সারা বাংলা

মাইজভান্ডারের মূলা: বছর জুড়ে যার জন্য অপেক্ষা 

মাইজভান্ডারের ওরশ। প্রতিবছরের ১০ মাঘ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার দরবার শরীফে এই ওরশ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাইজভান্ডার দরবার শরীফ এলাকায় এই সময়টা মানেই আরেকটি নীরব উৎসব। সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু একটি সবজি, যার নাম মূলা। 

তবে এটি বাজারের সাধারণ মূলা নয়। এটি পরিচিত ‘ভান্ডারি মূলা’ বা অনেকের কাছে ‘মাইজভান্ডারের মূলা’ নামে। চট্টগ্রামের বহু ভোজনরসিকের কাছে এই মূলা এক ধরনের মৌসুমি আনন্দ, যেটির জন্য তারা পুরো বছর অপেক্ষা করেন। কারণ এটির দেখা মেলে বছরে একবারই, মাঘ মাসে দরবার শরীফের ওরশকে ঘিরে।

শনিবার, (২৪ জানুয়ারি) মাইজভান্ডার দরবার শরীফ এলাকায় ওরশ মাহফিল ঘিরে মানুষের ঢল যেমন ছিল, তেমনি মাহফিল শেষে আরেকটি দৃশ্যও চোখে পড়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষকে বড় বড় সাইজের মূলা কিনে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। কারো হাতে ঝুলছে বিশাল জোড়া মূলা, কারো কাঁধে তুলে নেওয়া, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের সাথে মিলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। 

এই দৃশ্য সাধারণ মানুষকেও থামিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখছেন, কেউ কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন, আবার অনেকে ছবি তুলছেন। দরবার এলাকার সড়কগুলো যেন একদিনের জন্য ভিন্ন রকম এক বাজারে পরিণত হয়েছে।

দরবার শরীফ ঘুরে দেখা গেছে, এখানে ছোট বড় মিলিয়ে একশটিরও বেশি দোকানে ভান্ডারি মূলা বিক্রি হচ্ছে। এর চাহিদা এত বেশি যে, বিক্রেতারা সকাল থেকে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। মূলাগুলোর আকার দেখে প্রথমেই বিস্ময় জাগে। কোনো মূলার ওজন পাঁচ কেজি, আবার অনেকগুলো ১০ থেকে ১৫ কেজিরও বেশি। দোকানভেদে জোড়া মূলার দাম শুরু হয় ১০০ টাকা থেকে, বড় সাইজ হলে তা ৫০০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। একই বাজারে একেক জোড়ার আকার একেক রকম, আর সেই অনুযায়ী দামও বদলে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে দরবারে আসা এক ভান্ডারি ভক্ত হাবিবুর রহমান বললেন, “এই মূলা কেনার জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি। ভান্ডারি মূলার স্বাদের সাথে অন্য কোনো মূলার তুলনা হয় না। সাধারণত গরুর হাড়-মাংসের সাথে এই মূলা রান্না করা হয়। কখনো কখনো চিংড়ি মাছ দিয়েও রান্না হয়। দরবারে এলে বাড়ির গৃহিণীদের আগাম আবদার থাকে, যেন ভান্ডারি মূলা কিনে নিয়ে আসা হয়।” 

হাতে থাকা একজোড়া বড় মূলা দেখিয়ে তিনি বলেন, “বাড়িতে ফিরেই রান্নার আয়োজন হবে।”

আরেক ক্রেতা মাইনুল ইসলাম জানান, তিনি আনুমানিক ১২ থেকে ১৩ কেজি ওজনের দুটি মূলা কিনেছেন ৩৫০ টাকায়। তিনি বললেন, “এই মূলা বাড়িতে নিয়ে গরুর হাড়-মাংসের সাথে রান্না হবে। এরপর আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতদের দাওয়াত দিয়ে মূলার তরকারির সাথে সাদা ভাত খাওয়ানো হবে।” 

তার মতে, বছরে একবারই তো এমন মূলা পাওয়া যায়, তাই এই স্বাদ ঘিরে তারা ছোট করে উৎসব করেন। তিনি প্রতিবছর মাইজভান্ডার দরবার থেকে মূলা কিনে নেন। বড় সাইজের মূলা কেনার অপেক্ষা যেন পুরো বছরের একটা অংশ হয়ে আছে।

বিক্রেতাদের কথায় বোঝা যায়, ভান্ডারি মূলার এই জনপ্রিয়তা হঠাৎ তৈরি হয়নি। দরবার এলাকায় মূলা বিক্রি করা আনোয়ার হোসেন বলেন, “শীত মৌসুমে ক্ষেত থেকে মূলা তুলে ফেলি না। বরং বেশি দিন মাঠে রেখে মূলা বড় করা হয় যেন দরবারের ওরশের সময় বড় আকৃতির মূলা বিক্রি করা যায়। আমার দোকানে ৩ কেজি থেকে ১২ কেজি ওজনের মূলা রয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে ভান্ডারি মূলা নামেই পরিচিত।” 

তিনি বলেন, “বড় সাইজের এই মূলার চাহিদা অনেক বেশি, আর মাঘ মাস এলে ক্রেতারা নিজেরাই দরবারে এসে খোঁজ করেন। শুধুমাত্র ফটিকছড়ির বিভিন্ন সবজি ক্ষেতেই এই মূলা উৎপাদন হয়।”

অপর বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন জানান, তিনি এক হাজারেরও বেশি বড় সাইজের মূলা বিক্রির জন্য দরবারে এনেছেন। দুপুর পর্যন্ত ৮০০টিরও বেশি মূলা বিক্রি হয়ে গেছে। তার দোকানে প্রতি জোড়া মূলা ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। 

তিনি বলেন, “দরবার শরীফ এলাকায় এই কয়েক দিন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সময়। কারণ, বছরের অন্য সময় এত বড় আকারের মূলার বাজার থাকে না, আর মানুষও এমন আগ্রহ নিয়ে কিনতে আসে না।”

ভান্ডারি মূলার স্বাদ নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহের পেছনে রান্নার ধরনও বড় কারণ। স্থানীয়দের অভিজ্ঞতায়, বড় সাইজের মূলা রান্না হলে নরম হয়, ঝোল ভালোভাবে টেনে নেয়, ফলে গরুর হাড়-মাংসের সাথে রান্না হলে ঝোলের গাঢ় স্বাদ মূলার ভেতরে ঢুকে যায়।

চট্টগ্রামের বহু পরিবার শীতের দিনে হাড়-মাংসের ঝোলে মূলা রান্নাকে বিশেষ খাবার হিসেবে ধরে। আবার কেউ কেউ চিংড়ি দিয়ে রান্না করেন, যেখানে ঝোলের স্বাদ একটু হালকা হলেও মূলার আলাদা ঘ্রাণ ও মিঠে স্বাদ ধরে থাকে। এই খাবার ঘিরেই পরিবারের টেবিলে বাড়তি আনন্দ যোগ হয়।

দরবার শরীফ থেকে মূলা কেনা তাই শুধু কেনাবেচা নয়, এটি এক ধরনের বার্ষিক সামাজিক অভ্যাস। কেউ দরবারে ওরশে গেলে যেমন তবারক নেওয়ার কথা ভাবেন, তেমনি অনেকে ভান্ডারি মূলা না কিনলে যাত্রা অসম্পূর্ণ মনে করেন। 

মাঘ মাসের এই মৌসুমি বাজার মানুষকে পরিবার, রান্নাঘর, অতিথি আপ্যায়ন আর শীতের স্বাদকে আবারও মনে করিয়ে দেয়। ভান্ডারি মূলা একদিকে যেমন কৃষকের পরিকল্পিত উৎপাদন ও বাণিজ্যের অংশ, অন্যদিকে তেমনি এটি চট্টগ্রামের লোকজ খাদ্যসংস্কৃতির একটি জীবন্ত ঐতিহ্য।

মাইজভান্ডার দরবার শরীফ এলাকায় দেখা গেছে, অসংখ্য মানুষ মূলা কিনে হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। পথচারীরাও থেমে দেখছেন, দোকানগুলোর সামনে ভিড় জমছে, দর কষাকষি হচ্ছে, মূলা তোলা হচ্ছে, আবার কেউ কেউ আনন্দ করে পরিবারের জন্য পছন্দ করে নিচ্ছেন বড় আকারের জোড়া। এই দৃশ্য বছরের অন্য কোনো সময়ে দেখা যায় না। শুধুমাত্র মাঘ মাসে মাইজভান্ডার দরবার শরীফের ওরশকে ঘিরেই এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী মূলার বাজার তৈরি হয়। যেখানে একটি সাধারণ সবজি একদিনের জন্য হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের মানুষের বহু প্রতীক্ষিত উৎসবের নাম।