রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ছয়টি সংসদীয় আসন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে এসব আসনে নির্বাচনি প্রচার। এখন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা শুরু করেছেন জয়-পরাজয়ের হিসেব। ভোটাররা বলছেন, তারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে করে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখতে পারে নারী, আদিবাসী, তরুণ ও ভাসমান ভোটাররা।
এক সময় রাজশাহী অঞ্চল বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। গত ১৭ বছরে নানা প্রতিকূলতার কারণে সেই দুর্গ কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে। একই সময়ে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এখন আসনকেন্দ্রিক ভোট বিশ্লেষণে বিএনপি ও জামায়াতের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে অনেক।
ভোটাররা জানান, রাজশাহীর প্রায় সব আসনেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে বিএনপিকে। বিশেষ করে অনেক আসনে জামায়াতের শক্ত প্রার্থী এবং কোনো কোনো আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে দলটির ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের ভোটাররা জানান, এই অঞ্চলের ভোটের লড়াই মূলত দ্বিমুখী হতে চলেছে। রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে বর্তমান সমীকরণে তিনটিতে বিএনপি এবং তিনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক, নারী এবং তরুণ ভোটারদের পছন্দ। এই তিনটি পক্ষ যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবে তিনি হাসবেন।
রাজশাহী-১: ১৯৮৬ সালে এই আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। এই আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে বিএনপি প্রার্থী ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দিন। এই দুই প্রার্থীই তাদের হারানো আসন উদ্ধার করতে চাচ্ছেন।
এই আসনের বড় একটি অংশ সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটার। বিশেষ করে গোদাগাড়ী উপজেলায় তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। জয়ের শেষ হাসি কে হাসবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই ভোটারের সমর্থনের ওপর।
বিএনপি প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দিন বলেন, “আমার বড়ভাই এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। আমাকেও মানুষ গ্রহণ করেছে। এই আসনে আমাকে জনগণ বিজয়ী করবেন বলেই আশাবাদী।”
যোগাযোগ করা হলেও জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুটি উপজেলা, ৪টি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৪ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৩ জন।
রাজশাহী-২: সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাজশাহী-২ আসন। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু। তিনি সিটি করপোরেশনের মেয়রও ছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মহানগরের নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর।
অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে এখানে মিনুর অবস্থান জামায়াতের তুলনায় শক্তিশালী। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেনও আরো চারজন। তবে, তারা সেভাবে প্রচারে নেই।
জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “নির্বাচনি প্রচারে সাধারণ মানুষের কাছে গেছি। তারা দাড়িপাল্লায় ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।”
বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, “আমি এই আসনের এক সময়ে সংসদ সদস্য ও মেয়র ছিলাম। আমার হাত দিয়েই উন্নয়ন হয়েছিল। রাজশাহী পেয়েছিল শিক্ষানগরী। এর আগে ভোট হয়েছিল রাতের। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমার জয় ঠেকাতে কেউ পারবে না। রাজশাহীর জনগণ আমাকে আবার গ্রহণ করবে।”
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩০ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৮জন।
রাজশাহী-৩: রাজশাহীর পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল কালম আজাদ। জামায়াতের এই প্রার্থী একটানা ২৮ বছর ধরে ছিলেন চেয়ারম্যান। এই প্রার্থী এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল হক মিলনকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। তবে প্রচার থেকে জনসংযোগ সবদিকে এগিয়ে বিএনপির প্রার্থী। শফিকুল হক মিলন ২০১৮ সালে এই আসনে নির্বাচন করেছিলেন।
বিএনপি প্রার্থী শফিকুল হক মিলন বলেন, “এই আসনের মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাদের সুখেদুখে আমি সবসময়ে পাশে থেকেছি। ২০১৮ সালে আমাকে এই আসন থেকে জিততে দেওয়া হয়নি। তবে এবার আমি জয়ী হব।”
বিএনপি প্রার্থী শফিকুল হক মিলন ও জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ
জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমি দীর্ঘ ২৮ বছর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলাম। এবার মানুষ পরিবর্তন চাচ্ছে। এই আসনেও পরিবর্তন হবে। মানুষ আর আগের কাউকে দেখতে চাচ্ছে না, তারা নতুনকে স্বগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই আসন থেকে দাড়িপাল্লাকে জয়ী করতে চাই।”
এই আসনে আরো চারজন প্রার্থী আছেন। পবা ও মোহনপুর উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ, তিনটি পৌরসভা আছে। রাজশাহী-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৮৩৯ জন। তাদরে মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৮ হাজার ৬৯০ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৩ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৬ জন।
রাজশাহী-৪: বিএনপি ও জামায়াতের ভোটের লড়াইয়ের আভাস মিলছে ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪ আসনে। এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এখানে দলীয় ভোটের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইমেজ, সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় ইস্যুগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক ও চিকিৎসাসেবা মূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ভোটারদের কাছে তার পরিচিতি রয়েছে। বিএনপি প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান সাবেক চেয়ারম্যান হওয়ায় তিনিও উপজেলাজুড়ে সুপরিচিত এবং তার একটি শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।
বিএনপি প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান ও জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী
বিএনপি প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান বলেন, “বাগমারা ছিল সন্ত্রাসীদের অভয়রাণ্য। আমি সে সময় থেকে ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দিয়েছি। এরপর তরুণ বয়সে ইউপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছি। এখন এই আসন থেকে আমি ধানের শীষ নিয়ে জয়ী হয়ে সংসদে যাবো এলাকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে।”
জামায়াত প্রার্থী ডা. আব্দুল বারীকে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫২১ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন চারজন।
রাজশাহী-৫: বিএনপির মাথাব্যথা দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী। ফলে এই আসনে কিছুটা স্বস্তিতে আছেন জামায়াতের প্রার্থী এমনটি মনে করছেন ভোটাররা। তারা জানান, বিএনপির দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সম্ভবনা রয়েছে।
বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, “দল আমার উপর বিশ্বাস রেখে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি এই আসনে বিপুল ভোটে জয় পাব।”
বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও জামায়াত প্রার্থী মঞ্জুর রহমান
স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খাইরুল হক শিমুল বলেন, “আমার সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীসহ স্থানীয়রা আছে। দলের দুর্দিনে আমি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। তাই আমি দলের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। এলাকার মানুষজন আমাকে চাচ্ছে। নির্বাচনের পর বোঝা যাবে কে বিজয়ী হয়েছে।”
জামায়াত প্রার্থী মঞ্জুর রহমান বলেন, “মানুষ ইনসাফের পথে এসেছে। আমার এলাকার ইনসাফপূর্ণ ব্যক্তি চায় দেশ চায়। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করবে। আমি শতভাগ আশাবাদী পুঠিয়া-দুর্গাপুরের মানুষ আমাকে ভোট দেবে।”
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫০ হাজার ২১৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৯ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৭০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৫ জন।
রাজশাহী-৬: পদ্মা নদী বেষ্টিত রাজশাহীর দুই উপজেলা চারঘাট ও বাঘা। এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৬ আসন। এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন বিএনপি প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদ ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী নাজমুল হক।
জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হক নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন প্রচারের সময়। বিএনপির প্রার্থীও গেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে।
বিএনপি প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদ ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী নাজমুল হক
বিএনপি প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, “আমি মানুষের ভাগ্যেন্নয়নের জন্য কাজ করব। তাদের পাশে সবসময় ছিলাম, আছি ও থাকব। আমার এলাকার মানুষ খুব সচেতন। ধর্মের দোহাই যে দেবে তাকে ভোট দেবে না। এই আসন আবারো বিএনপির কাছে যাবে।”
জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হক বলেন, “মানুষ সন্ত্রাসদের আর দেখতে চায় না। তারা গত ১৭ মাসে কি করেছে সব দেখেছে মানুষ। এলাকার মানুষ সৎ লোক চাচ্ছে। এজন্য তারা জামায়াতের পক্ষে ঝুঁকেছে। আমি শতভাগ নিশ্চিত নির্বাচনে আমি জয়ী হচ্ছি।”
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯১১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬৬ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ২জন।