সারা বাংলা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ম ভেঙে সড়কে অদক্ষ চালক

চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র গড়ে উঠছে বেসরকারি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল। নামমাত্র প্রশিক্ষণে ট্রাফিক আইন ও কারিগরি জ্ঞান ছাড়াই টাকার বিনিময়ে অদক্ষ চালক তৈরির মহোৎসবে মেতেছে এসব প্রতিষ্ঠান। ফলে জেলাজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। 

বিআরটিএ অফিস বলছে, সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া জেলায় অন্য কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং ট্রেনিংয়ের বৈধ অনুমোদন নেই। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় নামে-বেনামে অন্তত ৩০টি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল কার্যক্রম চালাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, একটি ড্রাইভিং স্কুলের জন্য পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ট্রাফিক সাইন বোর্ড, ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং প্রশস্ত নিজস্ব প্রাকটিক্যাল ফিল্ড থাকা বাধ্যতামূলক। তবে অধিকাংশ স্কুলেরই নিজস্ব কোনো মাঠ নেই; তারা সরকারি রাস্তা বা জনাকীর্ণ ফাঁকা মাঠে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

সরকারি নীতিমালা ও সরেজমিনে দেখা গেছে, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ দিন অথবা নির্দিষ্ট ঘণ্টা সময় নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের মেয়াদ মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন। তাত্ত্বিক ক্লাসে সাইন, সিগন্যাল ও আইন শেখানোর নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা গুরুত্ব সহকারে করা হয় না। 

এমনকি সরকারি বিধিতে ডাবল ব্রেক সম্বলিত ফিট গাড়ির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবহৃত হচ্ছে পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। 

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা রাশিদুল ইসলাম জানান, বিদেশে ড্রাইভিংয়ের অফার পেয়ে তিনি প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন। তবে বেসরকারি স্কুলের অব্যবস্থাপনা দেখে তিনি আর ভর্তি হননি। অদক্ষ হাতে চালকের আসনে বসা মানে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি।

জেলা শহরের বালুবাগান এলাকার মারেফুল ইসলাম নামে এক যুবক বলেন, “৩০ দিনের ক্লাসের কথা বলে ভর্তি করা হলেও মাত্র ৭-১০ দিন গাড়ি ধরা শিখিয়েই কোর্স শেষ বলে দাবি করে কর্তৃপক্ষ। ট্রাফিক সিগন্যাল বা আইন নিয়ে কোনো ক্লাসই নেওয়া হয়নি। যার কারণে, পেশাদার চালক হতে যে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সেটা পাইনি।”

খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ চালকদের যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করতে না পারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই স্কুলগুলোতে ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ, ব্রেক ফেল বা টায়ার বার্স্ট সামলানোর মতো জরুরি কারিগরি বিষয়ে কোনো ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়া হয় না। ফলে একজন চালক কেবল স্টিয়ারিং ঘোরাতে শিখলেও ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ নিয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে, চাঁপাই মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক আব্দুস সামাদ বলেন, “বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো কী করছে তা আমরা অবগত নই। তবে আমরা নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের ড্রাইভিং শেখাই।”

তিনি আরো বলেন, “সরকার যদি নিবন্ধনহীন ড্রাইভিং স্কুলগুলোকে নজরদারির আওতায় আনে, তবে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও পেশাদার চালক তৈরি সম্ভব হবে। এই উদ্যোগ নিলে আমরা সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”

সচেতন মহলের মতে, বিআরটিএ’র কড়াকড়ি নজরদারি ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে অদক্ষ চালক তৈরির এই মহোৎসব বন্ধ হবে না। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে ড্রাইভিং স্কুলগুলোর মান নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহজামাল হক বলেন, “জেলায় শুধুমাত্র টিটিসি ও যুব উন্নয়নে সরকারিভাবে ড্রাইভিং শেখানো হয়। বাকি যতগুলো ড্রাইভিং স্কুল রয়েছে, তাদের কোনো অনুমোদন নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে না, বরং নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সড়কে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।”

তিনি জানান, বেসরকারি স্কুলগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে প্রক্রিয়া চলছে। তবে এখন পর্যন্ত জেলার মাত্র একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। তিনি সাধারণ মানুষকে সঠিক জায়গা থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।