সারা বাংলা

শীতলক্ষ্যায় নৌকার মেলায় শাক-সবজির উৎসব

ভোরের ঘন কুয়াশা কাটতে না কাটতেই একের পর এক নৌকা ভিড়ছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। নৌকার পেটে বোঝাই দেশি আলু, টমেটো, শিম, মিষ্টি কুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মুলা। নদীর শান্ত জল ছুঁয়ে বরমী বাজার ঘাটে পৌঁছাতেই শুরু হয় ব্যস্ততা—নৌকা থেকে নামানো হয় টাটকা শাক-সবজি, পাইকাররা সেসব কিনতে ভিড় জমান আড়তের সামনে। 

সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজারে গিয়ে চোখে পড়ে এই চিরচেনা কিন্তু প্রাণবন্ত দৃশ্য।

প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো বরমী বাজারে সপ্তাহের প্রতি বুধবার বসে বিশাল শাক-সবজির হাট। শীতলক্ষ্যা নদীঘেঁষা এই বাজার শুধু স্থানীয়দের নয়, আশপাশের উপজেলা ও জেলার কৃষকদেরও ভরসার জায়গা। 

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকেরা নৌকা কিংবা অন্য উপায়ে তাঁদের উৎপাদিত শাকসবজি নিয়ে হাজির হন হাটে। সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যেই মূল বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়।

আড়তদারেরা জানান, প্রতি হাটের দিনে এখানে কয়েক লাখ টাকার শাক-সবজি কেনাবেচা হয়। শুধু বুধবারই নয়, সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও নদীর তীরে চলে বেচাকেনা।

এই বাজারের বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে শাক-সবজি বিক্রি করতে উৎপাদকদের কোনো ধরনের খাজনা বা অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় না। এতে সরাসরি লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।

পার্শ্ববর্তী গফরগাঁও উপজেলার কৃষক ইয়াসিন বলেন, নিজের জমির আলু আর টমেটো নিয়ে প্রতি বছরই এখানে আসি। এবার শাক-সবজির দাম ভালো পাচ্ছি। তবে, ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের কারণে ফলন কিছুটা কম। এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকার শাক-সবজি বিক্রি করেছি।

কৃষক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, শীতলক্ষ্যার তীরে বাজার বসায় আমাদের অনেক সুবিধা। বাড়ির কাছের ঘাট থেকেই নৌকায় করে শাক-সবজি নিয়ে আসি। কোনো খাজনা নেই, ঝামেলাও কম। পাইকাররা নিজেরাই এসে দামদর করে নিয়ে যায়।

বরমীর শাক-সবজির আরেকটি বড় গুণ—এগুলো টাটকা ও নিরাপদ। কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের জমিতে ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। আমরা জৈব সার ব্যবহার করি। তাই, শাকসবজি টাটকা ও নিরাপদ।

শীতলক্ষ্যার তীরে আড়ত বসিয়েছেন আব্দুল কাদির। তিনি বলেন, বুধবার সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। সকালে দুই ঘণ্টার মধ্যেই কয়েক লাখ টাকার শাক-সবজি বিক্রি হয়ে যায়। নদীর তীরে বাজার হওয়ায় মাল ওঠানো-নামানো সহজ। এখানকার শাক-সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।

বাজারের ইজারাদার আব্দুল মতিন জানান, শীত মৌসুমে প্রায় দুই মাস নদীর তীরে বিনা খাজনায় শাক-সবজি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়। এতে কৃষকরা লাভবান হন। এবারও সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বরমীর খ্যাতি শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা নিয়মিত এখানে আসেন। 

জৈনা বাজার থেকে আসা এক পাইকার বলেন, টাটকা শাক-সবজি কিনতে প্রতি বুধবার বরমী বাজারে আসি। এখানকার আলু, টমেটো, শিম খুব ভালো মানের। দাম তুলনামূলক কম, স্বাদও ভালো। তাই, এখান থেকে কিনে ঢাকায় বিক্রি করি।

কুয়াশা, নদী আর নৌকার এই সম্মিলনেই বরমী বাজারের আলাদা সৌন্দর্য। এই হাট আজও প্রমাণ করে—নদীকে ঘিরে কৃষক, পাইকার আর ভোক্তার সম্পর্ক কতটা জীবন্ত ও অর্থবহ হতে পারে।