম কিবরিয়া টিপু ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভূইয়ার ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভবনা রয়েছে।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে সেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. রাজিব আহসানকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে আছেন অপর মনোনয়ন প্রত্যাশি কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদের সমর্থকরা। এ আসনে বিএনপির বিভাজন দলীয় প্রার্থীর জন্য অনেকটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
তবে এ আসনে জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল জব্বার অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ জাসদের আব্দুস সালাম (খোকন), ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ এছাহাক মো. আবুল খায়ের এবং মুক্তি জোটের আব্দুল জলিল এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। এখন পর্যন্ত এ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াইয়ের আভাষ মিলছে।
বরিশাল-৫ সদর আসনটি বরিশালের সবচেয়ে মর্যাদার ও গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেকটা মিটে গেলেও এখনো প্রার্থীকে সমর্থন করেননি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাছরিন। শনিবার (১০ জানুয়ারি) বিকেলে অপর মনোনয়ন প্রত্যাশি আবু নাছের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ সরোয়ারকে সমর্থন দেওয়ায় অনেকটা স্বস্তিতে রয়েছেন সরোয়ার।
তবে এ আসনে ইসলামী জোটের যে প্রার্থীই হোক না কেন মূলত বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ইসলামী দলের প্রার্থীরা। এছাড়া বাসদের মনোনীত প্রার্থী ডা. মনিষা চক্রবর্তীরও নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তিনিও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেন বলে মনে করছেন কেউ কেউ। সেক্ষেত্রে বরিশাল-৫ সদর আসনে ত্রিমুখী লড়াইয় দেখবে বরিশালবাসী।
বরিশাল-৬ বাকেরগঞ্জ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আবুল হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাষ মিলছে। এ আসনে জামায়াতের মো. মাহমুদুন্নবী, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের আব্দুল কুদ্দুস, গণ অধিকার পরিষদের মো. সালাউদ্দীন মিঞা এবং স্বতন্ত্র মো. কামরুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।