বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত বাগেরহাটের জিয়া মেমোরিয়াল অরফানেজ ট্রাস্ট দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। এক সময় যেখানে এতিম ও দুস্থ শিশুদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া, পড়ালেখা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো; আজ সেই প্রতিষ্ঠানটি জরাজীর্ণ ভবন আর নীরবতায় ঘেরা এক ‘ভূতের বাড়ি’তে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৯৪ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামে ৩ দশমিক ৯০ একর জমির ওপর জিয়া মেমোরিয়াল অরফানেজ ট্রাস্ট-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর লক্ষ্য ছিল ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী এতিম ও দুস্থ শিশুদের লালন-পালন, শিক্ষা ও স্বাবলম্বী করে তোলা; পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচ কক্ষের প্রশাসনিক ভবন, ৩০ শয্যাবিশিষ্ট দুইতলা আবাসিক ভবন, একতলা ক্লিনিক, মসজিদ ও পুকুরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল। চালু ছিল ফিডার স্কুল, দর্জি বিজ্ঞান, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স প্রশিক্ষণ কোর্স।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটির। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এক সময় ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও বর্তমানে শুধু দুইজন নিরাপত্তা প্রহরী রয়েছেন। তারাও গত ১০ মাস ধরে বেতন পাননি।
বাগেরহাট-পিরোজপুর মহাসড়কের পাশে ফতেপুর-গোডাউন এলাকায় দীর্ঘ সীমানা প্রাচীরের পলেস্তারা খসে পড়েছে। বিবর্ণ নামফলক ও জংধরা লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভাঙাচোরা ভবন, পরিত্যক্ত পুকুর আর নীরব পরিবেশ। বর্তমানে মসজিদে নামাজ আদায় ছাড়া কোনো কার্যক্রম নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফফার বলেন, “২০১০ সালের পর থেকেই বাগেরহাটে জিয়া মেমোরিয়াল অরফানেজ ট্রাস্টের জৌলুস কমতে থাকে। ২০১৯ সাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ। এখন এটি ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। পুনরায় চালু হলে অনেক অসহায় শিশু এখানে পড়ালেখা করতে পারবে।”
নুরুন্নাহার নামে অপর এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে এক সময় ফিডার স্কুলে অনেক ছোট ছোট বাচ্চারা পড়ত। আমাদের এলাকার অনেক শিশু এখান থেকে শিক্ষা পেয়েছে।”
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দুই নিরাপত্তা প্রহরী সেকেন্দার আলী সরদার ও মো. হারুণ জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করছেন। বয়স আশির বেশি হলেও দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু ১০ মাস ধরে বেতন পাননি।
জমি দাতারা জানিয়েছেন, এতিম ও দুস্থ শিশুদের কল্যাণে জমি দেওয়া হয়েছিল। কার্যক্রম চালু না হলে জমি ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তারা।
জমিদাতা মো. আমজাদ খান বলেন, “আমি নিজে ৫১ শতক জমি দিয়েছি। উদ্দেশ্য ছিল মানবসেবা। এখন সব পরিত্যক্ত। কাজ না হলে আমাদের জমি ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি খান মনিরুল ইসলাম বলেন, “শুধুমাত্র জিয়াউর রহমানের নাম থাকার কারণেই ২০১০ সালের পর বরাদ্দ বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর চেষ্টা করব।”
সমাজসেবা অধিদপ্তর বাগেরহাটের উপ-পরিচালক এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, “জিয়া মেমোরিয়াল অরফানেজ ট্রাস্ট আমাদের দপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয়নি। তাই এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।”