সারা বাংলা

রংপুর-৪ আসনে ত্রিমুখী লড়াই: চাবিকাঠি তরুণ-নারী ভোটারদের হাতে

তিস্তার চর আর ভাঙনের ক্ষত বয়ে বেড়ানো জনপদ কাউনিয়া ও পীরগাছা। নদীর গতিপথ যেমন স্থির নয়, তেমনি অনিশ্চিত রংপুর-৪ আসনের এবারের নির্বাচনী সমীকরণ। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় তাই উত্তাপ ছড়িয়েছে এই আসনের পুরো নির্বাচনী মাঠজুড়ে। ৮ জন প্রার্থী থাকলেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ত্রিমুখী লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না তৃণমূলের অনেক ভোটার।

এই আসনে মোট ভোটার প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে নারী ভোটার পুরুষের তুলনায় দশ হাজার বেশি। বিশাল এই ভোটব্যাংককে সামনে রেখেই প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে প্রচারণার কৌশল, বদলাচ্ছে বক্তব্যের ভাষা।

গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ আখতার হোসেন এবার ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে। নতুন প্রার্থী হলেও রাজনীতির মাঠে তিনি নতুন নন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা, চরাঞ্চলের কৃষি রক্ষা আর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের কথা বলেই তিনি মানুষের কাছে যাচ্ছেন।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইউনিয়ন এলাকায় প্রচারণার ফাঁকে আখতার হোসেন বলেন, “তিস্তা শুধু একটা নদী নয়, এটা উত্তরের মানুষের জীবন। তিস্তার ন্যায্য হিস্যা আর চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। তাই ৪৯ দফা ইশতেহারের মাধ্যমে আমরা সেই পরিবর্তনের রূপরেখা দিয়েছি।”

তার মতে, অর্থ আর পেশিশক্তির লড়াই নয়, এবারের নির্বাচন হবে নীতির ও পরিবর্তনের লড়াই। শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দিয়ে মানুষ সেই বার্তাই দেবে এমন আশাবাদ তার কণ্ঠে।

এদিকে, বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসার প্রচারণায় বারবার ফিরে আসে পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা। কাউনিয়া-পীরগাছার অলিগলি চেনা কণ্ঠে তিনি তুলে ধরছেন বাবা-চাচার রাজনৈতিক অবদান আর দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতি।

এমদাদুল হক ভরসা বলেন, “এই এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখ আমার রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। কৃষক আর সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করতেই বিএনপির রাজনীতি। ফ্যামিলি কার্ড আর কৃষকবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূলের জীবনমান বদলানোই এবারের আমাদের লক্ষ্য।”

তিনি মনে করেন, অভিজ্ঞতা আর মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আর বিপ্লব পরবর্তী দলীয় গণজোয়ারের শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হবে। জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী তিনি।

অন্যদিকে নীরব প্রচারণায় পুনরুদ্ধারের চেষ্টা জাতীয় পার্টির প্রার্থী মাহবুবার রহমান শুরু থেকেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ তুললেও প্রচারণায় আড়ম্বর নেই তার। নীরবে, কিন্তু নিয়মিতভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে কথা বলছেন ভোটারদের সঙ্গে। দুইবারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত এই নেতা পীরগাছা উপজেলা থেকেই আসনটি পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছেন।

আবু নাসের শাহ মোহাম্মদ মাহবুবার রহমান বলেন, “আমি প্রতিশ্রুতির রাজনীতি করি না, কাজের রাজনীতি করি। মানুষ আমাকে চেনে আমার কাজ দিয়ে। শেষ মুহূর্তে ভোটাররাই তার জবাব দেবেন।”

এত প্রচারণা, এত প্রতিশ্রুতির ভিড়েও এখনো সিদ্ধান্তহীন অনেক ভোটার। কেউ বলছেন উন্নয়ন চান, কেউ চান নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান, আবার কেউ পরিবর্তনের রাজনীতি। চায়ের দোকান, হাটবাজার কিংবা তিস্তার চরে সবখানেই ঘুরছে একই প্রশ্ন, ‘শেষ পর্যন্ত কাকে ভোট দেবেন?’

পারুল ইউনিয়নের শরীফ সুন্দর এলাকার আমজাদ, বকুল, গোলজার সাগরসহ বেশ কয়েকজন ভোটার জানান, এই আসনটি পূর্বে থেকেই আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির এমপিরা শাসন করে এসেছে। তবে এবার পট পরিবর্তনে ভোটের মাঠ অনেকটা পরিবর্তন।

তাদের ভাষ্যমতে, প্রথম দিকে আসনটিতে এবারের নির্বাচনে একক জয়গানে ছিল বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। পরবর্তীতে লাঙ্গলের প্রার্থীও ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। কিন্তু গেল ১৫ দিন ধরে জামাত-এমসিপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ সদলবলে আখতার হোসেনের পক্ষ নিয়ে যখন মাঠে নেমেছেন, তখন বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের প্রেক্ষাপট একেবারে বদলে গেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা আখতার হোসেন এখন হাড্ডাহাটি লড়াইয়ে আছে বলেও জানান তারা। তাই ভোটের দিন যত কাছে আসছে, ততই ভোটের মাঠ বদলে যাচ্ছে। 

তবে বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরের প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্যরেখা তিস্তা বেষ্টিত এই আসনে এবারের নির্বাচন ভিন্ন বার্তা দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বিজয়ের চাবিকাঠি কার হাতে যাবে।