দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে বন্ধ থাকা ঐতিহাসিক খুলনা–বাগেরহাট রেললাইন পুনরায় চালুর জোরি দাবি জানিয়েছেন বাগেরহাটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আধুনিক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বার্থে আগামীর নির্বাচিত সরকারের কাছে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত এই রেলপথ পুনরায় চালুর দাবিতে সরব হয়েছেন সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা।
খানজাহান আলী (র.)-এর পুণ্যভূমি বাগেরহাটে আজও রয়েছে রেলওয়ে স্টেশন ও অবকাঠামোর পুরোনো নিদর্শন। কোথাও কোথাও রেলওয়ের অধিগ্রহণ করা জমি লিজ ও দখলের মাধ্যমে বেদখলে চলে গেছে। এরপরও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে আবারও রেল যোগাযোগ চালুর দাবি জোরালো হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ আমলে বিভাগীয় শহর খুলনার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে বাগেরহাট–খুলনা ন্যারোগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে এটি ব্রডগেজে রূপান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন চলাচলের পর লোকসান ও পারিপার্শ্বিক নানা অজুহাতে ১৯৯৮ সালে রেলপথটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে বাগেরহাটবাসীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সে সময় জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসে মানুষ আশাবাদী হলেও বাস্তবে আর রেল ফেরেনি। বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিলামের মাধ্যমে রেললাইনের পাটিগুলো তুলে নেওয়া হয়।
বাগেরহাটবাসীর দাবি, রেললাইনটি পুনরায় চালু হলে জেলা শহর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “রেল যোগাযোগ মানেই নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সহজেই খুলনা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতে পারবেন। এতে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
রিকশাচালক মো. সেলিম শেখ বলেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য বাসে যাতায়াত কষ্টকর ও খরচ বেশি। রেল চালু হলে কম টাকায় নিরাপদে দূরে যাতায়াত করা যাবে। এতে গরিব মানুষের উপকার হবে।”
নারী উদ্যোক্তা রেহানা বেগম বলেন, “রেলে ভ্রমণ তুলনামূলক নিরাপদ। নারী ও শিশুদের জন্য এটি সবচেয়ে সুবিধাজনক। রেল চালু হলে আমরা আরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেতে পারব।”
শিক্ষার্থী তানভীর হোসেন বলেন, “আমাদের প্রজন্ম উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা চায়। রেল চালু হলে পড়াশোনা, চাকরি ও পর্যটনে সুযোগ বাড়বে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “রেল চালু হলে বাগেরহাটের পণ্য সহজেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানো যাবে। এতে ব্যবসা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শুধু যাতায়াত নয়, পুরো জেলার অর্থনীতি উপকৃত হবে।”
বাগেরহাটের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক চৌধুরী আব্দুর রউফ বলেন, “রেল যোগাযোগ চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি হবে। সড়কপথের চাপ কমবে এবং কম খরচে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে।”
সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম টুকু বলেন, “আধুনিক যুগে রেল যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। রেলওয়ের অধিগ্রহণ করা জমি এখনো রয়েছে। মাত্র ২০ কিলোমিটার রেলপাটি সংযোগ দিলেই ঐতিহ্যবাহী খুলনা–বাগেরহাট রেলপথ পুনরায় চালু করা সম্ভব।”
উল্লেখ্য, লোকসানের অজুহাতে খুলনা–বাগেরহাট প্রায় ৩০ কিলোমিটার রেলপথে বাগেরহাট রেলওয়ে স্টেশনসহ মোট ১০টি স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।