সারা বাংলা

নির্বাচনে কালো টাকা ছড়ানো ও সাইবার হামলা হচ্ছে: পরওয়ার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকি, কালো টাকা ছড়ানো এবং সাইবার হামলার অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে থেকে মাঠপর্যায়ে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেস ক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণাকালে তিনি এ সব অভিযোগ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচনের এখনো এক সপ্তাহ বাকি। অথচ এখনই প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে না।’’ 

সংবাদ সম্মেলনে নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গেলে নারী কর্মীদের বোরকা ও মুখের কাপড় টেনে খুলে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও প্রতিবাদ করলে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, এমনকি গর্ভবতী নারীদের ওপরও হামলার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইতে গেলে নারীদের পোশাক খুলে নিতে হবে।’’ 

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘এটা শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, এটি নারীদের মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এ ধরনের হুমকি দেয়, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে; সেটা ভেবে আমরা আতঙ্কিত।’’ 

সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ এ নেতা। 

মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ‘‘খুলনা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিলে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও মিটিং করতে গেলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার সভায় গেলে খবর আছে।’’ 

তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক জনপ্রতিনিধিদের জোর করে বাড়ি থেকে তুলে এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা ভোট নয়, জোর করে রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।’’ 

নিজের নির্বাচনি এলাকায় প্রচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আমার নির্ধারিত সভা-সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একাধিক স্থানে চেয়ার-টেবিল ভেঙে সভা ভুণ্ডুল করা হয়েছে।’’

একটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, একটি এলাকায় গণসংযোগ শেষে নির্ধারিত সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষের লোকজন গিয়ে চেয়ার সরিয়ে নেয় এবং সভা করতে বাধা দেয়। বিষয়টি থানাকে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে আটক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের বড় অংশজুড়ে ছিল কালো টাকা ও ভোট কেনার অভিযোগ। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘খুলনা-৫ আসনে সংগঠিতভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ঢালছে একটি পক্ষ। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করে বাড়ি বাড়ি টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

‘‘দিনমজুর, গরিব মানুষ, সংখ্যালঘু নারীদের ২০০-৩০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বিরিয়ানি আর নগদ টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। এটা নির্বাচনি আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।’’ 

তিনি বলেন, ‘‘কালো টাকার দাপটে রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।’’ 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত প্রার্থী বলেন, ‘‘প্রত্যেক থানার কাছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তালিকা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা পরিচিত সহিংসদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।’’ 

নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন এ প্রার্থী। 

সংবাদ সম্মেলনে সাইবার হামলার বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। 

তার দাবি, ‘‘জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট এবং পরবর্তীতে তার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে।’’ 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারি দাবি করেন, ‘‘তদন্তে একটি সরকারি দপ্তরের একজন কর্মকর্তার ই-মেইল থেকে ভারতীয় উৎসের ভাইরাস ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে বলে আমাদের সাইবার টিম শনাক্ত করেছে। এ ঘটনায় সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে এবং ডিবি পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ল্যাপটপসহ আটক করেছে।’’ 

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘‘ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।’’ 

মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, খুলনা-৫ আসনে মোট ১৫০টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫২টি কেন্দ্রকে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ সব কেন্দ্রে ভোটারদের ভয় দেখানো, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও আগাম ব্যালট সরানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই প্রার্থী। 

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে জামায়াতের এই প্রার্থী নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘অবিলম্বে কালো টাকা বিতরণ বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’’ 

এ সময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা আমীর এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মইনুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি মিয়া গোলাম কুদ্দুস, প্রিন্সিপাল গওসুল আজম হাদী, খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি আবুল খায়ের ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শেখ জাকিরুল ইসলাম।