সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ বছর আলু চাষ করে লোকসানের আশঙ্কা করছেন বরগুনার কৃষকরা। তাদের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় আলু নিয়ে বিপাকে পড়তে হতে পারে তাদের। কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকদের কাছে ন্যায্যমূল্য কীটনাশক, সার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিক্রি নিশ্চিত করতে কাজ করছেন তারা। পাশাপাশি হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আলু চাষের দিক থেকে বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরগুনার অবস্থান তৃতীয়। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ অঞ্চলে আলুর চাষ কিছুটা কম হলেও বরগুনায় উৎপাদিত আলুতে অনেকটাই চাহিদা পূরণ হয়। গত বছর বরগুনায় ৯৭৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, এ বছর তা কমিয়ে ৯৪৫ হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলায় ১২০, পাথরঘাটায় ৫৬২, বামনায় ৪২, বেতাগীতে ১৩২, আমতলীতে ১৯ এবং তালতলীতে ৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় মোট আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ৫৭০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ সম্পন্ন করেছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় ১৫.৩৭, পাথরঘাটায় ৩৫০, বামনা ৪২, বেতাগী ১২০, আমতলী ১৭ এবং তালতলীতে ২৬ হেক্টর জমিতে আলু চাষ সম্পন্ন হয়েছে। এখনো ৩৭৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ বকি রয়েছে।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিপত্তির বিষয়ে কৃষকদের অভিযোগ, সঠিক সময়ে আলু বীজ পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন কোম্পানির কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় সার আগের তুলনায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে সব খরচ মিলিয়ে উৎপাদনের পর আলু বিক্রি করে লাভ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। জেলায় উৎপাদিত আলুর জন্য কোনো হিমাগার না থাকায় সংরক্ষণ নিয়েও শঙ্কিত কৃষকরা।
প্রস্তুতকৃত জমিতে আলুর বীজ রোপণ করছেন নারী চাষিরা
পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের বিভিন্ন ক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, আলু চাষের জন্য ক্ষেত প্রস্তুত করে বীজ রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী ও পুরুষ চাষিরা। তাদের মধ্যে পুরুষরা ক্ষেত প্রস্তুত এবং নারীদের আলুর বীজ রোপণ করতে দেখা যায়।
কালমেঘা ইউনিয়নের বাসিন্দা সুলতান ফকির এ বছর তিন একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “প্রতিবছর ধানের পাশাপাশি আমি আলু চাষ করি। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি। যারা আলু চাষ করেন না তাদের অনেকেই সহযোগিতা পায়, কিন্তু আমি পাই না। স্থানীয় যে সব ওষুধ সরবরাহকারী আছেন, তাদের থেকে বেশি দামে আমাদের ওষুধ কিনতে হয়।”
ক্ষেতে কাজ করা হেনারা বেগম বলেন, “নির্ধারিত সময়ের এক সপ্তাহ পর সার পেয়েছি। এক একর জমির মধ্যে চার শতাংশ জমিতে আলুর গাছ উঠেছে, বাকি জমিতে এখনো ওঠেনি। গতবছর এক একর জমিতে আলু চাষ করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এবছর লাভের আশায় আবারো এক একর দশ শতাংশ জমিতে আলু আবাদ করেছি। সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শঙ্কায় আছি। আলু উৎপাদনের পর যদি ভালো দাম পাওয়া যায় তাহলে লাভ হবে। আর যদি ভালো দাম না পাই, তাহলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে।”
মো. মুসা নামে অপর এক চাষি বলেন, “প্রতিবছরের মতো এ বছরও আলু চাষিদের অবস্থা খারাপ। সিন্ডিকেটের কারণে সঠিক সময়ে সার এবং বীজ পাওয়া যায় না। কৃষি বিভাগের যারা আছেন, তারাও মাঠ পর্যায়ে এসে কোনো পরামর্শ দেন না। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির লোকজন এসে যা বলেন এবং যেভাবে বলেন সে অনুযায়ী আমরা চাষাবাদ করি। কৃষি কর্মকর্তারা যদি মাঠ পর্যায়ে আসতেন তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো।”
আলু চাষি মো. রাহাত বলেন, “কীটনাশক, সার এবং বীজের দাম প্রতিবছর বৃদ্ধি পায়। সব খরচ মিলিয়ে অনেক সময় আলু উৎপাদন করে আমরা লাভ করতে পারি না। এরকম চলতে থাকলে কৃষকরা এক সময়ে বাধ্য হয়ে আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।”
বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, “এ বছর বরগুনায় নির্ধারিত ৯৪৫ হেক্টর জমির মধ্যে ৫৭০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ সম্পন্ন করেছেন কৃষকরা। আশা করছি, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে। কৃষকদের অভিযোগ আছে, আলু উৎপাদনের পর ভালো দাম পাওয়া যায় না। এ কারণে একটি হিমাগার নির্মাণের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। যদি স্থানীয় কোনো উদ্যোক্তা হিমাগার নির্মাণে এগিয়ে আসেন, তাহলে প্রশাসনিক ও সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তরের মাধ্যমে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় সে ব্যবস্থা করা হবে।”
কীটনাশকসহ সার ও ওষুধের দাম বেশি কৃষকদের এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বরগুনার যে কোনো এলাকায় যদি কেউ নির্ধারিত দামের থেকে বেশি দামে কীটনাশক, সার এবং ওষুধ বিক্রি করেন এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলার পাথরঘাটায় সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয়। এ কারণে ওই এলাকায় ডিলারদেরকে বেশি পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশাকরি, ওই এলাকার কৃষকদের কোনো সার সংকট হবে না।”