সারা বাংলা

প্রার্থী তিনি, কর্মীও তিনি: আজিজারের ভরসা সাইকেল ও হ্যান্ড মাইক

কোনো কর্মী বাহিনী নেই। করেন না নির্বাচনি সভাও। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাই বিরামহীনভাবে ছুটছেন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। সঙ্গী একটি পুরনো বাইসাইকেল। এর সামনে বাঁধা নির্বাচনি প্রতীক কাঠের ঢেঁকি। কাঁধে একটি হ্যান্ড মাইক ঝুলিয়ে সবার কাছে করছেন ভোট প্রার্থনা।

এভাবেই নিজের নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ি) আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মো. আজিজার রহমান। নব্বইয়ের দশকে বিএসসি পাস করায় এলাকায় তিনি আজিজার বিএসসি নামে বেশি পরিচিত। 

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের খোদাবকস গ্রামের মৃত রজ্জব মন্ডলের ছেলে আজিজার রহমান। ১৯৮৪ সালে তিনি সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৯৮৭ সালে এইচএসসি ও ১৯৯০ সালে পলাশবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি (স্নাতক) পাস করেন। ১৯৯১ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সাদুল্লাপুরের দড়ি জামালপুর রোকেয়া সামাদ দ্বিমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখনো তিনি সেখানেই কর্মরত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। বিএনপি ও জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থী ছাড়াও আরো ৯ প্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্য প্রার্থীরা যখন বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক নিয়ে নানা আয়োজনে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন, তখন কর্মীবিহীন আজিজার রহমান যেন নিধিরাম সর্দার।

উচ্চ শিক্ষিত এই ব্যক্তি এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন না। এর আগেও তিনি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

আজিজার রহমান ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে সাদুল্লাপুরের ভাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। ২০১৯ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এরপর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢেঁকি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঢেঁকি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। 

যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন আজিজার বিএসসি উন্নয়নের দিক দিয়ে সাদুল্লাপুর ও পলাশবাড়ী উপজেলা অনেকটা পিছিয়ে আছে। নির্বাচিত হলে নির্বাচনি এলাকার রাস্তা-ঘাট, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ ও মেরামতসহ জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাচ্ছেন আজিজার রহমান। তিনি বলছেন, এমপি নির্বাচিত হলে তার সঙ্গে দেখা করতে কাউকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে না, সরাসরি সাক্ষাৎ করা যাবে।

গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়াচ্ছেন আজিজার বিএসসি। এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে বাইসাইকেল চালাতে চালাতেই আরেক হাত দিয়ে হ্যান্ডমাইকে বলছেন, “ও চাচি, ও খালা, ও আপা, ও দাদি, ও আন্টি, ও চাচা, ও অটোচালক ভাই, কৃষক ভাই, ও ভাতিজা, আমার ঢেঁকি মার্কায় একটি করে ভোট দেন। নির্বাচিত হলে আমি বেকার সমস্যা সমাধান করব। সংসদে গিয়ে আপনাদের সমস্যার কথা বলব।”  

আজিজার রহমান পরিবর্তনের জন্য নিজের ঢেঁকি প্রতীকে ভোট চাইছেন, দোয়া করতে বলছেন। বক্তব্য শেষে নারী ও বৃদ্ধ ভোটাররা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করছেন। সালাম দিয়ে অনেক ভোটারের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন তিনি।

স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আজিজার রহমান উচ্চ শিক্ষিত, তবে সহজ-সরল মানুষ। তার টাকা নেই, এ কারণে কোনোবারই তিনি নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন না। এসব মানুষকে ভোট দেওয়া উচিত। 

স্থানীয় ভোটার আলম মিয়া, আনোয়ার হোসেন, তাইজুল রেজা ও সোহেল মিয়া বলেন, “আজিজার বিএসসির প্রচার ব্যতিক্রমী। অন্য প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে। আজিজার বিএসসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।”

তারা আরো বলেন, “বর্তমান সময়ে নির্বাচনে টাকার খেলা হয়, আজিজার বিএসসির পক্ষে তা সম্ভব নয়। এমন প্রার্থীকে একবার ভোট দিয়ে দেখা দরকার।” 

আজিজার রহমান বিএসসি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমি একাই বাইসাইকেলে নিজের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। আমার কোনো কর্মী বাহিনী নেই, যারা আমাকে ভালোবাসেন, তারাই আমাকে ভোট দেবেন। আমার নির্বাচনি খরচ নেই। তাই, নির্বাচিত হলে টাকা তোলারও চাপ থাকবে না। যারা টাকা খরচ করে ভোট করছেন, তারা নির্বাচিত হলে অনিয়ম-দুর্নীতি করে নিজের টাকা আগে তুলবেন। আমার ক্ষেত্রে তা হবে না।”

তিনি আরো বলেন, “আমার এখানে দুই উপজেলা মিলে ১৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা আছে। গ্রাম আছে ৩২৯টি। ইতোমধ্যে আমি প্রায় ৩০০টি গ্রামে প্রচার চালিয়েছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সব মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাব। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি সাধারণ মানুষের মাঝে আমার ব্যাপক সাড়া জেগেছে। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার মানুষদের সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ করে যাব।” 

গাইবান্ধা-৩ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ১৮৫ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯০২ জন, নারী ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৪ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৯ জন। ১৪৫ ভোটকেন্দ্রের ৯৫২টি কক্ষে ভোগ গ্রহণ করা হবে।