ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সুনামগঞ্জ-২ ( দিরাই-শাল্লা) আসনে প্রচার জমে উঠেছে। হাওরবেষ্টিত এই জনপদে লড়ছেন বিএনপির অভিজ্ঞ প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর তরুণ প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী নিরঞ্জন দাস খোকন। বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে ভোটাররা ধারণা করছেন।
দিরাই ও শাল্লা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হাট-বাজার ও জনবহুল এলাকায় প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা। পাল্টাপাল্টি প্রচারে উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রার্থীরা ভোটাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আবার অন্য প্রার্থীদের একচুলও ছাড় দিচ্ছেন না।
হাওরবেষ্টিত হওয়ায় দিরাই ও শাল্লা উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রা কিছুটা ভিন্ন। বছরের অনেকটা সময় এ অঞ্চলের মানুষকে পানিবন্দি থাকতে হয়। বর্ষায় অধিকাংশ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বেশিরভাগ গ্রামে পাকা রাস্তা নেই।
এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিজীবী। বড় অংশ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদেরও বছরের অনেকটা সময় অলস বসে কাটাতে হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলায় কর্মসংস্থানে অভাবে তরুণরা কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলে চলে যায়। নির্বাচনের প্রচারে এ বিষয়গুলো উঠে আসছে।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, এই আসনে ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান। কে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে এসব ইস্যু তুলে ধরতে পারবে এবং ভোটাদের আস্থা অর্জন করতে পারবে, সেটা ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দিরাই উপজেলার বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘‘আমরা চাই, এ নির্বাচনের মাধ্যমে আগামীতে যিনি এমপি হবেন, তার মাধ্যমে এলাকার স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হবে। মানুষ কাজ পাবে। তার কাছে মানুষ তার ন্যায্য যেন পায়, আমরা সেটি চাই।’’
প্রার্থীদেরও ভোটারদের দাবির প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং ভোট চাইতে হচ্ছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী নিরঞ্জন দাস খোকন রাইজিংবিডিডটকম-কে শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য দূর করা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কৃষক ও জেলেদের ন্যায্য হিসাব নিশ্চিত করার বিষয় সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি আদর্শিক রাজনীতির মাধ্যমে সচেতন ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
নিরঞ্জন দাস খোকন বলেন, ‘‘আমরা দেশের কৃষক-জেলে ও মেহনতি খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করি। এর জন্য আমি নির্বাচনে এসেছি। আমি যে জায়গায় যাচ্ছি, জনগণের ভালোবাসা পাচ্ছি।’’
তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে এবং তার কাস্তে মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার দল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শ্রেণিহীন শোষণমুক্ত দেশ গড়তে চায়।
জেলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আশানুরুপ নয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার বেড়ে চলছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থা উন্নয়নের দাবি রয়েছে ভোটারদের।
তবে দিরাই ও শাল্লার ভোটাররা এবার শুধু আশ্বাসে সন্তষ্ট হতে চান না। তারা চান এমন একজন জনপ্রতিনিধি, যিনি হাওরের জীবন বোঝেন, সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের কথা তুলে ধরবেন এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন।
শাল্লা উপজেলার বাসিন্দা সামসু উদ্দিন বলেন, ‘‘ভোট আসে, এ সময় আমাদের বাড়িঘরে কত নেতারা এসে কত কথা বলে যায় কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে আমাদের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। কেউ আর আমাদের খোঁজ খবর নেয় না। এবার আমরা এমন প্রার্থী চাই, যিনি আমাদের কথা তুলে ধরবেন, এলাকার উন্নয়ন করবেন।’’
বিএনপির প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি নির্বাচনের প্রচারে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোরসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবি, বিগত সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এই আসনে তাদের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘‘আমি যতটুকু দেখেছি, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করার কারণে এলাকায় আমার জনপ্রিয়তা আছে। দুইবার উপজেলা চেয়ারম্যান ও একবার সংসদ সদস্য হয়েছি। এই সব মিলে আমার জনপ্রিয়তা আছে।’’ এবারও নির্বাচিত হবেন বলে আশা করছেন এই প্রবীণ রাজনৈতিক।
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী সুপ্রিম কোটের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির কর্মসংস্থা সৃষ্টি, সৎ নেতৃত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের বার্তা নিয়ে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং হাট-বাজারে গণসংযোগ করেছেন। তিনি দাবি করেন, নীতিবান নেতৃত্বই পারে হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সংকট থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে।
শিশির মনির রাইজিংবিডি-কে বলেন, ‘‘আমি নির্বাচনে এসেছি, কারণ আমি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তব নমুনা উপস্থিত করতে চাই। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন দরকার। এই গুণগত পরিবর্তনের জন্যই আমি দিরাই-শাল্লাকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে পেয়েছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমি নির্বাচনে একটা মডেল উপস্থাপন করতে হবে। এই মডেল তৈরি করতে হলে যা যা করণীয়, একটা নির্বাচনের ইশতেহার থেকে শুরু করে রেজাল্ট পর্যন্ত, এই কাজগুলোতে বৈচিত্র্যের ডাক দিয়েছি। যেখানে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলে অংশ নিতে পারবে। সকলে তার রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাবে।’’
দিরাই উপজেলার একজন সচেতন ভোটার সালমান মিয়া বলেন, ‘‘আমরা এমপি হিসেবে কোনো দুর্নীতিবাজ মানুষকে দেখতে চাই না। যিনি আমাদের গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাট, হাওর এবং পৌরসভার উন্নতি করবেন, আমরা তাকে চাই।’’
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব সরকার রাইজিংবিডি-কে বলেন, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, পেশিশক্তি বা অন্য কিছু যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সেই জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন তৎপর রয়েছে। তিনি আশা করেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।