“যখন নির্বাচন আসে তখন প্রার্থীরা আমাদের কাছে এসে দিদি-মাসি বলে ভোট চায়। তারা বলে, তোমাদের মজুরি বৃদ্ধি করে দেব, উন্নত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে, সন্তানদের পড়ালেখার জন্য স্কুল করে দেব। ভোটের পরে আর তাদের পাওয়া যায় না। তারা আমাদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে শুধু।” এভাবেই আপেক্ষ করছিলেন বাহুবলের রশিদপুর চা বাগানের শ্রমিক রীতা রাণী গোয়ালা।
হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগানের সাবেক শ্রমিক সরদার আমোদ মালের কণ্ঠেও হতাশা। নির্বাচন ও ভোট তাদের কাছে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছাড়া কিছুই নয়।
আমোদ মাল বলেন, “নির্বাচনে আসলে প্রার্থীরা আসেন, দেন নানা প্রতিশ্রুতি কিন্তু পরে আর তাদের দেখা পাওয়া যায় না। তারা নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিও বাস্তাবায়ন করেন না। আমাদের ভোটে নির্বাচিতদের জীবনে পরিবর্তন আসে। তাদেরকে ভোট দিয়ে আমাদের শিকলবন্দি জীবনে আসে না পরিবর্তন। সন্তানদের অনেক কষ্ট করে স্কুলে যেতে হয়। চা শ্রমিকের সন্তান হওয়ায় চাকরি পাওয়া কঠিন, এসব দেখার যেন কেউ নেই।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যারা আমাদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন, তাদের ভোট দেব।”
দেউন্দি চা বাগানের শ্রমিক পঞ্চায়েত নেতা কার্তিক বাকতির কথায় উঠে এল তারা আর ঠকতে চান না। এবার তারা এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান, যিনি তাদের জন্য কাজ করবেন।
কার্তিক বাকতির ভাষ্য, ভোট এলে তাদের কাছে ধর্না ধরেন প্রার্থীরা। দাদা-দিদি, মেসো-মাসি ডেকে মন জয় করার চেষ্টা করেন। ভোটে নির্বাচিত হলে তাদের আর খোঁজ নিতে আসেন না। এজন্য এবার তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বুঝে-শুনে ভোট দেবেন।
চা শ্রমিকরা জানান, বাগানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা। এ মজুরিতে সংসার চলছে না তাদের। ৫৪ বছরেও নিজেদের জীবনমান উন্নত হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। তারা জানান, নানা সময়ে দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্তন আসেনি শুধু চা-শ্রমিকদের কষ্টের জীবনে।
হবিগঞ্জ জেলায় ছোট ও বড় মিলিয়ে চা বাগানের সংখ্যা প্রায় ৪১টি। এসব বাগানের বাসিন্দা প্রায় দেড় লাখ। তাদের মধ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক চা পাতা উত্তোলনে জড়িত। বাগানে কাজ না পেয়ে বাকিদের জীবিকার জন্য বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে। নির্বাচনের সময় তারাও এলাকায় ফেরেন।
জেলার নবীগঞ্জ-বাহুবল উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-১ আসন। এখানে ভোটার আছেন ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৯২১ জন। চুনারুঘাট-মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-৪ আসনে ভোটার ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭১১জন। এই দুই আসনে চা শ্রমিকদের ভোট প্রায় লক্ষাধিক। চা বাগানের শ্রমিকদের ভোট প্রার্থীদের জয়ের ব্যাপারে ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, “উচুঁ নিচু টিলায় থাকা গাছ থেকে চায়ের সবুজ পাতা সংগ্রহ করেন শ্রমিকরা। এ পাতা ফ্যাক্টরিতে প্রক্রিয়াজাত হয়ে রপ্তানি হয়। দেশি-বিদেশি অর্থ পান বাগান মালিকরা। চা শ্রমিকদের নেই উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা। পদে পদে তারা বাধার মুখে পড়েন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা এগোতে পারছেন না। তাদের জীবনমানের পরিবর্তনে উদ্যোগ নেয় না তেমন কেউ। ভোটের সময় আসলে চা শ্রমিকদের ভোট আদায় করতে প্রার্থীরা নানা ধরনের স্বপ্ন দেখান, দেন প্রতিশ্রুতি। পরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেন না কেউ। এনিয়ে চা বাগানের বাসিন্দাদের মনে অনেক কষ্ট। এবার তারা ভোট দিতে হিসাব নিকাশ করছেন।”
তিনি বলেন, “দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে চা শিল্প। এই শিল্পকে নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় যুগের পর যুগ টিকিয়ে রেখেছেন চা শ্রমিকেরা। শুধু ভোট নয়, চা-শিল্পের সমৃদ্ধির জন্যও তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা জরুরি।”
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আক্তার বলেন, “যদি বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তাহলে চা শ্রমিকদের জীবনমান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন করা হবে।”
হবিগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমান বলেন, “জামায়াত ক্ষমতায় গেলে চা শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করবে।”
হবিগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির রেজা কিবরিয়া (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র শেখ সুজাত মিয়া (ঘোড়া), ১১ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিসের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম (রিকশা), জাসদের কাজী তোফায়েল আহমেদ (মোটরগাড়ি), ইসলামিক ফ্রন্টের মোহাম্মদ বদরুর রেজা (চেয়ার)।
হবিগঞ্জ-৪ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন- বিএনপির সৈয়দ মো. ফয়সল (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের আহমদ আবদুল কাদের (দেওয়াল ঘড়ি), ইসলামিক ফ্রন্টের মো. গিয়াস উদ্দিন (মোমবাতি), বাসদের মো. মুজিবুর রহমান (মই), ইনসানিয়াত বিপ্লবের মু. রেজাউল মোস্তফা (আপেল), সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. রাশেদুল ইসলাম খোকন (ছড়ি), মুসলিম লীগের শাহ মো. আল আমিন (হারিকেন), স্বতন্ত্র মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী (ঘোড়া) ও এস এ সাজন (ফুটবল)।