রাজশাহীতে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’ নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের কার্যালয়ের নামে বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি টের পেয়ে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু নিজ উদ্যোগে ওই কার্যালয় উচ্ছেদ করেন। বাড়িটির মালিক দাবি করেছেন, ভাড়া বা ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করে বাসাটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
উচ্ছেদের সময় বাড়ির সামনে টাঙানো একটি ব্যানারে দেখা যায়, সরকার জিয়াউর রহমান ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে নিজের ছবি ব্যবহার করেছেন। একই ব্যানারে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জিয়াউর রহমান নামের আরেক ব্যক্তির ছবিও ছিল। সরকার জিয়াউরের বাড়ি রাজশাহী নগরীর সপুরা নামোপাড়া মহল্লায় এবং অপর জিয়াউর রহমানের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায়।
রাজশাহী উপশহর এলাকার দুই নম্বর সেক্টরের দুই নম্বর রোডে বাড়িটির অবস্থান। এই বাড়ির মালিক আকরামুল ইসলাম। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতির তিনবারের সাধারণ সম্পাদক।
বাড়ির মালিক আকরামুল ইসলাম দাবি করেন, গত বছরের অক্টোবরে সরকার জিয়াউর রহমান নামে এক ব্যক্তি ভবনটির দোতলায় ২ হাজার ২৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। তখন বাড়ির মালিককে জানানো হয়েছিল, ডেভেলপার ব্যবসার অফিস হিসেবে ফ্ল্যাটটি ব্যবহার করা হবে। কিছুদিনের মধ্যেই ভবনের সামনে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’ নামে সংগঠনের জেলা ও মহানগর কার্যালয় উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। পরবর্তীতে শতাধিক লোকজন নিয়ে মাইক ব্যবহার করে কর্মসূচিও পালন করা হয়। এতে ভবনের অন্য ভাড়াটিয়ারা বাসা ছাড়তে শুরু করেন।
আকরামুল ইসলাম বলেন, “ফ্ল্যাটটি ছাড়ার জন্য সরকার জিয়াউর রহমানকে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি বাসা ছাড়তে রাজি হননি। সর্বশেষ গত ১৪ ডিসেম্বর আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও তাতেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।”
শনিবার আকরামুল ইসলামের ছেলে সায়েমুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু নামধারী বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের বাড়িটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। গত এক মাস ধরে তারা কোনো ভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির বিল পরিশোধ না করে বাসাটিতে অবস্থান করছেন এবং বাড়ির মালিককে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিষয়টি জানার পর রবিবার দুপুরে বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু নিজেই ঘটনাস্থলে যান। তার উপস্থিতিতে বাড়ির সামনে লাগানো সাইনবোর্ড ও ব্যানার নামিয়ে ফেলা হয়। সে সময় অফিসের ভেতরে থাকা কয়েকজন যুবক ভিড়ের সুযোগে সরে পড়েন।
বাড়ির মালিক আকরামুল ইসলাম বলেন, “৫৮ হাজার টাকা জামানতের বিপরীতে মাসিক ২৯ হাজার টাকায় ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তারা এক টাকাও ভাড়া দেয়নি। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিলও পরিশোধ করা হয়নি। নোটিশ দেওয়ার পরও তারা বাসা ছাড়েনি এবং দখলের চেষ্টা চালাচ্ছিল। পরে মিজানুর রহমান মিনু বিষয়টি জানতে পেরে নিজেই এসে কার্যালয়টি উচ্ছেদ করেন। অফিসের ভেতরে থাকা কিছু জিনিসপত্রের কারণে তালা লাগিয়ে চাবি নিজের কাছে রাখেন মিনু। কেউ ঝামেলা করতে এলে চাবি তার কাছে আছে বলে জানাতে বলেছেন।”
বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু জানান, জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-খালেদা জিয়া পরিষদ’ নামে বিএনপির কোনো স্বীকৃত সংগঠন নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কার্যালয়ের কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেখেই তিনি ব্যবস্থা নেন।
তিনি জানান, বাড়ির মালিক বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় সরল বিশ্বাসে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছিলেন। পরে দেখা যায়, প্রতারণামূলকভাবে ভবনটি ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি দলের কেন্দ্রকে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি সরকার জিয়াউর রহমান জানান, রাজশাহী নগরের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। শাহমখদুম থানা বিএনপির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া পরিষদের জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমানও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন তিনি।
সরকার জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, “বিএনপির সহযোগী সংগঠন প্রায় দুই শতাধিক, ফলে সবাই সব সংগঠনকে চিনবেন এমনটি নয়।” তাদের সংগঠন ভুঁইফোড় নয় বলে তিনি দাবি করেন।
বাড়ি দখলের অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি বলেন, বাড়িওয়ালা ভাড়া দিয়েছিলেন বলেই তারা সেখানে উঠেছিলেন। নোটিশ দেওয়ার পর বাসা ছাড়তে সময় প্রয়োজন হওয়ায় তখনই ফ্ল্যাটটি ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্য জায়গায় অফিস খোঁজা হচ্ছিল, পছন্দ হলে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলেও তিনি দাবি করেন।