সারা বাংলা

ধানের শীষের প্রার্থী নেই, বিএনপির ভোটই ‘ফ্যাক্টর’

কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের নির্বাচন এখন আর কেবল প্রার্থীদের প্রচারে সীমাবদ্ধ নেই। এ নির্বাচন পরিণত হয়েছে বিএনপির দীর্ঘদিনের ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে সেই হিসাবের লড়াইয়ে। বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাচ্ছে।

পূর্বের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হার বিশ্লেষণ করে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতারা ধারণা করেন, দেবীদ্বারে বিএনপির ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোট রয়েছে। এই বিপুল ভোট এবার কোনো দলীয় প্রতীকের অধীনে নেই। তা পরিণত হয়েছে ‘ডিরেকশনাল ভোটে বা নির্দেশনামূলক ভোটে’। ভোটাররা দল নয়, পরিস্থিতি ও নির্দেশনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে ভোট দেবেন।

এই বাস্তবতায় স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির ভোটের বড় অংশ ঝুঁকছে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিনের ট্রাক প্রতীকের দিকে। মাঠপর্যায়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে তারা ট্রাক প্রতীকের পক্ষে কাজ করছেন। নির্বাচনি প্রচারে প্রকাশ্যে না নামলেও ভোটের দিন কেন্দ্রভিত্তিক তৎপরতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

১১ দলীয় জোট ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ শক্ত সাংগঠনিক অবস্থানে রয়েছেন। একইসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ভোট তাকে বাড়তি শক্তি যোগাচ্ছে।   

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট জামায়াতে ইসলামীর ভোট ৩০ শতাংশের মতো। খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি ইসলামপন্থি দলের সমর্থন যুক্ত হলে তাদের ভোট আরো কিছুটা বাড়বে। এই ভোট হাসনাত আবদুল্লাহর বক্সে যাবে। এছাড়াও তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের বড় অংশের সমর্থনও তিনি পাবেন। 

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দেবীদ্বারে বিএনপির ভোট জামায়াত বা জামায়াত সমর্থিত নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী পাবে, তেমন সম্ভাবনা কম। 

গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন তুলনামূলকভাবে দলের দুর্বল সাংগঠনিক শক্তি নিয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসেছেন বিএনপির নীরব সমর্থনের কারণে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভোটের অন্তত অর্ধেক যদি ট্রাক প্রতীকের ঝুলিতে পড়ে, তাহলে ভোটের ব্যবধান দ্রুত কমে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে রূপ নেবে। 

এই সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ভোটার উপস্থিতি। ভোটার উপস্থিতি কম হলে এগিয়ে থাকবেন হাসনাত আবদুল্লাহ। আর ভোটার উপস্থিতি বেশি হলে এবং বিএনপির ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে এলে পাল্লা ভারী হবে জসিম উদ্দিনের। 

সব মিলিয়ে কুমিল্লা-৪ আসনের নির্বাচন এখন বিএনপির ভোট কোন প্রতীকে যাবে এবং কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যাবে, সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে দেবীদ্বারে আগামীর নির্বাচিত প্রতিনিধি কে হবেন? 

দেবীদ্বার পৌরসভায় এলাকার ভোটার আবদুল মালেক  বলেন, “আমরা তো বরাবরই ধানের শীষে ভোট দিছি। এবার শীষ নাই কিন্তু ভোট তো ফেলতে হবে। কাকে দিলে আমাদের ভোটের মানে থাকে, সেই চিন্তা করতেছি। ট্রাকের কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে।”

বিএনপি সমর্থকের বাইরের ভোটারদের সমর্থনও প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ভোটাররা দেখেশুনে প্রার্থী যাচাই করে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে শেষমুহূর্তে যে প্রার্থীর পক্ষে জাগরণ সৃষ্টি হবে, এই ‘সিদ্ধান্তহীন ভোটারের’ ভোট সেদিকে যেতে পারে।

দেবীদ্বারের জাফরগঞ্জ এলাকার ভোটার শাহিনা বেগম (৩৮) বলেন, “এলাকায় সবাই বলাবলি করতেছে, বিএনপির ভোট এক জায়গায় গেলে ফল বদলাইতে পারে। আমরা চাই ভোটটা নষ্ট না হোক, তাই দেখে-শুনে সিদ্ধান্ত নেব।”

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। ভোটারদের প্রায় ৪০ শতাংশই তরুণ ভোটার। দেবীদ্বার পৌরসভার তরুণ ভোটার কলেজশিক্ষার্থী কামরুল ইসলাম (২৭)। তিনি বলেন, ‘‘আগে ভাবছিলাম হাসনাত আর বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। এখন বিএনপি নাই বলে পুরো হিসাবই বদলে গেছে। তরুণদের মধ্যে ট্রাক প্রতীক ও শাপলা কলি প্রতীক, দুটি নিয়েই আলোচনা আছে।’’

কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে স্পষ্টত বিএনপির ৪০ শতাংশ ভোটার প্রতিনিধি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজমেহারপুর ইউনিয়নের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুরুন্নবী বলেন, ‘‘এই নির্বাচনটা এখন আদর্শের চেয়ে হিসাবের। মানুষ দেখতেছে কার জেতার সম্ভাবনা বেশি। বিএনপির ভোট যেদিকে যাবে, ফল সেদিকেই যাবে, এটাই বাস্তবতা।”

কুমিল্লা–৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তা বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেন।

সংশ্লিষ্ট  রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেন এই আসনে এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি আপিলে অভিযোগ করেন, বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। নির্বাচন কমিশন মঞ্জুরুল আহসানের প্রার্থিতা বাতিল করে। পরে উচ্চ আদালতে গিয়েও মনোনয়নপত্র ফিরে পাননি তিনি। 

হাসনাত আবদুল্লাহর আপিলে মঞ্জুরুল আহসানের প্রার্থিতা বাতিল হয়। এটাও বিএনপির ভোটারদের সমর্থন হাসনাত আবদুল্লাহর পাওয়ার ক্ষেত্রে  বাধা হতে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমার আইনি লড়াই একজন বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ছিল না। জনগণের ব্যাংকের অর্থ লুট করে আবার নির্বাচনে জনগণের ভোট পেয়ে সংসদে গিয়ে এসব প্রার্থী আবার লুটপাটেই জড়িয়ে পড়তেন। তাই ভোটের আগেই সেই আইনি লড়াই লড়তে হয়েছে। উচ্চ আদালত জনগণের পক্ষেই রায় দিয়েছেন।”

তিনি আরো বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে ইনশাআল্লাহ দেবীদ্বারের রাজনীতিতে নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করতে চাই।”

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত ৯ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আসন ভাগাভাগি করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে গণঅধিকার পরিষদ। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে এনসিপি। আর গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিন।

গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, “বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে আমাকে সমর্থন দিয়েছে। এ ছাড়া দেবীদ্বার আসনের বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীও আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি মাঠে আমার পক্ষে কাজ করবেন। সুষ্ঠু ভোট হলে আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।”

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জসিম উদ্দিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দেবীদ্বার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আবদুল করিম এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকারও নিজ নিজ সমর্থনে গণসংযোগ চালান।

দেবীদ্বার উপজেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, বুধবার হাসনাত আব্দুল্লাহর শিডিউলভুক্ত সভা-সমাবেশ ছিল না। তবে তাঁর শাপলা কলি প্রতীকের সমর্থনে কর্মী-সমর্থকরা বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন। কয়েকটি এলাকায় নির্বাচনি অফিস উদ্বোধন করা হয়েছে। গণসংযোগকালে এনসিপি ও জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।