ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মানিকগঞ্জে প্রার্থীদের প্রচার ক্রমেই বাড়ছে। একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় হারানো ‘দুর্গ’ পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে দলটির নেতাকর্মীরা।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে সংগঠন চাঙা করে নির্বাচনি লড়াইয়ে নামলেও তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ১৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের মধ্যে দুইটি আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত দুই নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা রয়েছে।
মানিকগঞ্জ–১, মানিকগঞ্জ–২ ও মানিকগঞ্জ–৩ আসনে বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতিটি আসনেই একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোটের অঙ্ক জটিল হয়ে উঠেছে।
বিএনপি নেতাদের দাবি, অতীতের রাজনৈতিক টানাপোড়োন ও নির্বাচন বর্জনের কারণে মাঠে না থাকলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সংগঠন শক্তিশালী আছে, আর জনমনে রয়েছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। মানিকগঞ্জে বিএনপির প্রতি মানুষের আস্থা ছিল, এখনো আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সর্বস্তরের নেতারা একাধিক সভা-সমাবেশ করেছেন। ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বার্তার পাশাপাশি ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
বিএনপি দল গঠনের পর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জের চারটি আসনের সবকটিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয় পান। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সবকটি আসন ধরে রেখেছিল দলটি। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি কমিয়ে তিনটি আসন পুনর্বিন্যাস করে নির্বাচন কমিশন। এরপর নবম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবকটি আসনে জেতে আওয়ামী লীগ। এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে সব আসনে জয় পেতে চেষ্টায় আছেন বিএনপির প্রার্থীরা।
মানিকগঞ্জ–১: এই আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। বিএনপি মনোনীত এস এ জিন্নাহ কবীর ‘ধানের শীষ’, জামায়াতে ইসলামীর আবু বকর সিদ্দিক ‘দাঁড়িপাল্লা’, গণঅধিকার পরিষদের মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন ‘ট্রাক’, জনতার দলের মো. শাহজাহান খান ‘কলম’, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ খোরশেদ আলম ‘হাতপাখা’ প্রতীক পেয়েছেন। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মো. তোজাম্মেল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করবেন। তিনি পেয়েছেন ‘ঘোড়া’ প্রতীক। আব্দুল আলী ব্যাপারি ‘হরিন’ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেবেন। এ আসনের গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার ও পাড়া-মহল্লায় নির্বাচনি প্রচার জমে উঠেছে।
ধানের শীষের প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবীর বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করবে এটি খুব স্বাভাবিক বিষয়। বিএনপি এ আসনে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। জনগণ ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে মুখিয়ে আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের জন্য কাজ করেছি, এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছি। আমার বিশ্বাস জনগণ ভোটের মাধ্যমে বিএনপিকে জয়ী করবে।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সৎ ও ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বের অভাবে ভুগছে। এই নির্বাচনে জনগণ বিকল্প শক্তি খুঁজছে। জামায়াতে ইসলামী আদর্শিক রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে একটি সুশাসনভিত্তিক সংসদ গঠনে ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশাবাদী।”
মানিকগঞ্জ–২: এখানে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। বিএনপির মইনুল ইসলাম খান শান্ত ‘ধানের শীষ’, জাতীয় পার্টির এস এম আব্দুল মান্নান ‘লাঙ্গল’, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আলী ‘হাতপাখা’ এবং ১০ দলীয় জোট থেকে খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীক পেয়েছেন। একাধিক প্রার্থী থাকায় এই আসনেও প্রতিযোগিতা বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে।
এ আসনের বিএনপির প্রার্থী মইনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, “আসনটি বিএনটির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। জোর-জুলুম করে আওয়ামী লীগ ভোটবিহীনভাবে দখলে নেয়। কিন্তু স্বাভাবিক পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ ধানের শীষে ভোটে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।”
জাতীয় পার্টির প্রার্থী এস এম আব্দুল মান্নান বলেন, “জাতীয় পার্টি সবসময় উন্নয়ন ও বাস্তবমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। এলাকার মানুষ উন্নয়ন দেখেছে এবং আরো উন্নয়ন চান। আমরা দলীয় সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে নির্বাচনি মাঠে আছি। ভোটাররা লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিয়ে স্থিতিশীল ও কার্যকর নেতৃত্বকে বেছে নেবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
মানিকগঞ্জ–৩: সবচেয়ে বেশি প্রার্থী নয়জন লড়ছেন এই আসনটিতে। বিএনপির আফরোজা খানম রিতা ‘ধানের শীষ’, জাতীয় পার্টির আবুল বাশার বাদশা ‘লাঙ্গল’, স্বতন্ত্র মফিজুল ইসলাম খান কামাল ‘সূর্যমুখী ফুল’, খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ সাঈদনূর ‘রিকশা’, জাতীয় পার্টি (জেপি) মনোনীত মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিস ‘বাইসাইকেল’, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মো. আতাউর রহমান আতা ‘ফুটবল’, বাংলাদেশ জাসদের মোহাম্মদ শাজাহান আলী ‘মোটরগাড়ি’, স্বতন্ত্র রফিকুল ইসলাম খান ‘মোটরসাইকেল’ এবং ইসলামী আন্দোলনের শামসুদ্দিন ‘হাতপাখা’ প্রতীক পেয়েছেন।
বিএনপি মনোনীত আফরোজা খানম রিতা বলেন, “জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণে প্রার্থী হয়েছি। সুখে-দুঃখে তাদের সাথে মিলেমিশে আছি, থাকব। এ অঞ্চলের মানুষ বিএনপির নেতৃত্ব ভালোবাসে। দীর্ঘদিন পর জনগণ তাদের পছন্দের নেতৃত্বকেই বেছে নিবে। মানিকগঞ্জের মানুষ ধানের শীষকে ভালোবাসে, বিএনপিকে ভালোবাসে।”
বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থী মোহাম্মদ শাজাহান আলী বলেন, “এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথা বলার জন্যই আমি নির্বাচনে এসেছি। বড় দলের বাইরে থেকেও জনগণের অধিকার ও ন্যায্যতার পক্ষে রাজনীতি করে আসছি। শ্রমজীবী, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের সমর্থন পাচ্ছি। ভোটাররা যদি বিকল্প ও প্রগতিশীল রাজনীতিকে সুযোগ দিতে চান, তাহলে মোটরগাড়ি প্রতীকে ভোট দেবেন বলে আমার বিশ্বাস।”
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করে মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনের ২০ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি প্রার্থীকে নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা পর্যায়ে দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”