কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে বাতিল হওয়ায় ভোটের মাঠে হিসাব বদলে যাচ্ছে। এ আসনে এখন জয়ের পাল্লা স্পষ্টভাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ছিলেন দেবীদ্বারে অন্যতম জনপ্রিয় রাজনীতিক। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রবল প্রতিপত্তি চার বারের এ সংসদ সদস্যের। হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে তার তুমুল প্রতিদ্বিন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা ছিল সবার।
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় এখন কার্যত হাসনাতের সামনে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকল না। এতে ভোটের সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যাচ্ছে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শুরুতে মঞ্জুরুলের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে, তার বিরুদ্ধে হলফনামায় ঋণখেলাপের তথ্য গোপনের অভিযোগ তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। নির্বাচন কমিশন মঞ্জুরুলের মনোনয়ন বাতিল করেন। বিষয়টি গড়ায় হাইকোর্ট পর্যন্ত। সর্বোচ্চ আদালত মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর রিট খারিজ কললে নির্বাচনের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েন তিনি।
কুমিল্লা-৪ আসনে এখন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সক্রিয় আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আবদুল করিম (হাতপাখা), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (দেয়ালঘড়ি), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার (আপেল) এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিন (ট্রাক)। তবে, রাজনৈতিক প্রভাব, সংগঠন ও জোটগত সমর্থনের দিক থেকে তাদের কেউই হাসনাতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন না।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে কুমিল্লা-৪ আসনের কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা হয় রাইজিংবিডি ডটকমের এই প্রতিবেদকের।
তারা জানান, জোটগত সমঝোতার কারণে হাসনাত আবদুল্লাহ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। জামায়াতে ইসলামী সেখানে প্রার্থী না দেওয়ায় দলটির ভোট ও সাংগঠনিক সমর্থন এককভাবে হাসনাতের দিকেই যাচ্ছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাদ পড়ার পর তার অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কুমিল্লা-৪ আসনে এখন ব্যক্তি বা নীতিগত লড়াইয়ের চেয়ে জোটগত ও দলীয় সমর্থন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মঞ্জুরুলের বাদ পড়া পুরো নির্বাচনি সমীকরণ পাল্টে দিচ্ছে। নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে হাসনাত আবদুল্লাহর।
দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক এ বি এম আতিকুর রহমান বলেছেন, দেবীদ্বারে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর একটা শক্ত অবস্থান আছে। তিনি স্থানীয় বিএনপির প্রবীণ নেতা এবং চার বারের সংসদ সদস্য।
অন্যদিকে, হাসনাত আবদুল্লাহ তরুণ প্রার্থী। জোটের কারণে জামায়াত এখানে প্রার্থী দেয়নি। ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ছিটকে পড়ায় মাঠের পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। হাসনাত আবদুল্লাহ সহজে জয়ী হতে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনি সমঝোতা হওয়ায় এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম (শহিদ) মনোনয়নপত্র জমা দেননি। সাইফুল ইসলাম উত্তর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি। সর্বশেষ মঙ্গলবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহকে সমর্থন জানিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মোফাজ্জাল হোসেন।
পরে ২ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাচাই-বাছাইয়ে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়। কিন্তু, সেদিনই হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার আইনজীবী হলফনামায় ঋণখেলাপের তথ্য গোপনের অভিযোগ তোলেন তার বিরুদ্ধে। পরে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর আইনজীবী তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা বাহাসের পর রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে শুনানি শেষে ১৭ জানুয়ারি হাসনাত আবদুল্লাহর আপিল মঞ্জুর করে ইসি। এতে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসির এ সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে মঞ্জুরুল গত সোমবার উচ্চ আদালতে রিট করেন। তবে, সেটি সরাসরি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।