হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা। বিদ্যার দেবীর পূজা উপলক্ষে সিরাজগঞ্জের তাড়াশে দিনব্যাপী দই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলা ঘিরে এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। মূলত ‘শ্রীপঞ্চমী’ মেলা হলেও এলাকাবাসীর মুখে মেলাটি ‘দই মেলা’ নামে পরিচিত। এলাকাবাসী বলছেন এই মেলা তিনশ বছর ধরে হচ্ছে। তারা পরম্পরাক্রমে ঐতিহ্যবাহী মেলাটির আয়োজন করছেন।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ঘোষ দইয়ের হাঁড়ি, মুড়ি সাজিয়ে বসেছেন তাড়াশের জমিদার বাড়ির রসিক রায় মন্দিরের সামনে ঈদগা মাঠে।
জানা যায়, চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশের তৎকালীন জমিদার পরম বৈঞ্চব বনোয়ারী লাল রায় বাহাদুর প্রথম দই মেলার প্রচলন করেন। জমিদার বাড়িতে আসা অতিথিদের আপ্যায়নে এ অঞ্চলে দই পরিবেশন করার রেওয়াজ আছে। জনশ্রুতি আছে রায় বাহাদুর নিজেও দই ও মিষ্টি পছন্দ করতেন।
দিনব্যাপী মেলায় দইয়ের পাশাপাশি ঝুড়ি, মুড়কি, চিড়া, মুড়ি, বাতাসা, কদমাসহ নানা ধরনের খাবার বিক্রি হয়। ক্রেতা মূলত স্থানীয় মানুষ। আশপাশের অনেকে মেলায় আসেন কৌতূহল নিয়ে। তারা দই, মুড়ি-মুড়কি কিনে বাড়ি ফেরেন।
মেলায় বিভিন্ন স্বাদের দই পাওয়া যায়। যেমন ক্ষীরসা দই, শাহী দই, সিরাজগঞ্জের রনী মিষ্টান্ন ভান্ডার, বগুড়ার দই, শেরপুরের দই, টক দই, ডায়াবেটিক দই, শ্রীপুরী দই- এমন হরেক নামের শত শত মণ দই বিক্রি হয়। পাশাপাশি বড় বড় হাড়িতে রয়েছে দশ সেরে দই। বিশেষ করে বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়ার ধরইলের দই, নাটোরের গুরুদাসপুরের শ্রীপুর, পাবনা জেলার চাটমোহরের হান্ডিয়ালের দই, তাড়াশের দই প্রচুর বিক্রি হয়।
মেলায় দই বিক্রেতা রণজিৎ ঘোষ, নিতাই ঘোষ, মহাদেব ঘোষ, বিমল ঘোষ ও সুকোমল ঘোষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি দুধের দাম, জ্বালানি, শ্রমিক খরচ, দইপাত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দইয়ের দামও কেজিতে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বেড়েছে। তবে মেলা দিনব্যাপী হলেও চাহিদা থাকার কারণে কোনো ঘোষের দই অবিক্রিত থাকে না।
মেলায় দই কিনতে আসা মিঠুন সাহা বলেন, ‘‘প্রতি বছর সকালে এই মেলা থেকে দই কিনি। সরস্বতী পূজা উপলক্ষে বাড়িতে অনেক অতিথি এসেছে। তাদের আপ্যায়নের জন্য দই, মুড়ি ও চিড়া কিনছি। আমরা ছোটবেলা থেকেই এই মেলা দেখে বড় হয়েছি।’’
মেলা থেকে দই কিনছিলেন শঙ্কর। তিনি বলেন, ‘‘সরস্বতী পূজায় বোন ও জামাইসহ অনেক আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এসেছে। এখানকার দই খুব সুস্বাদু। প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ কেজি দই কিনি। এবার দাম বেশি মনে হচ্ছে।’’
তাড়াশ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোপাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘‘প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী তাড়াশের এই দই মেলা। মাঘ মাসে শ্রী পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে মেলাটি হয়। আমরা মূলত ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। তখন বড়দের মুখেও এই মেলার কথা শুনেছি। বড় হয়ে আমরা মেলাটি করছে সবার সহযোগিতা নিয়ে।’’
তাড়াশ উপজেলা সনাতন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সনাতন কুমার দাস বলেন, ‘‘মূলত পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তাড়াশের তৎকালীন জমিদার বনোয়ারী লাল রায় বাহাদুর প্রথমে দই মেলার প্রচলন করেছিলেন। তারপর থেকে এটা এলাকার একটা রেওয়াজ ও আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। আমরা ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মেলায় এসেছি। আমাদের সন্তানরাও আমাদের হাত ধরে মেলায় যাচ্ছে।’’
মেলা সুষ্ঠু পরিবেশে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।